পক্ষে
পক্ষে
দীপমাল্য চন্দ্র
আমরা যত আধুনিকতার দিকে পা বাড়াচ্ছি, এবার বিতর্কের কথাটি ততই অঙ্কের সূত্রের মতো প্রমাণিত হচ্ছে। চৈত্র মাস আসা মানেই ‘সেল’ নামক শব্দের প্রলোভনে শপিং মল কিংবা মার্কেটে ভিড় জমে, তাতেই বোঝা যায় বাংলার নতুন বছর দরজায় কড়া নাড়ছে। এমন চোখ ধাঁধানো বিপণন কায়দায় ঢোক না গিলে উপায় আছে। তারপর নববর্ষের দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় টুক করে একটা ই-উইশ কার্ডেই সৌজন্য শুভেচ্ছা সারা। বিকেল গড়াতেই দোকানগুলোতে লাইন পড়ে হালখাতার। বাড়িতে আসে বাক্সভর্তি মিষ্টি আর বাংলার নতুন বছরের ক্যালেন্ডার। বাংলার সনের প্রতি ভালোবাসার আয়ু ওইটুকুই!
গৃহশিক্ষক
কৃষ্ণপ্রসাদ জানা
আজকাল আমরা যেভাবে বাংলা নববর্ষ পালন করি, তার অনেকটাই শুধু যেন ব্যবসায় গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে নববর্ষের আগের সপ্তাহ জুড়ে নানা দোকানে ‘চৈত্র সেল’ চলে, যা মূলত পণ্য বিক্রির কৌশল। এই সেল ঘিরে মানুষের আগ্রহ, কেনাকাটা, সাজসজ্জা সবই যেন নববর্ষের প্রকৃত আবেগকে ছাপিয়ে যায়। নববর্ষের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন গান, নাচ, বৈশাখী মেলা সবই যেন আবেগহীন। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা নববর্ষের মানেই যেন চৈত্র সেল-এ কেনা নতুন জামা। বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সময় তাদের নেই।
কলেজ পড়ুয়া
মৃণাল অধিকারী
বাঙালির নববর্ষ আসে চৈত্র মাসের শেষের দিকে চড়ক আর চৈত্র সেলের হাত ধরে। দিকে দিকে দোকানপাট সেজে ওঠে জামা কাপড় আর জুতোর সম্ভারে। কেনাকাটার হিড়িক পড়ে যায় এই সময়ে। অল্প দামে পাওয়া যাবে এই ভাবনায় মেতে ওঠে মানুষের মন। বিশেষত মহিলারা এই বিষয়ে খুবই উৎসাহী। ক’দিন ধরে চলে চৈত্র সেলের হইহই রব। যা মনে করায় নববর্ষ যেন আসতে চলেছে চৈত্র মাসের সেলের হাত ধরেই। শুরু হয় নববর্ষ। মিষ্টিমুখ, হালখাতা। ওখানেই সব শেষ। অথচ বাংলার কত সাল হবে এবার জিজ্ঞেস করে দেখুন কোনও বাঙালিকে, তাতেও হোঁচট খাবে তারা।
বেসরকারি চাকুরে
অরুণাভ সাহা
বাংলা নববর্ষের আগমন বাস্তবে শুধুমাত্র চৈত্রসেলের মাধ্যমেই বোঝা যায়। বিভিন্ন বিপণিতে ৫০% ছাড়ের ঘোষণাই এখন একমাত্র দ্যোতনা দেয় আগামী বছরের। বসন্তের আবির্ভাব ও অন্তর্ধান আজ মূলত স্মৃতিনির্ভর। বাংলা নববর্ষের প্রাসঙ্গিকতাও একইভাবে স্মৃতিতে ঠাঁই পেয়েছে। বাংলা তারিখ শুধুমাত্র পঞ্জিকাতেই আজ সীমাবদ্ধ। গুরুজনদের প্রণাম করা হোক বা মিষ্টিমুখ, সবকিছুই কিছুটা আবেগহীন। অথচ চৈত্রসেলে কেনাকাটা করে না এমন বাঙালি আজও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বছরভর কাজ চালানোর পোশাক কেনার জন্য বাঙালি চৈত্রসেলের অপেক্ষাতেই থাকে। গড়পরতা বাঙালি চেষ্টা করে নতুন বছর নতুন জামা পরার এবং পরিবারকে পরানোর। বিভিন্ন বিপণিতে হালখাতাও সামগ্রিকভাবে চৈত্র সেলেরই বাণিজ্যিক রূপের প্রতিফলন। সর্বোপরি চৈত্রসেলের ছাড়ের অঙ্কই বাঙালিকে প্রভাবিত করে কেতাবি নববর্ষের তুলনায়।
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী
বিপক্ষে
বিশ্বজিৎ কর
বাংলা নববর্ষ কেবল চৈত্র সেলেই সীমাবদ্ধ নয়! বাংলা নববর্ষ এক আবেগ, বাংলা নববর্ষ সুস্থ সংস্কৃতির এক শ্বেতশুভ্র ক্যানভাস! আমাদের বাংলা সুমহান কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সুবাসে আমোদিত! চৈত্র সেল তো হিসাব বুঝে নেওয়ার খোলা খাতা! নববর্ষের প্রথম দিনেই বাঙালিয়ানার অদ্ভুত এক মন ভরানোর আমেজ, নববর্ষের বৈঠকে মননশীলতার ফল্গুধারা, মহামিলনের স্বতঃস্ফূর্ত বাতাবরণে কুশল বিনিময়ের মধুর ছন্দ! উজ্জ্বল বাঙালিয়ানার রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নেওয়ার দিন! বাংলার মাটির মনকাড়া চেনা গন্ধে, বাংলার জলের কলকল ধ্বনিতে নব আনন্দে জেগে ওঠে মন। এ এক অনাস্বাদিত মুহূর্ত! কবির ভাষায় বলি, ‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক...!’
অবসরপ্রাপ্ত কর্মী
প্রেরণা নস্কর
চৈত্র অবসানে শেষ হল বর্ষ। এল নতুন বছর, নববর্ষ। পয়লা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। বছরের শেষে বিভিন্ন দ্রব্যের উপর ছাড় দিয়ে ব্যবসায়ীরা চৈত্র সেল শুরু করেছে যাতে তারা নববর্ষের দিন লক্ষ্মী-গণেশ পূজা করে নতুনভাবে ব্যবসার উন্নতি করতে পারে। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে নববর্ষের কোনো যোগসূত্র নেই। বাঙালিরা বিশ্বাস করে যে নববর্ষের দিনটি তারা যেভাবে পালন করবে সারাবছর তেমনই যাবে। এর মাধ্যমেই বোঝা যায় বাঙালিদের কাছে নববর্ষের গুরুত্ব কতখানি। বছরের প্রথম দিন বাঙালিরা ভোরে উঠে নিম হলুদ মেখে স্নান করে নতুন বস্ত্র পরে পূজা অর্চনা করে, ভুরিভোজের ব্যবস্থা হয় এবং বিকেলে প্রতিটি দোকানে হালখাতা হয় যেটির প্রতি বাঙালির আগ্রহ অপরিসীম। তাই চৈত্র সেল বাঙালির কাছে অতটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা নববর্ষ গুরুত্বপূর্ণ। এর আবেগ সীমাহীন। নববর্ষ কখনও চৈত্র সেলে সীমাবদ্ধ নয়।
কলেজ ছাত্রী
সান্তনা বিশ্বাস
বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ। পুরনো বছরের জীর্ণতা, মলিনতা ঘুচিয়ে নতুন বছরের শুভ সূচনা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা প্রভৃতি অনুষ্ঠানের আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে। প্রাচীনকাল থেকেই জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির প্রাণের উৎসব এটি। দেশে-বিদেশে সর্বত্রই বাঙালি নিজের মতো করে পয়লা বৈশাখ দিনটিকে উদযাপন করে। গ্রাম বাংলায় মানুষ নানারকম পুজো, রীতিনীতি পালনের মাধ্যমে নতুন বর্ষকে স্বাগত জানায়। এমনকী বিভিন্ন গ্রামীণ মেলার আয়োজন করে আনন্দে শামিল হয়। শহরেও মানুষ বাঙালিয়ানায় মেতে ওঠে, নতুন পোশাক পরিধান করে, বাঙালি খাবার উপভোগ করে। তাই বাংলা নববর্ষ কেবল চৈত্র সেলেই সীমাবদ্ধ— একথা যথার্থ নয়। শহর- গ্রাম-দেশ-বিদেশ সর্বত্র বাঙালি তার সাধ্যমতো বর্ষবরণে যোগদান করে এই পার্বণের ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে।
গৃহবধূ
রঞ্জন চৌধুরী
বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ আজও একটি সর্বজনীন লোক উৎসব। সর্বত্রই এক আনন্দঘন পরিবেশে এই দিনটিকে বরণ করে নেওয়া হয়। ফেলে আসা দিনগুলোর সমস্ত গ্লানি, ভুলভ্রান্তি ও সকল ব্যর্থতা ভুলে গিয়ে নতুন করে সুখশান্তি ও সমৃদ্ধি কামনার মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতি নববর্ষ পালন করে থাকে। এই উৎসবেরই একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্গ হালখাতা। গ্রামগঞ্জ ও শহরে সমস্ত ব্যবসায়ীরা সারা বছরের হিসেবনিকেশ শেষ করে নতুন খাতা ব্যবহার করে। সেই সঙ্গে নতুন পুরনো খরিদ্দারদের মিষ্টিমুখ করার প্রবণতা আজও বিদ্যমান। বাংলা নববর্ষ যে আসছে, তা কেবল চৈত্র সেলই জানান দেয় না।
সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন ঘটে আমাদের এই নববর্ষ উৎসবে। তাই এই উৎসব সমগ্র বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে আজও।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী