Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অসৎ প্রতিবেশী থেকে সাবধান

অসৎ প্রতিবেশী থেকে সাবধান
  • ৯ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অপারেশন সিন্দুর। ভারতের প্রথম প্রত্যাঘাত নয়। পহেলগাঁও টার্গেট কিলিংয়ের প্রথম জবাব ছিল সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি স্থগিত। পাকিস্তান পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ড ঘটায় ২২ এপ্রিল। প্রত্যুত্তরে, এই সন্ত্রাসবাদী পড়শির বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ করে ভারত। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযগ্যে হল সিন্ধু চুক্তির সামনে যবনিকা। সিন্ধু এবং তার উপনদীগুলির জল বণ্টনের জন্য ১৯৬০ সালে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছিল বিশ্ব ব্যাঙ্ক। পহেলগাঁও কাণ্ডের পর ভারত সাফ জানিয়ে দেয়, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে মদত বন্ধ না-করা পর্যন্তই এই চুক্তি স্থগিত থাকবে। পাকিস্তানের দাবি, এই চুক্তির উপরে সেদেশের ২৪ কোটি নাগরিকের বাঁচা-মরা নির্ভর করে। কেননা, সিন্ধু এবং তার দুটি উপনদী বিতস্তা ও চন্দ্রভাগা পাকিস্তানমুখী। এই তিন নদীর জলের উপর পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ কৃষিকাজ নির্ভরশীল। সিন্ধু অববাহিকাই পাকভূমির জীবনরেখা। পাকিস্তানের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জলাধারও এই এলাকায়। সিন্ধুর বাকি তিন উপনদী বিপাশা, শতদ্রু এবং ইরাবতী ভারতের উপর দিয়েই বইছে। পাকিস্তানের আশঙ্কা, সিন্ধু চুক্তি অকেজো হলে পাকিস্তানমুখী নদীগুলির জলপ্রবাহ অনিয়মিত হয়ে পড়বে। তীব্র জলসঙ্কট দেখা দিতে পারে ওই দেশজুড়ে। সেই চরম পরিস্থিতি ঠেকাতে মরিয়া ইসলামাবাদ। ভারতের পদক্ষেপকে তারা জলবোমার সঙ্গেই তুলনা করেছে! 

Advertisement

এই ব্যাপারে তাদের দ্বিমুখী তৎপরতা লক্ষণীয়। একদিকে ভারতের হাতে-পায়ে ধরছে এবং অন্যদিকে ধরছে আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের। সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি স্থগিত করার পর থেকে ভারত সরকারকে উপর্যুপরি চারটি চিঠি দিয়েছে পাকিস্তান। নরেন্দ্র মোদি সরকারের কঠোর সিদ্ধান্ত প্রতিবারই পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়েছে শাহবাজ শরিফের দেশ। চিঠিগুলি পাঠানো হয়েছে পাকিস্তানের জলসম্পদ মন্ত্রকের সচিব সৈয়দ আলি মুর্তাজার তরফে। ভারতের জলশক্তি মন্ত্রক চিঠিগুলি পাঠিয়ে দিয়েছে বিদেশ মন্ত্রকের কাছে। ব্যাপারটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, অপারেশন সিন্দুরের প্রত্যক্ষ আঘাত আপাতত থামল বটে সিঁদুরে মেঘ ঘনিয়ে এনেছে ভারতের জলযুদ্ধ। পাকিস্তানের জল-ভিক্ষার আর্জিতে ভারত এখনও কোনও সাড়া দেয়নি, পূর্ববৎ কঠিন কঠোর মনোভাবই বজায় রেখেছে। এদিকে দেখা দিয়েছে পানীয় জলের সঙ্কট। মাঠে মাঠে ফসলও শুকোচ্ছে জলের অভাবে। সামনে পড়ে আছে গ্রীষ্মের দাবদাহের বাকি দিনগুলি। সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের মাথায় বিনামেঘে বজ্রাঘাত! অনেক এবং ধারাবাহিকভাবে নষ্টামি পাকিস্তান করে এসেছে। কিন্তু মোদি সরকার এবার এমন মারাত্মক পদক্ষেপ যে করে বসবে, তা সম্ভবত পাকিস্তানের কোনও গনতকারই ভেবে পাননি। তাই পরিত্রাণ পেতে রাষ্ট্রসঙ্ঘ, এবং এমনকী ভারতের বিশিষ্ট বন্ধু দেশ রাশিয়ারও হাতেপায়ে পড়ে গিয়েছে শাহবাজ শরিফের প্রশাসন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির এখনও সাফ কথা, সন্ত্রাস আর বাণিজ্য একসঙ্গে চলতে পারে না। রক্ত এবং জলও বইবে না একত্রে। পাকিস্তানকে যেকোনও একটি রাস্তা বেছে নিতে হবে। ১০ মে ভারত এবং পাকিস্তান সংঘর্ষবিরতিতে সম্মত হলেও সিন্ধু চুক্তি নিয়ে ভারতের অবস্থান বদলায়নি। 
ভারতের এই ‘জলবোমা’ নিষ্ক্রিয় করার জন্য আর কী কী করা দরকার, ভেবেই পাচ্ছেন না নিজের দেশেই কোণঠাসা শাহবাজ শরিফ। তাঁর উপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ভারত যাতে তাদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হয়, সেই আশা নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে দরবার করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী নিজেই। তারই মধ্যে সিন্ধু জলচুক্তির পুনর্বহাল চেয়ে দিল্লির কাছে ফের চিঠি পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই একটি শান্তিকামী, মানবতাবাদী এবং গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি দেশ। ভারত কোনোদিনই সাম্রাজ্যবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি, নিজেও তেমন আচরণ করেনি এবং প্রতিবেশীর স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করেনি। তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলালে এবং তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কোনোভাবে বিঘ্নিত করার চেষ্টা হলে ভারত রেয়াত করে না। এই সংক্রান্ত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে ভারত সদর্পে সামরিক পদক্ষেপই করে। প্রতিপক্ষ বা শত্রুপক্ষ কে এবং কতটা ওজনদার, ভারত তা ভ্রুক্ষেপ করে না। এর একাধিক গৌরবময় দৃষ্টান্ত আমাদের আছে। পহেলগাঁও ইস্যুতে পাকিস্তান যে অপরাধ করেছে, তাকে হালকাভাবে নেওয়ার সামান্যতম সুযোগও নেই। বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে তাদের ধারাবাহিক অমানবিক আচরণকে। দেশটি কেবল জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘর নয়, তারা মানবতার শত্রু হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। সৎ প্রতিবেশী হয়ে বেঁচে থাকার কোনও দৃষ্টান্ত তারা আজ পর্যন্ত রাখেনি। তাই পাঁকে পড়ে কাতরানো পাকিস্তান সম্পর্কে আমাদের সাবধান থাকতেই হবে। মাথায় রাখতে হবে, বিপদ কাটিয়ে উঠলেই নোংরা দাঁত নখ ফের বের করতে পারেন শাহবাজ শরিফ এবং তাঁর রক্ষাকর্তা ‘ফিল্ড মার্শাল’ আসিম মুনির।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ