Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

উত্তর চায় বঙ্গবাসী

সব মিলিয়ে ৪০ মিনিটের ভাষণ। এর মধ্যে প্রায় আড়াই মিনিট বাংলায়। মেঠো ভাষায় বলা যায়, ভোট আসছে। তাই বক্তৃতাবাজি করে গেলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

উত্তর চায় বঙ্গবাসী
  • ২৪ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সব মিলিয়ে ৪০ মিনিটের ভাষণ। এর মধ্যে প্রায় আড়াই মিনিট বাংলায়। মেঠো ভাষায় বলা যায়, ভোট আসছে। তাই বক্তৃতাবাজি করে গেলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই নিয়ে গত দু’মাসে তিনবার বঙ্গসফর হয়ে গেল তাঁর। কৌশল একই। আসবেন কোনও সরকারি কর্মসূচিকে সামনে রেখে। যেমন এবার মেট্রোর উদ্বোধন। সঙ্গে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে ভোটের বার্তা। রথ দেখা, কলা বেচার ব্যবস্থা একইসঙ্গে। আগে এমন মঞ্চে বক্তৃতা শুরু ও শেষ করতেন ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে। এখন ভোটের বাংলায় বঙ্গবাসীর আবেগ ছুঁতে মা দুর্গা থেকে কালী। সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত থেকে গোষ্ঠ পাল, হরিনাথ দে থেকে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মনীষী, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম তাঁর বক্তৃতাজুড়ে ঘোরাফেরা করেছে। দাবি করেছেন, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে তাঁর সরকার সব সময় সচেষ্ট থেকেছে। মোদির ভোটমুখী ভাষণে শোনা গিয়েছে, হরেক রকমের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির কথা। অনুপ্রবেশ থেকে দুর্নীতি রুখতে তাঁর সরকারের বদ্ধপরিকর অঙ্গীকারের কথা এবং এসব কারণেই রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে ‘আসল পরিবর্তনে’র ডাক দিয়েছেন তিনি। তাঁর নতুন স্লোগান, ‘বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই।’ 

Advertisement

কিন্তু ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়া ইস্তক গত এগারো বছরের অভিজ্ঞতা হল, মোদি শুধু বলেন, শোনেন না। তিনি কোনও প্রশ্নের সরাসরি ও স্পষ্ট জবাব দেন না। সংসদে বিরোধীদের তোলা বহু প্রশ্নের জবাব তিনি সন্তর্পণে ও সুকৌশলে এড়িয়ে চলেন। তাঁর তিন দফার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে মূলত প্রশ্ন এড়াতেই সেভাবে কোনও সাংবাদিক বৈঠক করেননি। ফলে ক্ষমতায় আসার পর বছরে দু’ কোটি বেকারের চাকরি, প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নগদ ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কেন পূরণ হল না, সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। রাতারাতি নোটবন্দির ঘোষিত সুফল কেন পাওয়া গেল না, তার উত্তর আজও অজানা। জাতিদাঙ্গায় দু’ বছর ধরে মণিপুর জ্বললেও প্রধানমন্ত্রী কেন সেই রাজ্যে গেলেন না, কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কী করে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিরা ঢুকে পড়ল, কেন সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পাক অধিকৃত কাশ্মীর দখলের চেষ্টা করা হল না, বিশ্বের দরবারে পাকিস্তানকে কেন একঘরে করা গেল না, ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ থামাতে মধ্যস্থতা করেছেন বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার দাবি করলেও মোদি কেন তৎক্ষণাৎ তা সরাসরি নাকচ করলেন না— দেশের স্বার্থবাহী এমন নানা গুরুতর প্রশ্নে নীরবই রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী! তাঁর এই মৌনতা আসলে সরকারের অপদার্থতা ও ব্যর্থতা ঢাকতেই কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। 
দরজায় ভোট কড়া নাড়লে রাজনীতির কুশীলবরা আত্মপ্রচারে রত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রীও তাই বিজেপিকে এ রাজ্যে ক্ষমতায় আনার কথা বলে ভুল কিছু করেননি। কিন্তু তাঁর মনে রাখা প্রয়োজন ছিল, ভোট চাওয়ার অধিকার যেমন তাঁর আছে, তেমনই ভোটারদেরও তাঁর কাছে জবাব চাওয়ার অধিকার ষোলোআনা। তিনি অনুপ্রবেশের বিপদের কথা বলেছেন। কিন্তু অনুপ্রবেশ আটকানোর দায় তো বিএসএফ-এর। কারণ সীমান্ত প্রহরার দায়িত্ব তাদের। তাহলে কেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আড়াল করে তৃণমূল সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়া হচ্ছে? মোদিদের বিচারে মনে হয়, মুসলিমরা অনুপ্রবেশকারী, হিন্দুরা শরণার্থী। একই অভিযোগ সত্ত্বেও ধর্মের ভিত্তিতে কেন এই বিভাজন, তার উত্তরও জানতে চান ভোটাররা। খবরে প্রকাশ, মূলত বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষীদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে নিদারুণ অত্যাচার চালাচ্ছে সেইসব রাজ্যের পুলিস। খোদ বিজেপি’র এক নেতা বলছেন, বাংলা ভাষা বলে কিছু নেই! বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে অমিত শাহের দিল্লি পুলিস! এমন পাপ কাজের উত্তর প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান বঙ্গবাসী। প্রধানমন্ত্রীর ভোট-বক্তৃতায় তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। ঘটনা হল, এ রাজ্যে দুর্নীতির অভিযোগে দু’জন মন্ত্রী, বিধায়ক ও একাধিক পদাধিকারীর জেল হয়েছে। কিন্তু গোটা দেশে বিজেপিতে এমন ক’টা নজির আছে, তা জানান প্রধানমন্ত্রী। তথ্য বলছে, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ২৫ জন রাজনৈতিক নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়ে ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে গিয়েছেন! এ রাজ্যের বিরোধী এক নেতা কিংবা অসমের বিজেপি সরকারের এক হর্তাকর্তা কেন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরেও খাঁচার বাইরে রয়েছেন? এর জবাব চান বাংলার ভোটাররা। কিছু দুর্নীতি ও ভুয়ো জব কার্ড মেলায় কেন গোটা রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ, গ্রামীণ সড়ক ও আবাস যোজনার কাজে টাকা দেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে, একজনের অপরাধের শাস্তি কেন দশজন পাচ্ছে—প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার উত্তরও জানতে চান এ রাজ্যের মানুষ। বাংলার বিধানসভার ভোট হতে আরও অন্তত আট মাস বাকি। আশা করা যায়, ভোট প্রচারে মোদির বঙ্গসফর আরও গতি পাবে। কিন্তু পরের বার থেকে অভিযোগের পাশাপাশি ঝোলায় করে যাবতীয় প্রশ্নের উত্তরগুলো নিয়ে আসবেন মোদি—এমন আশা করা অন্যায় হবে না। ভোটে জেতানোর কথা বললে জনতা জনার্দনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটাও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ