Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভেসে থাকার রাজনীতি

ভেসে থাকার রাজনীতি
  • ৩ মার্চ, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
ছাত্র রাজনীতির নামে, রাজ্যের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিশৃঙ্খলা অশান্তি সৃষ্টির ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক অতীতে সেসব সীমাবদ্ধ ছিল কলেজ অধ্যক্ষ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ঘেরাও, বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্যেই। নানা ইস্যুতে এসব চলাকালে পঠনপাঠন বারবার ব্যাহত হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মনোযোগী পড়ুয়ারা, যাঁরা উচ্চশিক্ষাকে জীবন গড়ার চূড়ান্ত ধাপ হিসেবেই গ্রহণ করে থাকেন। বলা বাহুল্য, এইসব অবাঞ্ছিত ঘটনার অধিকাংশের জন্য দায়ী একদল বাম এবং অতিবাম ছাত্রদল। তাদের ‘বিপ্লবীয়ানা’ চেনা। তবে শনিবার সাম্প্রতিক অনেক রেকর্ডই ভেঙে দিয়েছে তারা। এদিন তাদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছেন স্বয়ং রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। তাঁর শারীরিক আঘাত এতটাই গুরুতর যে আক্রান্ত শিক্ষামন্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য এসএসকেএম হাসপাতালেও নিয়ে যেতে হল! শনিবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল তৃণমূলের অধ্যাপক সংগঠন ওয়েবকুপার বার্ষিক সাধারণ সভা। সেখানে উপস্থিত হতে গিয়েই বাম এবং অতিবাম কিছু পড়ুয়ার হামলার শিকার হন তিনি। তাঁর গাড়ির কাচও ভাঙা হয়েছে। ছাত্র নামধারী ওই উচ্ছৃঙ্খল যুবদের হাতে বেধড়ক মার খেয়েছেন প্রাক্তন উপাচার্য এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র। তৃণমূল শিক্ষাবন্ধু সমিতির অফিসের উপরেও আছড়ে পড়ে তাদের রোষ। রীতিমতো দুষ্কৃতীদের কায়দায় ওই অফিসে অগ্নিসংযোগেরও অভিযোগ উঠেছে! 
Advertisement
আন্দোলনকারীরা মন্ত্রীর গাড়ি এগতে দিতে চাননি। তাঁকে থামাতে গিয়ে একাধিক পড়ুয়াও জখম হয়েছেন অবশ্য। তাঁদের একজনের আঘাত বেশ গুরুতর। গোটা ঘটনায় মোট পাঁচটি অভিযোগ গ্রহণ করেছে পুলিস। শনিবারই পুলিস তদন্তে নেমে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তারও করে।  বিক্ষোভ এড়াতে ওপেন এয়ার থিয়েটারের পিছন দিক দিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। সভা চলাকালীন গেট ঠেলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। ওয়েবকুপার সদস্যরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের একাংশ আরও উগ্রমূর্তি ধারণ করেন। ব্রাত্য বসুর কার্টুন আঁকা ব্যানার নিয়ে গেটের উপরে দাঁড়িয়েছিলেন এক পড়ুয়া। তিনিই একটি ধাতব পাইপ ছুড়ে মারেন অধ্যাপকদের দিকে! তা থেকে কয়েকজনের হাতে ও কাঁধে চোট লাগে। এরপরই শুরু হয় জলের বোতল এবং অন্যান্য সামগ্রী নিক্ষেপের অসভ্যতা। তখন মঞ্চ থেকে শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের সংযত হতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তাতে কর্ণপাত করা দূর, ক্ষোভের পারদ সপ্তমে চড়াতে থাকেন তাঁরা। প্রদীপ্ত মুখোপাধ্যায় নামে এক অধ্যাপক এদিনের বিপ্লবীদের হাতে জখম হন। জখম হন সুমন্ত প্রামাণিক নামে এক শিক্ষকও। শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি এবং পুলিসের পাইলট কারগুলির চাকার হাওয়া খুলে দেওয়া হয়। নানা কটূক্তি যখন ধেয়ে আসছে, তখনও এসএফআইয়ের দুই প্রতিনিধির বক্তব্য শুনছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। বাইরে তখন অতিবাম ছাত্র সংগঠনগুলি দাবি করে, তাদের তরফে অন্তত ৪০ জন প্রতিনিধিকে ঢুকতে দিতে হবে। পরে শিক্ষামন্ত্রী বাইরে বেরিয়ে এসে তাঁদের সঙ্গে কথাও বলেন। তারপরও তাঁকে দীর্ঘক্ষণ ঘেরাও করে রাখেন ছাত্ররা। শেষে মন্ত্রীর গাড়ি প্রস্থানের সময় একদল বিক্ষোভকারী বনেটে উঠেই সেটি আটকানোর চেষ্টা করেন। তখনই গাড়ির সামনে পড়ে গুরুতর জখম হন আরএসএফ সদস্য ইন্দ্রানুজ রায়। 
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিছিল এবং পাল্টা মিছিলও বেরয়। প্রতিক্রিয়ায় রাজ্যের একাধিক জায়গায় নতুন করে বিক্ষিপ্ত অশান্তির ঘটনাও কানে আসে। তবে এখানেই ক্ষান্ত দেয়নি তারা। আজ সোমবার রাজ্যজুড়ে ছাত্র ধর্মঘট ডেকে দিয়েছে সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার শুরুর দিনেই এমন একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি নিতে তারা দ্বিধা করেনি! ছাত্র ধর্মঘটের আওতায় শুধুমাত্র কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে রাখা হলেও তার পরোক্ষ প্রভাব উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার উপর পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? এমন পরিস্থিতিতে রাস্তা অবরোধ, ট্রেন-বাসের চাকা রুখে দেওয়ার মতো অন্যায় তো আগে কম হয়নি। ফলে দুশ্চিন্তা কিন্তু রয়েই যাচ্ছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বকেয়া ছাত্রভোটের দাবিকে সামনে রেখে শনিবার যাদবপুর কাণ্ড ঘটানো হলেও তা যে উপলক্ষমাত্র, নাগরিক সমাজের তা জানতে বাকি নেই। আসলে বিধানসভা থেকে লোকসভা—একের পর এক নির্বাচনে নিপাত্তা হয়ে গিয়েই রাজ্যের প্রাক্তন শাসক দল জনমানসে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে। বছর ঘুরলেই বিধানসভা ভোট। চতুর্থবার সরকার গড়ার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রস্তুত, তখন সিপিএম ফের খাতা খুলতে মরিয়া—অন্তত ভেসে থাকতে হবে গৌড়ীয় মার্কসবাদীদের। নচেৎ, এখনও ডাক পাড়লে যে ক’জন ছেলেপুলে এসে জড়োটড়ো হয়, তারাও উধাও হয়ে যাবে দ্রুত। লালপার্টির বেশিরভাগ দলীয় অফিসের তালায় মরচে পড়ে গিয়েছে, এবার না তাদের সাইনবোর্ডগুলিও নামিয়ে ফেলতে হয়!
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ