ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে যায় চোখের নিমেষে। বদলে যায় সময়। সেই বদলের হাত ধরেই আসে নতুনের গন্ধ। প্রতিটি নতুন ভোর স্বপ্ন দেখায়। প্রতিটি নতুন বছর নিয়ে আসে আগামীর সম্ভাবনা। হালখাতার ভিড়ে নতুন জামা গায়ে ওঠে। ইংরেজি সালতামামি বসত করে ঘর দুয়ারে। তার মধ্যেও মায়ের ভাষা ভালোবাসা হয়ে জেগে থাকে। বাংলা স্বাগত জানায় নতুন বছরকে। তাকে ঘিরে উৎসবে মাতে বাঙালি। সাজ পোশাক, খাওয়া দাওয়ায় ঘিরে থাকে বাঙালিয়ানা। ঠিক যেমন চতুষ্পর্ণীর নববর্ষ ফ্যাশন শ্যুটে একেবারে বাঙালি লুকে ধরা দিলেন অভিনেতা জুটি সাহেব চট্টোপাধ্যায় এবং সুস্মিতা দে। ‘কথা’ ধারাবাহিকে তাঁদের জুটি দর্শকের পছন্দ। শ্যুটিংয়ের বাইরেও ফটোশ্যুটে এই জুটির কেমিস্ট্রি চোখে পড়ার মতো।
আড্ডার শুরুতেই সাহেব ফিরে গেলেন ছোটবেলার নববর্ষে। ‘ছোটবেলায় বছরের প্রথম দিন নতুন জামা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নতুন জামার স্মৃতিই সবথেকে বেশি মনে পড়ে। পয়লা বৈশাখের আগে মায়ের সঙ্গে গড়িয়াহাটে গিয়ে নতুন জামা কিনতাম। আগে পেতাম নতুন জামা। এখন দিতে হয়। বাবা, মায়ের জন্য নতুন কিছু কিনি। ১৪ নাকি ১৫ এপ্রিল, কোন দিনটা পয়লা বৈশাখ, সেই নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব থাকত। আমরাই বোধহয় শেষ প্রজন্ম, যারা এখনও বাংলায় ১২ মাসের সঠিক নাম বলতে পারব! আজ হয়তো সেই আমেজ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। বছরের প্রথম দিন অনেক বাড়িতেই পুজো হয়। কিন্তু আমাদের বাড়িতে ওই দিন পুজোর চল নেই। তবে হালখাতার বিষয়টা খুব মজার ছিল। বন্ধুরা মিলে পয়লা বৈশাখের সন্ধেবেলা হালখাতা করতে যেতাম বিভিন্ন দোকানে। নতুন ক্যালেন্ডার পেতাম, সঙ্গে মিষ্টির বাক্স,’ বললেন সাহেব।
ক্যালেন্ডারের প্রসঙ্গ উঠতেই কথার সূত্র ধরে ফেললেন সুস্মিতা। ‘ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে বিভিন্ন দোকানে গিয়ে মিষ্টি আর ক্যালেন্ডার নিতাম। মিষ্টির প্রতি খুব একটা টান ছিল না। নতুন ক্যালেন্ডার নিয়ে আমার বরাবর উৎসাহ ছিল। নতুন জামা হতো। দাদা, বোনের সঙ্গে গুনতাম। কার ক’টা নতুন জামা হল’, হেসে বললেন অভিনেত্রী। বাংলা ক্যালেন্ডার ঝাঁ চকচকে শহুরে জীবন থেকে কি একেবারেই উধাও হয়ে গিয়েছে? বাংলায় কত সাল শুরু হবে, সে উত্তরও কি সত্যিই আমজনতা জানে? ‘১৪৩২ আসছে তো?’, উত্তর যে সঠিক দিয়েছেন, সেটা বুঝেই সাহেব বললেন, ‘এটা আমাদেরই সাংস্কৃতিক অবনমন। এই যে আমরা বাংলার কত সাল সেটা বলতে পারি না, তার কারণ আছে। আগেকার দিনে ক্যালেন্ডারে সব দেওয়া থাকত। সকলের চোখে পড়ত। এখন ফোনের ক্যালেন্ডার মূলত ইংরেজিতেই হয়। আমার তো মনে আছে, অমাবস্যা, পূর্ণিমা সব ক্যালেন্ডারে থাকত। এখনও তেমন ক্যালেন্ডার পাওয়া যায়। কিন্তু অতীতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ওইসবের প্রভাব থাকত। এখন নতুন প্রজন্মের দৈনন্দিনে আর ওসবের প্রভাব নেই। কোথাও এসব আর ব্যবহার হয় না। ব্যবহার হলে হয়তো মানুষ মনে রাখত।’
পোশাকের ক্ষেত্রে সবসময়ই আরামকে প্রাধান্য দেন এই জুটি। বছরের প্রথম দিনের সাজে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া সুস্মিতার দারুণ পছন্দের। তাঁর কথায়, ‘শাড়ি পরতে আমি ভালোবাসি। বেশিরভাগ অনুষ্ঠানে শাড়িই পরি। বাঙালিয়ানার উৎসবে টিপ, লিপস্টিক, খোঁপা— এই সাজই ভালো লাগে। যে লাল শাড়িটা এই ফোটোশ্যুটে পরেছি, সেটা খুব সুন্দর। বছরের প্রথম দিন নতুন পোশাক পরতেই হবে, এই রীতিটা এখনও রয়েছে।’ সাহেব আবার বছরভর নানা ধরনের পোশাক পরেন। তার মধ্যে ধুতি-পাঞ্জাবির যুগলবন্দি তাঁর বিশেষ পছন্দের। অভিনেতার কথায়, ‘কাজের সূত্রে সারা বছরই অন্যান্য পেশার থেকে বেশিই ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরতে হয়। আলাদা করে পয়লা বৈশাখে বাঙালিবাবু সেজে ঘুরব, তেমন ধারণা কখনও ছিল না। আর ঐতিহ্যবাহী পোশাক শুধু পয়লা বৈশাখ বা দুর্গাপুজোয় পরতে হবে, এমনও কখনও মনে হয়নি। বাঙালি পোশাক এতটাই সুন্দর, আরামদায়ক যে ইচ্ছে হলেই পরা যায়। যে পোশাকগুলো শ্যুটিংয়েও পরেছি, এতটাই সুন্দর, কোনও অনুষ্ঠান ছাড়াও পরা যায়।’
বছরের প্রথম দিন হয়তো শ্যুটিংয়েই থাকবেন সাহেব ও সুস্মিতা। পেটপুজোর ব্যবস্থাও সেখানে। ভূরিভোজে উৎসাহী সাহেব বললেন, ‘দেখুন, ইংরেজি নতুন বছরের মতো পার্টি, সেলিব্রেশন পয়লা বৈশাখে কখনও হয় না। সেটাই ছোট থেকে শিখেছি। কোনও কোনও বছর ডিনারে যাই বাবা, মাকে নিয়ে। বাঙালি খাবারই খাওয়া হয়। লাঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় হয় না। কোনওবার বাড়িতেই মা বাসন্তী পোলাও, মাংস রান্না করেন। আর ‘কথা’-র সেটে প্রতি মাসেই কিছু না কিছু হয়। আমরাই মাটন কিনে আনি। রান্না হয়। প্রোডাকশন থেকে হয়তো একটু পোলাও করিয়ে দিল। চাটনি, পাঁপড়, মিষ্টি থাকে। লম্বা টেবিল পেতে সকলে একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করে। পয়লা বৈশাখেও সেটাই হয়তো হবে।’ বছরের বিশেষ দিনগুলোর এহেন সেলিব্রেশন উপভোগ করেন সুস্মিতাও।
পয়লা বৈশাখের আড্ডায় এক অদ্ভুত ঘটনা ভাগ করে নিলেন সাহেব। উদযাপনের মধ্যেও নাকি একটু সাবধানে থাকতে হয় তাঁকে। তার কারণ ব্যাখ্যা করে হেসে বললেন, ‘আসলে প্রত্যেক বছর ১৪ এপ্রিল, মানে পয়লা বৈশাখের আগের দিন আমার কোনও না কোনওভাবে রক্তপাত হতো! ছোট থেকেই এটা হয়ে এসেছে। এখনও সেজন্য আমি খুব সাবধানে থাকি। স্টিচ করাতে হয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে। ফলে এবারও শ্যুটিংয়েও সাবধানেই থাকব।’
স্বরলিপি ভট্টাচার্য