Bartaman Logo
১৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভূরি ভূরি ভুয়ো

ভূরি ভূরি ভুয়ো
  • ২১ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
Prefer us on Google
জনসেবা মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটাল। ধুমধামসহকারে রবিবার উদ্বোধন হয়েছিল এমনই গালভরা নামের একটি বেসরকারি সংস্থার। স্পেশালই বটে, তাও আবার মাল্টি! কিন্তু এত গুণপনা কীসে কীসে? আপাতত যা খবর, হাসপাতাল নামে ‘আবির্ভূত’ প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় স্পেশালিটি স্বীকৃত স্বাস্থ্য পরিষেবা বাদেই। অতএব, সরকার বাহাদুর বাধ্য হয়েছে সেটি উদ্বোধনের পরপরই ‘সিল’ করে দিতে! এমন ঘটনা ভূভারতে সত্যিই বেনিজর। এই অভূতপূর্ব কীর্তি স্থাপন করে শিরোনাম দখল করেছে একটি ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্য। তাও আবার যেমন তেমন রাজ্য নয়, মোদি-শাহ জুটি যেখানকার ভূমিপুত্র, অর্থাৎ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিয়ে যে রাজ্যের গর্ব ও আবেগের শেষ নেই, সেই গুজরাত। কেলেঙ্কারিটা সুরাতের পান্ডেসরা এলাকার। উদ্বোধন অনুষ্ঠানের জন্য বিলি করা কার্ডে বিশিষ্ট অতিথির তালিকাটি বেশ আলো ঝলমলে: সুরাতের মিউনিসিপাল কমিশনার (আইএএস) শালিনী আগরওয়াল, পুলিস কমিশনার অনুপম সিং গেহলট (আইপিএস) এবং জয়েন্ট সিপি (ক্রাইম) রাঘবেন্দ্র বৎস (আইপিএস)। যদিও পুলিসের তরফে দাবি, বিশিষ্ট অতিথিদের সম্মতি ছাড়াই তাঁদের নামে ইনভিটেশন কার্ড ছাপানো ও বিলি করা হয়েছিল। সর্বোপরি এই হাসপাতালের পাঁচ সহ-প্রতিষ্ঠাতারই নামে রয়েছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। তাঁদের ডাক্তারি পাশের সার্টিফিকেটের বৈধতা নিয়েই আসল প্রশ্ন। সুরাত পুলিসের ডিসি (৪) বিজয় সিংহ গুর্জর সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি যে, বৈধ ডিগ্রি ছাড়াই ডিসপেনসারি চালানোর অভিযোগে দুই ডাক্তারকে এসওজি এবং পান্ডেসরা পুলিস গ্রেপ্তার করেছিল। এক ডাক্তারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আইনে সুরাত, সুরাত (গ্রামীণ) এবং নভসারি থানায় তিন তিনটি মামলা রয়েছে। আপাতত স্বাস্থ্যদপ্তরের রিপোর্টের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।’
Advertisement
পান্ডেসরার কর্মযোগী সোসাইটিতে জনসেবা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল নামের এই দ্বিতল ভবন সম্পর্কে সুরাতের মুখ্য জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক (সিডিএইচও) অনিল প্যাটেল মিডিয়াকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য পোর্টালে এই হাসপাতালের নামে কোনও রেজিস্ট্রেশন নেই। এমনকী, আমাদের রেকর্ড খুঁটিয়ে দেখেও এমন হাসপাতালের কোনও অস্তিত্ব আমরা খুঁজে পাইনি।’ বায়ো-মেডিক্যাল বর্জ্য নিষ্কাশন, ডাক্তারদের গুজরাত মেডিক্যাল কাউন্সিলের (জিএমসি) রেজিস্ট্রেশন  এবং ফায়ার ডিপার্টমেন্টের এনওসির মতো জরুরি নথিগুলিও অভিযুক্ত কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। কড়া পদক্ষেপ করার জন্যই আমরা প্রয়োজনীয় দিকগুলি বিস্তারিতভাবে যাচাই করছি।’ রাজ্য সরকারের নিয়মে, প্রতিটি হাসপাতালের জন্য জেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্লিনিকাল এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট ২০২১-এর অধীনে একটি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এই হাসপাতাল সেটাও নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি বলেই অভিযোগ। ফায়ার অফিসার নরোত্তম খালাসি মিডিয়াকে বলেন, ‘এদের ফায়ার পাম্পগুলির সঙ্গে ইলেক্ট্রিক মোটরের কানেকশন পাওয়া যায়নি। আইনসিদ্ধ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রও এদের নেই। আগুন সংক্রান্ত আরও অনেক বিধি লঙ্ঘনের দিক আমরা খুঁজে পেয়েছি। এসবের ভিত্তিতেই হাসপাতালটি সিল করে দেওয়া হয়েছে।’
একটি বেআইনি বা ভুয়ো হাসপাতাল বন্ধ হল, এটা বড় খবর নয়—আসল খবর তো নেপথ্যে, যা এখনও সামনে আসা বাকি। চিকিৎসার মতো একটি মহৎ পেশা নিয়ে এত বড় জালিয়াতি করার সাহস কোত্থেকে পেল এই প্রতিষ্ঠানের মাথারা? তাদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি তো অল রেডি দাগি। তাদের মাথার উপর আইনের খাঁড়া ঝুলেই আছে, তারপরও তারা বুক ফুলিয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে! এর পিছনে শাসক দলের মদত নেই, একথা একটি শিশুকেও বিশ্বাস করানো যাবে না। তদন্তকারীদের হাত-পা যদি বাঁধা না-থাকে, তবে তাঁরা প্রথমেই সেটা খুঁজে বের করুন। সেই ‘কান’ টানলেই ‘মাথা’র নাগালও পাওয়া যাবে। এই ঘটনা গুজরাতে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার করুণ ছবিও সামনে এনে দেয়। কেননা, সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা চৌপাট না-হলে বেসরকারি চিকিৎসা পরিষেবা ক্ষেত্রের এমন রমরমা হবে কেন? প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যে ‘ব্যবসাটি’ এতটাই লোভনীয় হয়ে উঠেছে যে রাম-শ্যাম-যদু-মধুর অনুপ্রবেশও সেখানে ঠেকানো যাচ্ছে না। একটা রাজ্যে আইনের শাসন কোন তলানিতে পৌঁছলে যে-কেউ ডাক্তার সেজে বড় ভুয়ো হাসপাতাল খুলে ফেলারও সাহস পায়, ভেবে দেখতে হবে সেটাও। তার কিঞ্চিৎ নমুনা তো হাতের কাছেই: ‘ভুয়ো’ কর্মকাণ্ডে গুজরাতের হাত পাকানো এটাই প্রথম নয়, মাসকয়েক আগেই আমেদাবাদের বাভলা তালুকে ভুয়ো ডাক্তারের হাতযশে এক রোগীর মৃত্যু হয়। ভুয়ো আইপিএল ম্যাচ, সরকারি দপ্তর, টোল প্লাজা, আদালত—কী ভেলকিই না দেখিয়ে চলেছে এই ‘ডাবল ইঞ্জিন’! বাকি ছিল জনসেবা মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটাল, সেটাও দেখে নিল সারা দেশ। এই লজ্জা মহাত্মা গান্ধী, সর্দার প্যাটেল, মোরারজি দেশাইদের—কেননা তাঁরা এই গুজরাতের সুসন্তান বলেই জানে দেশ-দুনিয়া। মোদি-শাহরা তাঁদের সম্মান মর্যাদা রক্ষার যোগ্যতা হারিয়েছেন।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ