সায়ন চট্টোপাধ্যায়, শিলিগুড়ি: শিলিগুড়ি শহরের বিভিন্ন খাতা-বইয়ের দোকানে গিয়ে ঢুঁ দিচ্ছিলেন শক্তিগড়ের নবজিত্ সরকার। সঙ্গে ছেলেকেও এনেছেন। নববর্ষ উপলক্ষ্যে বাংলা গ্রিটিংস কার্ড কিনে দেবেন বলে। কিন্তু আশ্রমপাড়া থেকে প্রধাননগর ঘুরেও কার্যত হতাশ হতে হল তাঁকে। ইংরেজি কার্ড পড়ে থাকলেও দোকানে বাংলা নববর্ষের কার্ডই নেই। দোকানিও হাত তুলে দিয়েছেন। অতএব, মন খারাপ করে ঘরে ফেরা ছাড়া গতি কি! নবজিতবাবুর কথায়, ছোটবেলায় নববর্ষের জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। বাংলায় লেখা কার্ড বন্ধুদের দেওয়ার যে কি আনন্দ, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এখন একটা মেসেজ ফরোয়ার্ড করেই ‘দায়সাড়া’ শুভেচ্ছা জানানোর পালা চলছে। কার্ড বিনিময়ের মাধ্যমে বন্ধুদের দেখা হওয়া, একাত্ম হওয়ার রেওয়াজটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
এক দশক আগেই, বাংলা নববর্ষের দিন কয়েক আগে থেকে খাতা বইয়ের দোকানে ভিড় করত ছোটরা। নিজে হাতে বাছাই করে নিত বাংলা গ্রিটিংস কার্ড। কেউ কিনত স্কুলের সহপাঠীর জন্য, কেউ বা পাড়ার বন্ধুদের জন্য কেউ আবার বেস্ট ফ্রেন্ডের জন্য। ‘প্রিয়বন্ধু’-র জন্য সবচেয়ে বড় কার্ড কেনার চল ছিল সেসময়। অনেকে সযত্মে রেখে দিতেন সেই স্কুলজীবনের কার্ড। কিন্তু স্মার্টফোন, ডিজিটাল গ্রিটিংসের যুগে ধীরে ধীরে সেসব এখন অতীত। টুক করে মেসেজ করে দিয়েই শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়ে দেওয়া যায়। কেউ বা একটা স্ট্যাটাস ছেড়েই হাঁপিয়ে যান। জন্মদিন থেকে নিউ ইয়্যার। তাহলে এই সংক্রমণ থেকে নববর্ষই বা বাদ যায় কেন?
এক্ষেত্রে সব পেশার মানুষের অভিজ্ঞতা প্রায় সমান। শুধুই কি এই আঁচ পড়েছে শিলিগুড়িতে? ঠিক তা নয়। গৌড়বঙ্গেও যে একই প্রতিচ্ছবি। হিলি গভর্নমেন্ট কলেজের দর্শনের অধ্যাপক অভিজিত্ সরকার নববর্ষ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফিরে গেলেন ছোটবেলায়। তিনি বলেন, রিলের জগতে ধীরে ধীরে সব ‘রিয়াল’ মুছে যাচ্ছে। ছোটবেলায় বন্ধুদের থেকে গ্রিটিংসকার্ড সংগ্রহ এবং প্রিয়জনদের দেওয়ার যে আবেগ তা আর কখনও ফিরে আসবে না। দায়সাড়া ও গণহারে স্টিকার শুভেচ্ছাবার্তা পাঠানোয় সেই আবেগ নেই। শৈশবের বাংলা গ্রিটিংসকার্ড বাচ্চাদের দেখিয়ে স্মৃতির অলিগলিতে পদচারণা করলাম। অনলাইন ভার্সনে সেই সুযোগ আছে কি?
নববর্ষের আগে সযত্নে রেখে দেওয়া সেই কার্ড হাতরে বারেবারে শৈশবে ফিরছিলেন কোচবিহারের সঙ্গীত শিল্পী মেঘনা কুণ্ডু। তাঁর কথায়, ছোটবেলার অমলিন স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করছে নববর্ষের দিনগুলি। হাতেহাতে বাংলায় লেখা গ্রিটিংস কার্ড, বাবা মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা, জমিয়ে পেটপুজো। কী আনন্দই না ছিল! এখনও প্রচুর শুভেচ্ছাবার্তা আসে। কিন্তু আগের মতো কার্ড বানিয়ে বা বাংলায় লেখা কার্ড আর পাই না। দোকানে পাওয়া যায় না বলে কাউকে দিতেও পারি না। সবই ওই মুঠোফোনে আবদ্ধ। ছাড় পায়নি আমাদের নববর্ষও।
ডিজিটাল কার্ডের যুগে একদম ব্যাকফুটে কার্ডের ব্যবসা। এনিয়ে কথা হচ্ছিল প্রধাননগরের নিবেদিতা রোডের এক দোকানির সঙ্গে। দীর্ঘদিন ধরে খাতা বই বিক্রির পাশাপাশি গ্রিটিংস কার্ড বিক্রি করতেন তিনি। জানালেন, ১০ বছর আগেও উল্টো দিকের স্কুল ছুটির পরই বাচ্চারা এসে বাংলা নববর্ষের কার্ড কিনত। ছোটদের জন্য নানা দামের কার্ড থাকত। এবার ইংরেজি নববর্ষের কার্ড এনেছিলাম। চার মাস হয়ে গেল। সেই কার্ডই অবিক্রিত থেকে গিয়েছে। বাংলা কার্ড তো এখন বাচ্চাদের সিলেবাসের বাইরে। সব মিলিয়ে বছর বছর সাড়ম্বরে নববর্ষ পালন হলেও কার্ড দেওয়া নেওয়ার সেই আবেগটা আর নেই। -ফাইল চিত্র।