শান্তনু দত্তগুপ্ত: বিপুল জনাদেশ। এই একটি বাক্য ছাড়া বিজেপির এই বঙ্গজয়কে ব্যাখ্যা করা যায় না। যাবেও না। আর এই জনাদেশের নেপথ্যে রয়েছে নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর দলের প্রতি সাধারণ মানুষের অসীম প্রত্যাশা। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও তৃণমূল কংগ্রেস যা পারেনি, সেটাই করতে হবে বিজেপিকে। এবং সেই তালিকাটা দীর্ঘ। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীকে এই তালিকা হাতে নিয়েই বসতে হবে মসনদে। তাকাতে হবে সাধারণ মানুষের দিকে। আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, এবার যাবতীয় আশ্বাসকে বাস্তবের রূপ দেওয়ার পালা। একবার দেখে নেওয়া যাক, নতুন সরকারের থেকে মানুষ কী কী চায়।
ভোট পরবর্তী হিংসা যেন না হয়
ভোটের পর হিংসা। গত প্রায় এক দশক ধরে এই অভিযোগ করে এসেছে বিজেপিই। শহর থেকে শহরতলি, বারবার দরবার করেছে। এবার কিন্তু তাদের পালা। গৌরচন্দ্রিকা ভালো নয়। কারণ, গণনা চলাকালীনই জেলায় জেলায় শুরু হয়ে গিয়েছে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলা, বাড়িতে আগুন। সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, শমীক ভট্টাচার্য—প্রত্যেকেই আবেদন করছেন। কিন্তু বিজেপি কর্মীরা শুনছেন না। তাঁরা যাতে সংযত হন, সেই দায়িত্ব এবার নিতে হবে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকেই। প্রয়োজন হলে বার্তা দিতে হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। তাঁদের দিকে তাকিয়েই বাংলার মানুষ ঢেলে ভোট দিয়েছেন। তৃণমূল কর্মীদের নিশানা করতে গিয়ে বহু সাধারণ মানুষও কিন্তু আজ আক্রান্ত হচ্ছেন। ভিটেমাটি হারাচ্ছেন। তাঁদের রক্ষা করার দায়িত্ব নতুন সরকারের। আর এই আশা বাংলার মানুষের।
সরকারি চাকরি
নতুন প্রজন্মের ভোটার এই ইস্যুতেই ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। এবার চাকরি হবে। সরকারি চাকরি। বছরের পর বছর প্যানেল হয়ে পড়ে থাকবে না। চাকরির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হবে না। কেন্দ্রের মাপকাঠি অনুযায়ী ডিএ হবে। রাজ্যে সপ্তম বেতন কমিশন গঠন হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, শূন্যপদ পূরণ। বাংলায় শিক্ষক, ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত-পুরকর্মী ছাড়াই মোট সরকারি পদ প্রায় ৯ লক্ষ। এর মধ্যে রাজ্য সরকারি কর্মী মাত্র ৩ লক্ষ ১৭ হাজার ৯৫৪ জন। বাকি পদ ফাঁকা। এই সব পদ পূরণের বদলে চুক্তিভিত্তিক কর্মী ও সিভিক নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৩ লক্ষ। এছাড়াও থার্ড পার্টি চুক্তিভিত্তিক কর্মী রয়েছেন প্রায় ২ লক্ষ। অর্থাৎ প্রায় ৫ লক্ষ কর্মীর চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। নতুন সরকার এসে তাঁদের রাজ্য সরকারি কর্মী হিসাবে মান্যতা দেবে, এই আশাও রয়েছে তাঁদের। ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীরা চাকরির কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই দিনে আট-দশ ঘণ্টা কাজ করেন। এই মূল্যবৃদ্ধির বাজারে বেতনও তাঁদের যথেষ্ট নয়। আশায় আছেন তাঁরাও, নতুন সরকার এসে এই চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য কিছু করবে।
ভারী শিল্প ও কর্মসংস্থান
এবার বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার। এতদিন গুজরাত-হরিয়ানায় শিল্প সরে যাওয়ার যে ট্রেন্ড ছিল, সেই খরা কাটবে। শুধু ক্ষুদ্রশিল্প নয়, ভারী শিল্পও আসবে বাংলায়। স্থানীয় ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থান হবে। শুধু আবগারি এবং পর্যটন নয়, সব ক্ষেত্রে আয় বাড়বে। আশা করে বাংলা। তাই তারা ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। এই রাজ্যে কাটমানি থাকবে না। দুর্নীতি নয়। কোনো নেতার ঔদ্ধত্য নয়। তিনতলা ফ্ল্যাট খাড়া করতে গেলেও প্রতি স্কোয়ার ফিটে ২০০-৩০০ টাকা চাওয়া হবে না। বাড়ি তৈরির জন্য ইট-বালি কেনার জন্য সিন্ডিকেটের দাদাগিরির সামনে মাথা নীচু করতে হবে না। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেছে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই প্রত্যেকটি বিষয়ে তারা নিশ্চিত হবে। আশা করেছে। তাই ভোট দিয়েছে। বিপুল ভোট।
সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প
আর বন্ধ থাকবে না ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প। বন্ধ থাকবে না আবাস যোজনা। এই বিশ্বাস বাংলার। শুধু তাই নয়, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে এবার থেকে মিলবে ৩ হাজার টাকা। থাকবে মাতৃশক্তি প্রকল্পের সুবিধা।
থমকে যাবে না বার্ধক্য ভাতা। নতুন সরকারের কাছে এই আশা করছে বাংলা। করবেও। সামাজিক প্রকল্পের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিপুল ভোটে লাগাতার জিতেছেন। বঙ্গবাসীর একাংশের আশঙ্কা রয়েছে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুথ সাথী কিংবা যুবসাথীর মতো প্রকল্প বন্ধ করে দেবে। গেরুয়া চাদর গায়ে পরে এসে কেউ বলবে না, এখানে মাছের দোকান দেওয়া যাবে না। নিরামিষ ছাড়া কিছু খাওয়া যাবে না। বিজেপিকে আশ্বাস দিতে হবে... প্রমাণ করতে হবে, এই সব আশঙ্কা অমূলক। ডবল ইঞ্জিন সরকার বাংলার মানুষকে বঞ্চিত করবে না।
বাংলার জন্য প্যাকেজ
বিরোধী বেঞ্চে বসে বারবার রাজ্যের আর্থিক হাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বিজেপির বিধায়করা। আজ তাঁরাই সরকারে। কী হবে পশ্চিমবঙ্গের অর্থভাণ্ডারের? কীভাবে বাড়বে আয়? একটা বিষয় নিশ্চিত, এবার বাংলাও পাবে কেন্দ্রের প্যাকেজ। যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করে শেষ হবে থমকে থাকা প্রকল্প। সীমান্তে বসবে কাঁটাতার। কেউ বাধা দেওয়ার মতো থাকবে না। বিকশিত ভারতের পাশাপাশি হবে বিকশিত বাংলাও। এই আশা এ রাজ্যের মানুষের।
পরিষেবা
পথে বেরোলে বাস মিলবে। শুনতে হবে না, অফিস টাইম ছাড়া বাস চলবে না। রুট বাড়বে। মেট্রো রেলের পরিষেবা বাড়বে। অফিস থেকে ফেরার সময় রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর অপেক্ষা করতে হবে না। রাস্তায় থাকবে না খানাখন্দ, বিদ্যুৎ ঘাটতি হবে না, কল বসলে তাতে জলও মিলবে। এক একটি ভোট বাংলার মানুষ দিয়েছে এই আশায়। তারা আশাহত হতে চায় না। বাংলার ভোটাররা ভেবেছে, একবার অন্তত বিজেপিকে সুযোগ দিয়ে দেখি। সেই সুযোগ পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। পেয়েছেন অমিত শাহ। আর শুভেন্দু অধিকারীরাও।
বণিক মহল প্রতিক্রিয়া দিয়েছে—অন্ধকার সরিয়ে বিকশিত বাংলার সূচনা। আজ বাংলার মানুষ ভাবতেই পারে, সেই সূচনা তারা করেছে। গণতন্ত্রের মাধ্যমে। এক একটি ভোটের মাধ্যমে। যা বদলে গিয়েছে বিপুল জনাদেশে। অব কি বার সত্যিই ২০০ পার হয়েছে। সুযোগ দিয়েছে বাংলা। বিজেপিকে। নতুন বাংলা গড়ার জন্য। যে বাংলায় তোলাবাজি থাকবে না। দাদাগিরিও না। কাউন্সিলাররা আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে না। পদে আসার এক মাসের মধ্যে গলায় সোনার চেন ঝুলবে না। সাইকেল বদলে যাবে না বিলাসবহুল গাড়িতে। অনুপ্রবেশ থাকবে না। প্রত্যেক নাগরিক তার অধিকার পাবেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট কী হয়, তা বাংলা দেখিয়েছে। এই ভোট যতটা পড়েছে বিজেপির পক্ষে, তার থেকে অনেক বেশি তৃণমূলের স্থানীয় দুর্নীতির বিপক্ষে। তাই ডবল ইঞ্জিন সরকারের কাছে আজ বাংলার মানুষ আশা করে, এই জনাদেশের মর্যাদা তারা দেবে। প্রমাণ করবে, বাংলার মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়ে ভুল করেনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সুযোগ দিয়ে ভুল করেনি। তৃণমূল কংগ্রেসকে মসনদ থেকে সরিয়ে বাংলা ভুল করেনি।