নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: একদিকে মেঘ চাইতে না চাইতেই জল! আর অন্যদিকে ছিটেফোঁটাও নেই! দিনের পর দিন এভাবেই কমিশনের দ্বিচারিতার শিকার হচ্ছে বাংলা। এসআইআরের সময় বৃদ্ধি নিয়ে যোগীরাজ্য উত্তরপ্রদেশের আবেদন মাত্রই তাতে ছাড়পত্র দিয়ে দিচ্ছেন জ্ঞানেশ কুমাররা। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যে শুনানির সময়সীমা নিয়ে দেখা যাচ্ছে কমিশনের চূড়ান্ত গড়িমসি।
নির্ধারিত সময়ে রাজ্যে বাকি থাকা শুনানি পর্ব শেষ করা যায়নি। পিছিয়ে রয়েছে সাত থেকে আটটি জেলা। তাই শুনানির সময়সীমা সাতদিন বাড়ানোর আরজি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে গত শনিবারই চিঠি দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল। কিন্তু সেই চিঠি পাওয়ার পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা কেটে গেলেও কমিশনের তরফে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশিকা আসেনি (সংবাদটি মুদ্রণে যাওয়া পর্যন্ত)। তার জেরে নির্ধারিত সময়ের পরও শুনানি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া নিয়ে ধন্দে পড়েছে জেলা প্রশাসনগুলি। রবিবার দিনভর শুনানি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে জেলায় জেলায় তেমনই খণ্ডচিত্র উঠে এসেছে। এদিন উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত-১ ব্লকের শুনানি কেন্দ্রে সকাল থেকেই ছিল ভোটারদের লম্বা লাইন। কেউ এসেছেন টোটোয়। কেউ বা ভ্যানে। হাবড়া, দেগঙ্গা বিডিও অফিসেও চিত্রটা ছিল একরকম। তবে কলকাতার বিভিন্ন বিধানসভা এলাকায় এদিন প্রচুর সংখ্যায় শুনানি হয়নি। কাশীপুর-বেলগাছিয়া, যাদবপুর, রাসবিহারী, বালিগঞ্জ, ভবানীপুর সহ বিভিন্ন বিধানসভা অঞ্চলে বিভিন্ন বুথে শুনানি চললেও লম্বা লাইন দেখা যায়নি।
দক্ষিণ কলকাতায় মেটিয়াবুরুজ ও কসবা বিধানসভায় বাকি থাকা শুনানি প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কসবায় এদিন ‘মপ আপ’ প্রক্রিয়া চলেছে। অর্থাৎ যাঁরা আগে আসেননি, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। তাঁরা এসে নথি জমা দিয়েছেন। শুনানির দায়িত্বে থাকা আধিকারিকরা জানিয়েছেন, এরপর কমিশন যদি সময় বৃদ্ধি করে, তাহলে যাঁরা এই সময়কালের মধ্যে আসতে পারেননি, তাঁদের ডাকার সুযোগ পাওয়া যাবে। কিন্তু সময়সীমা কি বাড়বে? এই জটিলতা কাটেনি।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে আবেদন জানানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একাধিক দফায় এসআইআরের সময় বৃদ্ধিতে কমিশন ছাড়পত্র দিয়েছে। তাহলে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে কেন এই দ্বিচারিতা? কোনো রাজ্য সুয়োরানি, আর বাংলা দুয়োরানি! কমিশনের মতো সাংবিধানিক সংস্থার কি আদৌ এমন আচরণের এক্তিয়ার রয়েছে? আসলে বাংলা যে কমিশনের প্রধান ‘টার্গেট’, তা তারা বারবার স্পষ্ট করে দিচ্ছে। বাছাই করা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটারদের হয়রানি নিয়ে তৃণমূল যে অভিযোগ করছে, সেটাই কার্যত ‘মান্যতা’ পাচ্ছে। অথচ, সুপ্রিম কোর্টে কমিশন অভিযোগ জানানোর পর এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য ৮ হাজার ৫০৫ জন গ্রুপ-বি অফিসার দেওয়ার কথা নবান্নের তরফ থেকে চিঠি দিয়ে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুনানি-সংকট একটি মাত্র নির্দেশিকার অপেক্ষায় জিইয়ে রেখেছেন জ্ঞানেশ কুমাররা।
এখানেই শেষ নয়। এসআইআরের নথি হিসাবে ডোমিসাইল সার্টিফিকেটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও তারা ধোঁয়াশা অব্যাহত রেখেছে। ১৯৯৯ সালের রাজ্যের আইন অনুযায়ী, ডোমিসাইল ও স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট (পিআরসি) ইস্যু করতে পারেন জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসক, মহকুমা শাসক এবং কলকাতার ক্ষেত্রে কালেক্টর। এই আইনকে উদ্ধৃত করে জারি করা এক নির্দেশিকায় কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের জারি করা পিআরসি গ্রহণযোগ্য নথি হিসাবে বিবেচ্য হবে। অথচ, ওই নির্দেশিকায় ডোমিসাইল সার্টিফিকেটের উল্লেখই নেই। ভোটারদের অভিযোগ, তাঁদের থেকে এখনও ডোমিসাইল সার্টিফিকেট গ্রহণ করা হচ্ছে এবং তা আপলোডও হচ্ছে। ফলে যাঁরা নথি হিসাবে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম থাকা নিয়েই ঘোর সংশয় তৈরি হয়েছে।