সায়ন্তন মজুমদার: ‘তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে/...কমলা কমল-দলবিহারিণী’। কাল দেবীপক্ষের শেষে প্রায় দেড়শো বছর আগে লেখা এই মাতৃবন্দনাটি কি আমাদের খুব অচেনা? একেবারেই নয়। এটি জাতীয় গানের মর্যাদাসম্পন্ন ‘বন্দেমাতরম্’-এর অংশবিশেষ। বঙ্কিম বঙ্গমাতাকে দুর্গার পাশাপাশি কমলা বা লক্ষ্মীরূপেও উপস্থাপিত করেছিলেন। পরে এটি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে স্থান করে নেয়। উপন্যাসপটের মন্দিরেও আমরা লক্ষ্মীকে দেখি, মধুকৈটভহন্তা বিষ্ণুর বামে তিনি ‘ভয়ত্রস্তার ন্যায়’ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এরপর ব্রহ্মচারী দ্বিতীয় সুড়ঙ্গে মহেন্দ্রকে নিয়ে গিয়ে যে সোনার দশভুজা মূর্তি দেখিয়ে বলেছিলেন—‘মা যা হইবেন’, সেখানেও ডানে ছিলেন ভাগ্যরূপিণী লক্ষ্মী। একই বর্ণনা পাওয়া যাবে বঙ্কিমের ‘আমার দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধে।
সাহিত্যসম্রাটের ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে ব্রজেশ্বরের স্ত্রী সাগর, সতীন প্রফুল্ল (পরবর্তীতে দেবী চৌধুরাণী) ও স্বামী ব্রজেশ্বরের রজনীসমাগম প্রসঙ্গে বিষ্ণুর লক্ষ্মী হওয়ার উপমা ব্যবহার করেছেন। কিন্তু লক্ষ্মী চিরকালই সচলা। তাই দেবী চৌধুরাণীর শ্বশুর হরবল্লভকে লক্ষ্মী বলেছিলেন, ‘হয় সাবেক চাল ছাড়, নয় আমায় ছাড়।’ হরবল্লভ কেতাদুরস্ত চালচলন ছাড়তে পারেননি। লক্ষ্মীকে ছাড়ার ফল অবশ্য হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলেন। বঙ্কিমের কমলাকান্ত ‘একটি গীত’ প্রবন্ধের শেষে বাংলার রাজলক্ষ্মী-জয়লক্ষ্মী-দেশলক্ষ্মীকে গঙ্গায় আত্মবিসর্জন করতে দেখেছেন।
উনিশ শতকীয় বঙ্কিমী উপন্যাসের মতো বিশ শতকে বনফুলসাহিত্যেও আমরা লক্ষ্মীকে পাই। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ‘লক্ষ্মীর আগমন’ উপন্যাস। সেটি লেখক নিজ গৃহলক্ষ্মী লীলাবতী দেবীকে উৎসর্গ করেন। উপন্যাসের চরিত্র মৃদুলা ছোটবেলায় শ্রীদামগঞ্জের লক্ষ্মীপুজোর মেলায় হারিয়ে গিয়েছিল।
হারিয়ে গিয়ে বিক্রি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল সে। এখানে রয়েছে লক্ষ্মীপূজার আগে মন্ত্রযোগে অলক্ষ্মীর পুজো বা বিদায়ের কথা। তাকে জীবনের মন্দকে সরিয়ে ভালোকে আনার উপায় বলে মনে করেছিলেন সুখেন্দু। সে
বলেছে কোজাগরীর রাত জেগে চিলেকোঠার ঘরে টোয়েন্টি নাইন তাস খেলা, লক্ষ্মীর ঘটে স্নো কুইন বা সাদা গোলাপ রাখার কথা। সুখেন্দু খুব ছোটবেলায় তার মামার
বাড়িতে ঠাকুরঘরে একটি বড় সাদা পেঁচাকে ঢুকতে
দেখেছিল, পিছন পিছন বছর দেড়েকের একটি মেয়েকেও। আলপনায় আঁকা লক্ষ্মীর পা ধরে ধরে সে মিশে যায় লক্ষ্মীপটের মধ্যে। ঘুমন্ত মামিমাকে জাগাতে অবশ্য সুখেন্দু দেখেছিল—ছেঁড়া কাপড় পরা অন্য একটি মেয়ে পটের পিছনে বসে মণ্ডা খাচ্ছে। উপন্যাসটি শেষ হয় কোজাগরী শেষের ভোর ৪:৪৩-এ সুখেন্দুর জন্মদিন উদযাপনের মধ্য দিয়ে। আমরা লাল শাড়িতে লক্ষ্মীকে দেখতেই অভ্যস্ত। বনফুল কিন্তু তাঁকে সবুজ শাড়ি পরিয়েছিলেন।
উপন্যাসের পরে আসি ছোটগল্পের ভুবনে। বিশ শতকের প্রথম ও শেষ অর্ধে আমরা পেয়ে গিয়েছি একজন চাটুজ্জেকে এবং আর একজন বাঁড়ুজ্জেকে। প্রথমজন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আজ থেকে একশো বছর আগে ১৯২৫ সালে শারদীয়া ‘বসুমতী’ পত্রিকায় লিখেছিলেন ‘হরিলক্ষ্মী’ গল্প। বেলপুরের বড়োবাড়ির বধূ হয়ে আসা ম্যাট্রিক পাশ হরিলক্ষ্মী, গল্পে লক্ষ্মী নামেই প্রকট হয়েছিলেন। মেজো বৌ যার পরিচয় পেয়ে বলেছিল, ‘নামটি বলে দিতে হয় না দিদি, আপনাকে দেখলেই তা জানা যায়।’ মেজো বৌয়ের নাম ছিল আবার কমলা। দুজনেরই নামের অর্থ লক্ষ্মী হলেও হরিলক্ষ্মীর ঘরে লক্ষ্মী ছিলেন অচলা কিন্তু কমলার ঘরে চঞ্চলা।
শরৎচন্দ্রের হরিলক্ষ্মীর মতোই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত একটি গল্প ও যুগপৎ গল্পগ্রন্থটি হল ‘পৌষলক্ষ্মী’। গল্পটি ১৯৪৩ সালে শারদীয় ‘যুগান্তর’-এ প্রকাশিত হলেও গল্পের বইরূপে প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। গল্পটিকে অনেকে ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসের বীজতলা কিংবা নোবেলজয়ী আরনেস্ট হেমিংওয়ের ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’-র পূর্বপথিকরূপে গণ্য করেন। মুকুন্দ পালের কন্যারূপে এখানে আমরা লক্ষ্মীকে আর লক্ষ্মীর বোন নয়, লক্ষ্মীর মেয়ে অর্থাৎ মুকুন্দের নাতনীরূপে সরস্বতীকে পাই। গল্পের নামে ও চরিত্রে লক্ষ্মীর আনাগোনা রইলেও মূলত এটি পঞ্চাশের মন্বন্তরে লক্ষ্মীহারা বাংলার গল্প। মিথ্যা হয়ে যায় ভীম বা মুকুন্দ পালের আশা—‘লক্ষ্মীর রেতে এবারে ভাসানের গান করব। অনেকদিন পরে সত্যি পৌষলক্ষ্মী হবে।’
এর তিন বছর আগে ১৯৪০ সালে তারাশঙ্কর লিখেছিলেন আপাত লক্ষ্মীবাঁধার গল্প ‘বন্দিনী কমলা’। রাজহাটের রায়বাড়ির বন্দিনী লক্ষ্মীর চিরবন্ধ ঘরের দরজার সামনে ধূপদীপ দিয়ে অর্চনা করা হয়। ছোটো বৌ মণিমালা অর্থাৎ কাঞ্চন বৌ তার দিদিশাশুড়ির কাছ থেকে শুনেছিল এর কারণ। মণিমালার ঊর্ধ্বতন ষষ্ঠ প্রজন্মের কর্ত্রী মানিক বৌ ছিলেন এই বংশের কুটির হতে প্রাসাদের মালিক হওয়া জমিদার গোপীবল্লভ গঙ্গোপাধ্যায় রায়ের তৃতীয়া পত্নী। গোপীবল্লভের মৃত্যুর পরে মানিক বৌয়ের পুত্র দুর্গাসপ্তমীর রাত্রে নায়েবকে খুন করে জমিদারির কর্তৃত্ব পান। আটদিন মানিক বৌ যোগিনী হয়ে উপবাস করেন সেই পাপ থেকে বংশকে রক্ষা করার জন্য। কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রি তৃতীয় প্রহরে হঠাৎ প্রচণ্ড বাদলায় গোটা বাড়িতে তাঁর জ্বালানো সব আলো নিভে যায়। আবার তা জ্বালিয়ে শেজ দিয়ে ঢেকে দেন তিনি। একটি মেয়ে হঠাৎ বাড়িতে এসে জিজ্ঞাসা করে,‘কে জেগে রয়েছে গো?’ পদ্মগন্ধে বাড়ি ভরে উঠলে তিনি লক্ষ্মীকে চিনতে পারেন। মানিক বৌ তাঁকে ঘরবন্দি করে জগৎ শেঠের মায়ের মতো গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন। যাওয়ার আগে ছেলেকে বলে যান বন্দিনী কমলার কথা। কিন্তু সেই কাহিনি শুনে উত্তরপ্রজন্মের কাঞ্চন বৌয়ের মনে ভক্তির চেয়ে চোখে জল আসে। একদিন প্রদীপ হাতে দেখতে পান যে ঘরের তালাটা খোলা। ঘর খুলে কমলার বদলে একটি কঙ্কাল আবিষ্কার করে সকলে। পাশে জীর্ণ নামাবলি। হয়তো বিরোধিতার কারণে ছেলের হাতে খুন ও সেই ঘরে এত কাল গুম হয়েই ছিলেন মানিক বৌ।
গদ্য সাহিত্যের আলোচনায় নাটকই বা বাদ থাকবে কেন? এক্ষেত্রে আমাদের সহায় গিরিশচন্দ্র ঘোষ। ভারতবাসীকে মর্মাশ্রয়ী করতে নাটককে তিনি ধর্মাশ্রয়ী করার উপায় বাতলে ছিলেন। ১৮৮৩ সালে অভিনীত হয় ‘ধ্রুব-চরিত্র’। সন্তানহীনা লক্ষ্মী পাঁচ বছরের ধ্রুবকে কোলে তুলে বলেছেন,“তোর ঘরে চিরদিন বাঁধা রব।/...ডাক বাছা, ‘মা’ বলে আমায়”। কিন্তু বিষ্ণুভক্ত ধ্রুব সিংহাসনের বদলে লক্ষ্মীর কাছ থেকে চেয়েছে শুধু ‘দে মা তোর হরিধন’।
১৯০৫ সালে মিনার্ভায় অভিনীত হয় ‘হর-গৌরী’ নাটক। অরণ্যচারী শিকারি মানুষের কৃষিজীবী হওয়ার পিছনে লক্ষ্মীর অবদান এখানে অন্যতম আলোচ্য। প্রথম অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে বৈকুণ্ঠের নারায়ণের কাছে লক্ষ্মী আসন্ন বিচ্ছেদব্যথা প্রকাশ করেছেন কেননা তাঁকে সুজলা ভারতকে শস্যপূর্ণা করতে ধরাতলে আসতে হবে। বঙ্গভঙ্গের আবহে ইংরেজদের চাকুরি পেশার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতেও ছাড়েননি নাট্যকার। লক্ষ্মী তাই বলেছেন, যেদিন কৃষিকার্য পরিত্যাগ করে মানুষ ‘জঘন্য দাসত্ব বৃত্তি অবলম্বন করবে, আমি নর-আবাস পরিত্যাগ করবো।’
উনিশ শতকীয় রবীন্দ্রসৃষ্টির মধ্যে লক্ষ্মী রয়েছেন এমন দুটি নাটক হল ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ (১৮৮২) ও ‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’ (রচনাকাল ১৮৯৭)। প্রথমটিতে দস্যু রত্নাকর থেকে বাল্মীকি হয়ে ওঠার পথে লক্ষ্মী তাঁকে ধনসুখের প্রলোভন দিতে এসেছিলেন। কিন্তু বিদ্যাকামী বাল্মীকি তাঁকে ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘যাও লক্ষ্মী অলকায়, যাও লক্ষ্মী অমরায়।’ লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে দিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন বাল্মীকি। কিন্তু দ্বিতীয় নাটকটিতে লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে পরীক্ষায় অসফল হয়েছিল দাসী ক্ষিরো। লক্ষ্মীর কাছে বর পেয়ে সে বহিরঙ্গে রানি কল্যাণী হয়ে উঠলেও অন্তরে তাঁর মহীয়সী চরিত্র লাভ করতে পারেনি। রানি অত্যন্ত দয়াবতী দানশীলা। এদিকে ক্ষিরোর হাত দিয়ে এক কণাও গলেনি। একদিন ঠাকুরানীর ছদ্মবেশে তার দুয়ারে এসে লক্ষ্মীকেও ফিরে যেতে হয়—‘আমি সে লক্ষ্মী, তোর ঘরে এসে/অপমান পেয়ে ফিরলাম শেষে।…ধনে মানুষের বাড়ে নাকো মন।’ ফলে অন্তিমে আবার ক্ষিরোকে দাসীতেই ফিরে যেতে হয়।
লক্ষ্মীর গল্প বলে চলেছি লেখকদের মাধ্যমে। কিন্তু লেখিকা কোথায়? তিনিও রয়েছেন। লক্ষ্মীপূজার আবশ্যিক অঙ্গ ব্রতকথা। সেগুলি বেশিরভাগই পদ্যে লেখা। কিন্তু গদ্যে লেখা ব্রতকথাও রয়েছে ইন্দুমতী দেবীর সংকলিত ‘বঙ্গনারীর ব্রতকথা’ গ্রন্থে। সেখানে আমরা বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মীনারায়ণকে পাশা খেলতে ও নারায়ণকে বারবার হারতে দেখি। নারায়ণমামার এই দশায় নারদ রুষ্ট হয়ে লক্ষ্মীমামির গায়ে পানের শিস ছুঁড়ে মারায় বিষ্ণুপ্রিয়া স্বামীর ঘর ত্যাগ করেন। কমলাপতি কমলার দেখা পান না, লক্ষ্মীছাড়া হয়ে ভাতও খেতে পান না। শেষে সমুদ্রজাতা লক্ষ্মীকে পেয়ে সমুদ্রের ধারেই তাঁদের মিলন হয়। জয় লক্ষ্মীনারায়ণ।
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক