উনিশ শতক যেন বাঙালির কাছে দীর্ঘ নিদ্রার পর জাগরণের পালা। একই সময়ে এত মনীষীর উত্থান এর আগে বা পরে আর কখনো আমাদের ভাগ্যে ঘটেছে বলে মনে হয় না। আরও একবার আমরা ফিরে তাকাব আমাদের অতীতের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়ের দিকে।
উনিশ শতক যেন বাঙালির কাছে দীর্ঘ নিদ্রার পর জাগরণের পালা। একই সময়ে এত মনীষীর উত্থান এর আগে বা পরে আর কখনো আমাদের ভাগ্যে ঘটেছে বলে মনে হয় না। আরও একবার আমরা ফিরে তাকাব আমাদের অতীতের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়ের দিকে।
রাজা ভট্টাচার্য: একটু পরেই সন্ধ্যা নেমে আসবে। নিজের নিজের সেলে ফিরে যাবেন বন্দিরা। তার আগেই কথা বলতে হবে ওঁদের সঙ্গে। এই মুহূর্তে লাহোর সেন্ট্রাল জেলের লম্বা করিডোরে একজন রক্ষীকেও দেখা যাচ্ছে না।
দ্রুত পায়ে পাশের সেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন যতীন। মৃদু গলায় বললেন, ‘ভগৎ! শুনতে পাচ্ছ?’
ভিতর থেকে শোনা গেল সতর্ক কণ্ঠস্বর, ‘কে ওখানে?’
‘আমি কালীবাবু!’ বললেন যতীন।
এই গুপ্তনাম শুধু বিপ্লবীরাই জানেন। সঙ্গে সঙ্গেই সেল থেকে বেরিয়ে এলেন এক দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ যুবক, সঙ্গে এক তরুণ। একগাল হেসে বললেন, ‘আসুন কালীবাবু। এই সময়ে?’
ভূমিকার সময় নেই। চাপা গলায় যতীন বললেন, ‘শোনো ভগৎ। শোনো বটুক। আমাদের উপর যে নারকীয় অত্যাচার চলছে, তার একটা স্পষ্ট প্রতিবাদ হওয়া দরকার। শারীরিক অত্যাচার সহ্য করা আমাদের সকলেরই অভ্যেস আছে। কিন্তু প্রতি মুহূর্তের এই অপমান তো সহ্য করা যায় না!’
‘ঠিক বলেছ।’ মৃদু গলায় বললেন ভগৎ, ‘প্রতিদিন দেখছি, খাবারের উপর আরশোলা দৌড়চ্ছে, নোংরা পরিষ্কার করা হচ্ছে না, চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এমনিতেই শরীর ভেঙে পড়ছে সবার।’
‘অথচ আমরা রাজবন্দি!’ উত্তেজিত গলায় বললেন বটুকেশ্বর, ‘আর সাধারণ ইংরেজ কয়েদিদের দেখ! জেলে এসেছে ডাকাতি করে, খুন করে। তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা। চমৎকার থাকার ঘর, পরিচ্ছন্ন খাওয়া-দাওয়া!’
‘খবরের কাগজে পর্যন্ত পায় ওরা।’ ভগৎ সিং বললেন, ‘অপরাধীর জন্য জামাই-আদর, আর আমাদের জন্য কেবল নৃশংস অত্যাচার আর কুৎসিত খাবার।’
বোঝাই যাচ্ছিল, বহুদিন ধরেই এইসব অন্যায় ভগৎ আর বটুকেশ্বরের মনে আগুন জ্বালিয়েই রেখেছিল। আজ যতীন্দ্রনাথ শুধু সেই আগুনে ইন্ধন জুগিয়ে দিয়েছেন।
‘আর তাই আমরা ঠিক করেছি, এই ঘৃণ্য অপমানের একটা সোজাসুজি প্রতিবাদ হওয়া দরকার।’ গম্ভীর চাপা গলায় বললেন যতীন।
‘কিন্তু কীভাবে?’ জিজ্ঞাসা করলেন ভগৎ।
‘আমাদের এদিকে ষোলোজন মিলে ঠিক করেছি— আমরা এই অত্যাচারের প্রতিবাদ হিসাবে অনশন শুরু করব।’
‘দারুণ!’ উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন বটুকেশ্বর, ‘আমিও এই অনশনে যোগ দিতে চাই।’
‘আমিও!’ বললেন ভগৎ, ‘আমরা দু’জনেই আছি। কবে শুরু করা যায় বল?’
যতীনের চেয়ে ভগৎ মাত্র তিন বছরের ছোটো। বটুক ছ’বছরের। ভগতের সঙ্গে যতীনের পরিচয় অনেক দিনের— সেই যখন সান্ডার্সকে হত্যা করে ভগৎ পালিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতায়। কিন্তু শুধু সেই কারণে নয়। যতীন্দ্রনাথ দাসকে ভগৎ রীতিমতো সমীহ করে চলেন অসম্ভব ঠান্ডা মাথাটির জন্য। সব দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন যতীন। কিন্তু একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে তাঁকে আর সেখান থেকে সরিয়ে আনার সাধ্য কারও নেই।
যতীন বললেন, ‘আমরা ঠিক করেছি, পরশুদিন, মানে তেরোই জুলাই থেকে শুরু হবে অনশন কর্মসূচি। তাহলে তোমরাও সেই দিন থেকেই শুরু করে দাও।’
কয়েক সেকেন্ডের জন্য তিনজন ক্রান্তিকারীর চোখের দৃষ্টি পরস্পর নিবদ্ধ হয়ে রইল। তারপর সন্ধ্যার অন্ধকারে তিনটে হাত এসে মিলে গেল।
আবার নিজের সেলে ঢুকতে যাচ্ছিলেন ভগৎ আর বটুকেশ্বর। তার আগেই পিছন থেকে যতীন বললেন, ‘আর একটা কথা তোমাদের বলা হয়নি।’
দ্রুত ফিরে তাকালেন দু’জনে।
‘কথাটা শোনার আগে তোমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে, আমার কথার কোনো প্রতিবাদ তোমরা করবে না।’
ভগৎ ও বটুকেশ্বর অবাক হয়ে দৃষ্টি বিনিময় করলেন। এরকম গলায় যতীন্দ্রনাথকে কথা বলতে কখনো শোনেননি তাঁরা।
‘প্রতিজ্ঞা করছ?’ আবার জিজ্ঞাসা করলেন যতীন।
বিস্মিত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন দু’জনে, মাত্র মাস দুয়েক আগেই যাঁরা এই যতীন্দ্রনাথেরই তৈরি করা বোমা ছুড়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ইংরেজদের আইনসভা— সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি।
‘আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে, জেল কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের দাবিদাওয়া মেনে নেয়, তাহলে বাকি সকলেই অনশন প্রত্যাহার করে নেবে।’
‘সেটাই তো স্বাভাবিক!’ বললেন বটুকেশ্বর।
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি আর এই অনশন প্রত্যাহার করব না।’
‘সে কী কথা!’ চমকে উঠলেন ভগৎ, ‘তার মানে...।’
‘হ্যাঁ। আমি আর অনশন ভাঙব না। এই আমার অন্তিম প্রতিবাদ, ভগৎ। তোমরা যেমন অ্যাসেম্বলি হলে বোমা ছুড়ে পালানোর চেষ্টা করনি, আমিও তেমন এবার আর মৃত্যুর হাত ছাড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করব না। মিরজাফরের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমিই করব। প্রাণ দিয়ে সেই পাপ এবার আমি ধুয়ে দিয়ে যাব।’
স্তম্ভিত দুই সহযোদ্ধার সামনে আরও কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে দ্রুত পায়ে নিজের সেলের দিকে হেঁটে গেলেন যতীন্দ্রনাথ দাস। ভগৎ আর বটুকেশ্বর তখনও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
....
এর ঠিক দু’দিন পর শুরু হল অনশন। অন্য সেল থেকে তাতে যোগ দিলেন বটুক আর ভগৎও। দ্রুত সমস্ত জেলে, তারপর ক্রমে গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ল সেই সংবাদ। রাজবন্দিরা ইংরেজ পুলিশের অসহ্য নির্যাতনের প্রতিবাদ করার জন্য অনাহারে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রথমদিকে এই অনশনের গুরুত্ব বুঝতে পারেনি ইংরেজ সরকার। কিন্তু ঝড়ের বেগে চাপ বাড়তে লাগল। জেল কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারছিল, এই অনশন সারা পৃথিবীর সামনে ‘শ্বেতাঙ্গের দায়’ নামক কুৎসিত অজুহাতটিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
অনশনের অষ্টম দিনে ঘটে গেল এক জঘন্য ঘটনা।
তখন ঘুমচ্ছিলেন যতীন। হঠাৎ ভেঙে গেল ঘুম। বুঝতে পারছিলেন, অনাহারে দুর্বল হয়ে পড়া শরীরটা যেন তাঁর কথা শুনছে না। হাত-পা নাড়াতে পারছেন না তিনি।
সংবিৎ ফিরে পেতে যতীন বুঝতে পারলেন— সেলে ঢুকে পড়েছেন জেল-সুপার আর জেলের ডাক্তার। কয়েকজন অসম্ভব বলিষ্ঠ শক্তিশালী পাঠান তাঁর হাত-পা চেপে ধরে রয়েছে, আর ডাক্তার সাহেব তাঁর নাকের ভিতর দিয়ে একটা সরু নল ঢুকিয়ে দিয়েছে দুধ খাওয়ানোর উদ্দেশ্য নিয়ে।
মরিয়া হয়ে প্রাণপণে বাধা দিতে লাগলেন যতীন। তার উপর ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে মারাত্মক কাশি। যে কারণেই হোক, নল দিয়ে ঢুকে-আসা দুধ পাকস্থলীর বদলে চলে গেল ফুসফুসে। বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো একটা অবিশ্বাস্য যন্ত্রণা; তারপরেই সব অন্ধকার।
যতীনের জ্ঞান ফিরল দু’দিন পরে। কয়েক মুহূর্তের জন্য বুঝতেই পারলেন না— কোথায় আছেন তিনি। সামান্য চেতনা ফিরে আসার পর প্রথম যে জিনিসটা তাঁর চোখে পড়ল তা হল, তাঁর মাথার কাছেই রাখা রয়েছে একটা স্লেট আর পেনসিল।
তীব্র ক্ষোভে চোখ বন্ধ করে ফেললেন যতীন। এর একটাই অর্থ হয়। এ জীবনে তিনি আর কখনো কথা বলতে পারবেন না। সম্ভবত কণ্ঠনালী চিরতরে জখম হয়ে গেছে তাঁর। কিছু বলতে হলে তা লিখে বোঝাতে হবে।
সেদিন বিকেলেই অবশ্য সেলে এমন একজন ঢুকে পড়ল, যাকে দেখে এই অবস্থাতেও উজ্জ্বল হয়ে উঠল যতীনের শীর্ণ মুখ। কিরণ এসেছে। তাঁর ছোটো ভাই কিরণ দাস। কিরণকে এখানে, এই সময় দেখতে পাওয়ার কথা ভাবতেই পারেননি যতীন। দু’চোখে অনন্ত প্রশ্ন নিয়ে তিনি তাকিয়ে রইলেন ছোটো ভাইয়ের মুখের দিকে।
‘বড়োলাট লর্ড আরউইন নিজে ব্যবস্থা করে আমাকে এখানে আনিয়ে নিলেন দাদা।’ হাসিমুখে নিজের ব্যবহারের সামান্য কয়েকটা জিনিস সেলের কোনায় নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল কিরণ, ‘এখন থেকে আমি তোমার সঙ্গেই থাকব।’
যতীনের উজ্জ্বল চোখ দু’টি আস্তে আস্তে জলে ভরে উঠল। তিনি যে আর কারওর সাহায্য নেবেন না, তা বুঝতে পেরে স্বয়ং বড়োলাট এই ব্যবস্থা করেছেন। অর্থাৎ তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলির সাক্ষী হয়ে থেকে যাবে কিরণ। চোখের সামনে নিজের দাদাকে তিলে তিলে মরতে দেখার মতো শাস্তি পৃথিবীতে আর কী থাকতে পারে? সেই শাস্তি বীরের মতো, হাসিমুখে, মাথা পেতে গ্রহণ করেছে কিরণ।
....
অনশন শুরু হওয়ার ঠিক তিরিশ দিনের মাথায় এক বিকেলে ছুটতে ছুটতে দাদার কাছে এল কিরণ। যতীনের আজকাল প্রায়ই জ্ঞান থাকে না। আচ্ছন্ন ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকেন ছাদের দিকে। স্বভাববিরুদ্ধ উঁচু গলায় কিরণ বললেন, ‘দাদা, খুশির খবর!’
যতীনের নিষ্প্রভ চোখ দুটো সরে এল ভাইয়ের মুখের উপর। ভুরুতে ফুটে উঠল প্রশ্ন।
‘বড়োলাট আমাদের সমস্ত দাবিদাওয়া মেনে নিয়েছেন। কথা দিয়েছেন, সমস্ত প্রদেশে গড়ে উঠবে জেল অনুসন্ধান কমিটি।’
বাঁদিকে সামান্য বেঁকে গেল যতীনের মুখ। আজকাল এটাই তাঁর হাসির চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ অনাহারের ফলে দেহের ডানদিকে পক্ষাঘাতের লক্ষণ দেখা দিয়েছে ইতিমধ্যেই। তবু কিরণের বুঝতে অসুবিধা হল না, যতীনের আজ খুশির সীমা নেই। বাঁ-হাত তুলে খাওয়ার ভঙ্গি করলেন তিনি।
দ্রুত মাথা নেড়ে কিরণ বললেন, ‘হ্যাঁ, কালকেই সকলে অনশন ভঙ্গ করবেন।’
শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন যতীন। মুখ থেকে মুছে গেল উদ্বেগের সামান্য রেখাটুকুও। তিনি জানেন, জীবনের যে মোড়ে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন, সেখান থেকে আর ফেরার রাস্তা নেই। সত্যি বলতে কী, ফেরার ইচ্ছেও বিন্দুমাত্র নেই তাঁর। সব জেনে-শুনেই তো একদিন এই পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর সহযোদ্ধারা যে এইবার আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে, তাতেই তিনি খুশি। চোখের ইশারায় শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, ভগৎ আর বটুকেশ্বর কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল কিরণ। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল দু’দিকে।
একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে চোখ ঘুরিয়ে নিলেন যতীন। তিনি জানতেন, এই দু’জন অন্য ধাতুতে তৈরি।
কেটে গেল আরও কুড়ি দিন। যতীনের শরীর দ্রুত বিকল হয়ে আসছে। নিভে আসছে প্রদীপ। ফুরিয়ে আসছে তেল।
অনশন শুরু করার পঞ্চাশ দিন পরে আবার একদিন যতীনের মাথার কাছে এসে বসল কিরণ। মৃদু গলায় বলল, ‘দাদা, সরকার তোমার জামিন মঞ্জুর করেছে।’
ইদানীং যতীনের মুখের প্রায় সমস্ত পেশি অসাড় হয়ে গেছে। তবু বোঝা গেল, তীব্র ঘৃণায় তাঁর মুখ বিকৃত হয়ে গেল। কিরণ তাড়াতাড়ি বলল, ‘আমি আর বাবা— দু’জনেই এই জঘন্য প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি।’
আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল যতীনের দুই চোখ। বাবা! সেই মানুষটা— একদিন সাহেবরা যাকে বাড়ি ফেরার পথে ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছিল বলে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন! তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কী করে?
এর ঠিক ছ’দিন পরে তৈরি হল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য— ইতিহাসের এক অমর মুহূর্ত।
শেষ রাতে যতীনকে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার চরম উদ্যোগ নিল ইংরেজ সরকার। স্বয়ং জেলার আর ডাক্তার চললেন যতীনের সেলের দিকে সঙ্গে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী।
করিডোরে ঢোকার মুখে এসে অবশ্য থমকে গেল তাঁদের গতি। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করেছিল এমন এক দৃশ্য, ইতিহাসের পাতায় যা অমর হয়ে আছে।
যতীনের সেলে ঢোকার রাস্তাটা এই মুহূর্তে ঢেকে গিয়েছে তাঁর সহযোদ্ধাদের দেহে। পথ আগলে শুয়ে রয়েছেন তাঁরা। বোঝাই যায়, তাঁদের প্রত্যেককে হত্যা না করে যতীনের সেল পর্যন্ত যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
মরণাপন্ন অধিনায়ককে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে তাঁর সহ-বিপ্লবীদের মধ্যে থেকে— এমন সাধ্য কার?
সেদিন ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের পুলিশ। কয়েকজন নিরস্ত্র বিপ্লবীর সামনে মাথা নত করতে হয়েছিল তাদের।
এই ঘটনার ঠিক সাতদিন পরে নিভে গেল যতীন্দ্রনাথ দাসের জীবনপ্রদীপ। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই মিরজাফরের পাপ নিজের জীবন দিয়ে মুছে দিয়ে চলে গেলেন তিনি।
শুধু সেই আত্মাহুতির অন্ধকার প্রাকারে আগুনের অক্ষরে লেখা রইল একটি গান—
‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ—,
হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত-পানে চাহো।।’
যতীন্দ্রনাথের মৃতদেহ যেদিন লাহোর থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছয়, সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই মরদেহের অনুগমন করেছিলেন। আর নিষ্ফল যন্ত্রণায় সমস্ত রাত্রি ছটফট করে এই গানটি রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।