রাজা ভট্টাচার্য: দুপুরের খাবার খাওয়া হয়ে গেলে বাচ্চাগুলোকে আবার পড়তে বসানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। দুর্গার বকাবকি, রক্তচক্ষু— কিছুই তারা তখন আর গ্রাহ্য করে না। হয় ভাঙাচোরা স্কুলবাড়ি জুড়ে লাফিয়ে বেড়ায়, আর নইলে রীতিমতো ঘেরাও করে দুর্গাকে, ‘গল্প শোনাও আম্মি! গল্প! আজ আর পড়ব না আমরা!’
আজকেও ঠিক সেটাই হল। সকাল থেকেই মেঘ করছিল। দুপুর গড়াতেই নামল তুমুল বৃষ্টি। ঘরে আলো নেই, কাজেই এমনিতেও পড়াশোনার প্রশ্ন ওঠে না। গল্প বলেই সামলে রাখতে হবে এদের। বেশিরভাগ বাচ্চার বাড়ির যা দশা, তাতে এতক্ষণে নির্ঘাত ছাউনি বা চাল ভেদ করে জল পড়তে শুরু করে দিয়েছে। এখন এদের ছাড়া যাবে না।
‘আজ তোদের আমার বউ সাজার গল্প বলি শোন,’ আধভাঙা চেয়ারটায় বসে বললেন দুর্গা।
‘এ আবার কেমন গল্প! তোমার তো বিয়ে হয়েছিল! ছেলে আছে যে তোমার! ওই যে শচী চাচা!’
‘তুই বড্ড পাকা, লছমি!’ পাখার বাঁট দিয়ে বছর বারোর মেয়েটাকে মারার ভান করলেন দুর্গা, ‘বিয়ে হয়েছিল বইকি! কিন্তু সে তো সত্যিকারের বিয়ে! আজ তোদের বলব সাজানো বিয়ের গল্প।’
‘কিন্তু তোমার যদি বিয়েই হবে, তাহলে তোমার বর কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করল মহেশ। বাপ-মা মরা বাচ্চাটা মানুষ হচ্ছে দাদির কাছে।
‘আমার বর?’ বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল দুর্গার চোখ, ‘সে তো সেই কবেই...।’
তাঁর নিষ্প্রভ চোখে এখন ভেসে উঠছে এক উজ্জ্বল ধীমান যুবকের ছিন্নভিন্ন দেহ। বোমা ঠিকঠাক বানানো হয়েছে কি না, রাভী নদীর পাড়ে তা পরীক্ষা করতে গিয়েছিল মানুষটা। বন্ধুদের লাহোরের জেল থেকে উদ্ধার করে আনতে গেলে অস্ত্র চাই বইকি! সেই বোমা ফেটে গেল হাতের উপরেই। রক্তে ভেসে যাওয়া সেই দেহ...। তারই ছেলে এই শচী।
‘আমার বর তো সেই কবেই নিজেকে ঢেলে দিয়েছিল নদীর জলে। কিন্তু সে হল সত্যিকারের বিয়ে, সত্যিকারের বর। একেবারে বরের মতো বর যাকে বলে, বুঝলি?’ বলতে বলতে অসম্ভব গর্বে কেঁপে উঠল প্রৌঢ়া শিক্ষিকার ভাঙা গলা, ‘কিন্তু আমি একবার বউ সেজেছিলাম। শচী তখন একেবারে এইটুকু— কোলের ছেলে। সেই গল্প শোন বরং।’
....
একুশ বছর বয়স তখন তাঁর। তার মানে আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। স্বামী ভগবতী চরণ ভোহরা গিয়েছেন কলকাতায়। সেবার কংগ্রেসের অধিবেশন বসেছিল সেখানে। বাড়িতে কাজের লোক বাদ দিলে কেবল দুর্গা আর শচী— শচীনন্দ। তার তখন দু’বছর বয়স।
সেদিন উনিশে ডিসেম্বর। খুব ঠান্ডা পড়েছিল লাহোরে। সন্ধে হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ।
এমন সময় হঠাৎ কে যেন খুব মৃদু হাতে টোকা দিল সদর দরজায়। দু’বার, তারপর ছোট্ট একটা বিরতির পর আবার দু’বার।
এইবার বুকটা কেঁপে উঠল দুর্গার। এই শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দরজা খুলে দেওয়ার কথা ছিল।
প্রায় ছুটতে ছুটতে গিয়ে দরজাটা খুলে দিয়ে কিন্তু থমকে গেলেন দুর্গা।
তিনজন তরুণ দাঁড়িয়ে আছে মস্ত দরজাটার সামনে। তাদের মধ্যে দু’জনকে দুর্গা খুব ভালো করেই চেনেন। সত্যি বলতে কী, এই মুহূর্তে লাহোরে— আর শুধু লাহোরে কেন— গোটা ভারতবর্ষে বোধহয় এমন কাউকে পাওয়া যাবে না, যে এই দু’জনকে চেনে না। শুকদেব থাপার আর শিবরাম রাজগুরু। ‘হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক অ্যাসোসিয়েশন’ আর ‘নওজোয়ান ভারত সভা’-র দুই অগ্নিশিখা। সবে গত পরশুই সন্ডার্স— লালা লাজপত রাইয়ের খুনি সেই পুলিশ সাহেবকে তো এরাই গুলি করে মেরেছে। খ্যাপা কুকুরের মতো ইংরেজ পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে এদের।
কিন্তু অন্য ছেলেটাকে দুর্গা এর আগে কখনো দেখেননি। কম দিন হল না। দলের সবাইকেই চেনেন দুর্গা। কিন্তু এই ছেলেটি অচেনা। দাড়ি-গোঁফ কামানো ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, পরনে সাহেবি পোশাক, মাথায় টুপিটা পর্যন্ত আছে। এরকম জামাকাপড় পরা একটা ছেলের সঙ্গে শুকদেব আর রাজগুরু কী করছে?
‘আসতে পারি, ভাবি?’ নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল শুকদেব। এই নামেই পার্টির সবাই দুর্গাকে ডাকে।
‘এসো, এসো। তাড়াতাড়ি।’ ব্যস্ত হয়ে বললেন দুর্গা। এই অবস্থায় এরা এমন খোলাখুলিভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেন?
ওরা ঘরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিলেন দুর্গা। বললেন, ‘বোসো। খাবে কিছু?’
‘নাহ। একটু আগেই খেলাম। দু’দিন পর।’ সামান্য হাসল শুকদেব, ‘পরিচয় করিয়ে দিই— এই ছেলেটি আমাদের নতুন বন্ধু।’
জামাকাপড় যেমনই হোক, ওদের বন্ধু যখন, ভালো ছেলেই হবে। বয়স তো মনে হচ্ছে দুর্গার মতোই। হাত তুলে দুর্গা বললেন, ‘নমস্তে। আপনাকে তো আগে কখনো দেখিনি!’
এতক্ষণ মাথা নীচু করে, একটু জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল অল্পবয়সি ছেলেটা। এইবার উঠে দাঁড়িয়ে টুপিটা খুলে রেখে হাতজোড় করে বলল, ‘নমস্তে ভাবি। আপনারা সবাই ভালো আছেন তো?’
মাথা নেড়ে দুর্গা বললেন, ‘হাঁ ভাইয়া। আপনার নামটা?’
কয়েক সেকেন্ড স্থির ধারালো চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ সোফায় বসে থাকা শুকদেব আর রাজগুরুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটি। তারপর হাসি-ভরা গলায় বলল, ‘বলেছিলাম না? এবার বিশ্বাস হল তো?’
আর কী আশ্চর্য, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও হো হো করে হেসে উঠল দুই বন্ধু। উঠে দাঁড়িয়ে সটান জড়িয়ে ধরল নতুন ছেলেটাকে। রাজগুরু বলল, ‘নাহ, আর ভয় নেই। ভাবি যখন চিনতে পারেননি, তখন পুলিশের বাবার সাধ্য নেই তোমায় চিনতে পারে, ভগৎ!’
দুর্গার চোয়াল ঝুলে পড়ে মুখটা হাঁ হয়ে গেল। ভগৎ? এই ছেলেটা? মানে এই ক্লিন শেভড ছোটো ছোটো করে চুল ছাঁটা ছেলেটাই ভগৎ সিং? যে দু’দিন আগে ওই হতচ্ছাড়া সন্ডার্সকে গুলি করে মেরেছে? ওর দাড়িগোঁফ, ওর বড়ো বড়ো চুল গেল কোথায়? এ কী কাণ্ড! ওকে যে তিনি কতবার দেখেছেন, তার ঠিক নেই! তবুও চিনতে পারলেন না? হা ঈশ্বর!
‘সত্যিই চিনতে পারিনি! ভগৎ, এটা তুমি?’ নিজের হতভম্ব ভাবটা লুকানোর চেষ্টাও করলেন না দুর্গা।
‘আমিই। আর আমরা একটা অদ্ভুত প্ল্যান করেছি।’ এইবার ভগতের মুখ থেকে মুছে গেল হাসির রেখা, ‘সেটা আপনাকে বলবে শুকদেব।’
দুর্গার চোখ ঘুরে গেল শুকদেবের দিকে। কয়েক মুহূর্ত মাথা নীচু করে বসে থেকে শুকদেব বলল, ‘মন দিয়ে শুনুন ভাবি। এই কাজ আপনি ছাড়া আর কেউ পারবে না। লাহোরে থাকা আমাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। তাই আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি...।’
বিপ্লবীদের জন্য অসংখ্যবার অজস্র ধরনের ঝুঁকি নিয়েছেন ভোহরা দম্পতি। কিন্তু আজ শুকদেব যে প্রস্তাব দিচ্ছে, তা যেন অবিশ্বাস্য। শুধু দুর্গা নন, এই পরিকল্পনায় প্রাণ বিপন্ন হতে পারে ছোট্ট শচীরও। কিন্তু তার চাইতেও বড়ো কথা, একজন ভারতীয় নারীর সবচাইতে স্পর্শকাতর জায়গাটিকে আজ পেরিয়ে যেতে হবে দুর্গাকে।
শুকদেবের কথা শুনতে শুনতে দুর্গার মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। হ্যাঁ, এই পরিকল্পনা অবিশ্বাস্য। কিন্তু পরাধীন দেশের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে এই ঝুঁকি নিতেই হবে। তিনি ছাড়া এই মুহূর্তে আর কেউ নেই, যে ভগৎকে বাঁচাতে পারে।
অখণ্ড মনোযোগের সঙ্গে শুকদেবের কথা শুনতে লাগলেন দুর্গা।
পরদিন ভোরে ভোহরাদের বাড়ির প্রকাণ্ড ফটক পার হয়ে বেরিয়ে এল একটা ঘোড়ার গাড়ি। তাতে বসে আছে সাহেবি পোশাক পরা এক ঝলমলে চেহারার যুবক, পাশে তার স্ত্রী, কোলে বছর দুয়েকের ছেলে। পিছনের সিটে বসে আছে তাদের চাকরটা। মলিন ধুতি, খালি গা। বাক্সপ্যাঁটরায় প্রায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে বেচারি।
গাড়ি এসে পৌঁছাল লাহোর স্টেশনে। এই কাকভোরেও পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ স্টেশন। প্রত্যেককে জেরা করছে তারা। খুলে দেখছে সঙ্গের মালপত্র। এই সাহেবি চেহারার দম্পতিকে অবশ্য তারা আটকাল না। তারা খুঁজছে দাড়িগোঁফে মুখ ঢাকা, পাগড়ি পরা এক শিখ তরুণকে। মালপত্র মাথায় নিয়ে প্রায় টলতে টলতে চলা ছোকরা চাকরটার দিকে তো তারা ফিরেও তাকাল না।
‘তিনটে টিকিট। লখনউয়ের। দুটো ফার্স্ট ক্লাস, একটা থার্ড ক্লাস।’ টিকিট কাউন্টারে পৌঁছে নিখুঁত সাহেবি উচ্চারণে বলল পরিবারের কর্তাটি। বোঝাই যাচ্ছে, কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরে চলেছেন লখনউয়ে। চাকরটা উঠবে থার্ড ক্লাসে।
খবরের কাগজে মুখ ঢেকে পাশেই বসে থাকা পুলিশের চরটা আর কাগজ সরাল না। পাকা খবর আছে, সন্ডার্সের খুনিরা কলকাতায় পালাবে। লখনউ নয়।
ইংরেজি টানের হিন্দিতে লোকটা বলল, ‘সামান তুলে দিয়ে নিজে থার্ড ক্লাসের কামরায় উঠে যা। লখনউ ঢুকলে ফার্স্ট ক্লাসের সামনে চলে আসবি।’
‘জি হুজুর!’ বলে মাল তুলে দিয়ে ছুটতে ছুটতে চলে গেল চাকর।
‘কাম ডার্লিং! দিস ওয়ে।’ প্ল্যাটফর্মের দিকে গটগট করে এগিয়ে গেল লোকটা। স্টেশনে পৌঁছেই সে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিয়েছে নিজের কোলে, ফলে মুখের অর্ধেকটা এমনিতেই ঢেকে গিয়েছে। ঠান্ডা খুব, তাই ওভারকোটের কলারটা তোলা। ডানহাতটা লুকিয়ে রেখেছে কোটের পকেটে।
বাইরে থেকে অবশ্য বোঝার কোনো উপায় নেই, সেই হাত সারাক্ষণ ছুঁয়ে আছে একটা গুলি-ভরা রিভলবার। যেকোনো মুহূর্তেই পরিস্থিতি পালটে যেতে পারে, একথা মাথায় রেখে পিস্তলটা তৈরি রেখেছে ভগৎ। ছোকরা চাকর সেজে একটু আগেই যে থার্ড ক্লাসের কামরায় উঠে গেল, সেই রাজগুরুর পকেটেও রয়েছে গুলি-ভরা পিস্তল। ধরা পড়ার কোনোরকম সম্ভাবনা থাকলে সেটা বের করতে এক সেকেন্ডও দেরি হবে না কারওর। না ভগতের, না রাজগুরুর।
বাইরে থেকে দেখে অবশ্য এসব কিছুই বোঝার কোনো উপায় নেই। এই সম্ভ্রান্ত দম্পতি তাঁদের সন্তানটিকে নিয়ে উঠে পড়লেন ফার্স্ট ক্লাসের কামরায়। এই টিকিটের টাকাটাও অবশ্য দিতে হয়েছে দুর্গাকেই। ভগৎদের কাছে একটা পয়সাও ছিল না। কলকাতায় যাওয়ার আগে এই টাকাটা তাঁর হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন ভগবতী চরণ নিজেই। বিপ্লবীদের যেকোনো মুহূর্তে টাকার প্রয়োজন হতে পারে। তখন যেন তাঁদের বিপন্ন হতে না হয়।
সেবার যথাসময়ে ভগৎ পৌঁছে গিয়েছিলেন লখনউ। তারপর সেখান থেকে কলকাতা। সেখানেও তাঁর লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ভগবতী চরণ। বাংলার বিপ্লবীদের সঙ্গে এইবার সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটেছিল সেই দুর্দমনীয় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের— যার নাম ভগৎ সিং।
....
‘সেদিন তুমি ভগৎ সিংয়ের বউ সেজে তাঁকে পালাতে সাহায্য করেছিলে, আম্মি?’ লছমিদের চোখে আজ বিপুল বিস্ময়, ‘তাহলে আজ তুমি এই গাজিয়াবাদে আমাদের মতো গরিব বাচ্চাদের পড়াও কেন? তোমার নেতা হতে ইচ্ছে করেনি কখনো? মন্ত্রী হতে?’
তাঁকে ঘিরে উন্মুখ হয়ে বসে থাকা বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন দুর্গাবতী দেবী। তারপর বললেন, ‘আমি... আমরা তো নেতা হওয়ার জন্য এসব করিনি! করেছিলাম দেশের জন্য। দেশ তো স্বাধীন হয়ে গিয়েছে! আমার কাজও শেষ। কিন্তু দেশের কাজ তো শেষ হয় না। এই যে আজ তোদের পড়াচ্ছি, এই আমার দেশের কাজ।’
....
সেদিন দেশের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বাজি ধরেছিলেন দুর্গাবতী দেবী। অন্য একজনের স্ত্রী সেজেছিলেন তিনি। আর কলকাতায় পৌঁছে যখন দেখা হল স্বামীর সঙ্গে, কী অসামান্য গর্বের সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ বুঝলাম, সত্যিকারের ক্রান্তিকারী কাকে বলে।’
এর চাইতে বড়ো পুরস্কার আর কীই বা চাইতে পারেন তিনি? একজন সত্যিকারের বিপ্লবী!