হিমাংশু সিংহ: ‘জীব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি’। বাঙালি অস্মিতা যিনি রক্ষা করবেন, তিনি রাজ্যে রাজ্যে বাংলাভাষীদের হেনস্তা দেখে চুপ থাকতে পারেন? কিন্তু গোটা বাংলা দেখল তিনি, নরেন্দ্র মোদি পরিবর্তনের কথা বললেন, সিন্ডিকেটরাজ খতম করার কথা বললেন, কিন্তু বাঙালি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিলেন না। বকেয়া টাকা দেওয়ার প্রশ্নেও আগাগোড়া চুপ! দুর্গাপুরে সব বলার সময় হল, অদ্ভুত নীরবতা শুধু রাজ্যে রাজ্যে বাংলাভাষীদের হেনস্তা নিয়ে। বরং অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থার কথা বলে ঠিক কী বোঝাতে চাইলেন, তা বোধগম্য হল না। বাঙালি আবেগকে আলতো করে ছুঁয়ে বঙ্গ দখলের এই গেরুয়া কৌশল ইতিমধ্যেই ব্যুমেরাং হতে শুরু করেছে। বাঙালি ও বাংলাভাষীদের উপর আক্রমণ নামিয়ে এনে বঙ্গ দখলের প্ল্যান সফল হতে পারে? বিজেপি প্রতিনিয়ত ডিটেনশন ক্যাম্পের জুজু দেখাচ্ছে। আর নির্ভেজাল প্রহসনের মতো প্রধানমন্ত্রী রাজ্যের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাঙালি অস্মিতাকে সুরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বাংলায় পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে চাপে পড়ে ৫৬ ইঞ্চির গুজরাতি ‘জয় শ্রীরাম’ ভুলে ‘জয় মা কালী’, ‘জয় মা দুর্গা’ আওড়াচ্ছেন বটে, কিন্তু কে আপন আর কে পর, তা চিনে নিতে বঙ্গভাষীর একুশেও ভুল হয়নি, এবারও হবে না।
বিগত ছয় দশকেরও বেশি এ রাজ্যের অধিবাসী হিসেবে প্রশ্ন একটাই, এভাবে আকাশ থেকে হঠাৎ হঠাৎ নেমে এসে কয়েক ঘণ্টার জন্য নাটুকে বাংলা প্রেমী সাজা যায়? এই দ্বিচারিতা, দু’মুখো রাজনীতি বাঙালি সজ্ঞানে মেনে নেবে? দিল্লি থেকে গুজরাত, অসম থেকে মহারাষ্ট্র, ত্রিপুরা, ছত্তিশগড় কোথাও বাদ নেই। বাংলা বললেই, বাংলা ভাষার সাইনবোর্ড দেখলেই হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে বঙ্গজ শ্রমিকদের। একের পর এক ভিডিও ভাইরাল। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী, নিরীহ মধ্যবিত্ত এবং খেটে খাওয়া মানুষজন— কারও পরিত্রাণ নেই। বাঙালিদের ‘আটক’ করে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ডাবল ইঞ্জিনের মদতে। উত্তর-পূর্বে এই বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, অন্তত বিরোধীদের অভিযোগ এমনটাই। এভারেস্ট প্রমাণ বাঙালি বিদ্বেষ বুকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বন্ধু সাজার এ কোন চেষ্টা! নরেন্দ্র মোদির দল পশ্চিমবঙ্গ দখলের খোয়াব দেখছে দেখুক। গত ৭-৮ বছর ধরেই এ খেলা চলছে। কিন্তু প্রাণ থাকতে রাজ্যের মানুষ, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, মতুয়া, রাজবংশী সমাজ তা হতে দিতে পারে? বিদ্বেষীদের হাতে বাংলার সংস্কৃতি সুরক্ষিত থাকতে পারে না। বহিরাগতদের দল এখনও বাঙালির চরিত্রটাকেই ধরতে পারেনি। বাঙালি কষ্ট করতে রাজি, ত্যাগেও তার আপত্তি নেই। কিন্তু অবহেলা, ভণ্ডামি, মিথ্যাচার তার চিরদিনই না-পসন্দ। সেই কারণেই একুশে কপাল খোলেনি। ছাব্বিশের লড়াই শুরুর আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওয়াক ওভার পাওয়ার অবস্থা! বাঙালিয়ানার প্রশ্নে হিন্দি বলয়ের দল আমাদের কী শেখাবে? রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, নেতাজি, শ্রীরামকৃষ্ণ...?
যখন কোনও রাজনৈতিক শক্তি বুঝে যায় সোজা পথে ক্ষমতা দখল সম্ভব নয়, তখন সে অন্য দল ভাঙে, ভোটার তালিকা বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং কারচুপির আশ্রয় নেয়। এজন্সিকে কাজে লাগায়। গোল পোস্টটাকেই বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে ক্রমাগত। বিহারে ভোটার তালিকার আমূল পরিবর্তনের নামে ৩৫ লক্ষ গরিব, সংখ্যালঘু মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই বিহার দখল। আর বাংলায়? রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাদ দিতে হবে বলে এ রাজ্যের নবনিযুক্ত বহুত্ববাদের ধ্বজাধারী গেরুয়া সেনাপতি ১৭ লক্ষ নামের তালিকা তুলে দিয়েছেন কমিশনকে। বাংলায় এখনও স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন শুরুই হয়নি। তাহলে বাদ পড়াদের তালিকা রাজ্য সভাপতির পকেটে আগাম গেল কী করে? তাঁরই দোসর দলবদলু মহামান্য ‘এলওপি’ আরও এককাঠি এগিয়ে। তিনি বলছেন, ৯০ লক্ষ নাম বাদ দিতে হবে। তিনি কতটা পাটিগণিত জানেন বলতে পারব না। কিন্তু ৮ কোটি মানুষের তালিকা থেকে ৯০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার অর্থ প্রায় ১২ শতাংশ ভোটারের নাম কেটে দেওয়া। মানসিক ভারসাম্য থাকা কোনও ব্যক্তির মুখে এ ধরনের দাবি কি যুক্তিসঙ্গত?
ভারত সরকারের হিসেবই বলছে, দেশে সব মিলিয়ে ৪০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা মুসলমান আছেন। বাংলায় কয়েকশোর বেশি নয়। তাহলে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার এই নাটক কি ভরাডুবির আতঙ্ক তাড়া করছে বলেই? তার চেয়ে বরং নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বিজেপি আগাম ঘোষণা করাক, যাঁরা পদ্ম চিহ্নে ভোট দেবে না, তাঁদের আর ভোটাধিকারই থাকবে না। ডিটেনশন ক্যাম্পে জায়গা হবে। অমিত শাহের দোসর জ্ঞানেশ কুমার তো তৈরি রয়েছেন হুকুম তামিল করার জন্য। কিন্তু গোটা রাজ্যটাকে ডিটেনশন ক্যাম্প বানিয়ে কোন সোনার বাংলার সূচনা করবে গেরুয়া শক্তি? দেশজুড়ে ক্রমশ বেড়ে চলা বাঙালি বিদ্বেষেরই বা কী হবে? দুর্গাপুরের মহতী সভায় তার কোনও সদর্প উচ্চারণই শোনা গেল না প্রধানমন্ত্রীর মুখে। কয়েক ঘণ্টার সফরে বাংলা ও বাঙালি নিয়ে তিনি আশ্চর্যভাবে উদাসীন। বাঙালিই না থাকলে কোথায় হবে মা দুর্গা, মা কালীর আরাধনা!
প্রধানমন্ত্রীর এই দৃষ্টিকটু নীরবতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আসল বাঙালিপ্রেমী কোন জন! ভুলত্রুটি উপেক্ষা করে কার হাতে আরও পাঁচ বছরের জন্য বাংলার দায়িত্ব! তিনি নিঃসন্দেহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি বাঙালি আক্রান্ত শুনেই এক মুহূর্ত আর ঘরে থাকেননি। বৃষ্টি মাথায় করে একুশ জুলাইয়ের পাঁচদিন আগে রাস্তায় নেমেছিলেন। অনেকে বলছেন, সেটাই নাকি ছিল দেবীপক্ষের সূচনা। আগাম মহালয়া। আগামী কাল ২১ জুলাই দুপুর পৌনে ২টো থেকে ৫০ মিনিটের মধ্যে সেই নির্ঘণ্ট মেনে সন্ধিপুজো। সবার অজান্তেই ফোকাসটা আচমকা ঘুরে গিয়েছে। কে না জানে বাঙালি অস্মিতার যুদ্ধে মমতাকে হারানো এই মুহূর্তে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ বঙ্গ বিজেপি’র পক্ষে প্রায় অসম্ভব! মমতার সঙ্গে লড়তে গিয়ে সিপিএমের ৩৪ বছরের সাজানো বাগানটাই ছারখার হয়ে গিয়েছে। আর বিজেপি’র না আছে বাগান, না আছে গাছ। এ রাজ্যে মরুভূমি আর গেরুয়া দলটা প্রায় সমার্থক। উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে সংগঠনের নুইয়ে পড়া চেহারা নিজের চোখে দেখে এসেছেন রাজ্য সভাপতি। চা বলয়ে গিয়ে চোখ কপালে ওঠার জোগাড় তাঁর। আদিবাসী মহল্লাতেও গেরুয়া জনসমর্থনে ভাটা। প্রতিদিন দল ভেঙে জোড়াফুলে নাম লেখানোর প্রতিযোগিতা। আসলে ভিনদেশিদের হাতে যে বাঙালি সুরক্ষিত
নয়, সংস্কৃতিও বিপন্ন তা শিক্ষিতরা জানে। সংখ্যালঘুদের কাছে এই সরকারই শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। সিপিএম কর্মসূচিতে থাকলেও ভোট পাটিগণিত থেকে আপাতত ভ্যানিশ! স্বভাবতই এত কিছুর পরেও মমতার সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কোনও ব্যর্থ শিষ্য কিংবা জেলা থেকে উঠে আসা মেঠো দলবদলুর নেই। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের লড়াইয়ে তা প্রমাণ হওয়া শুধু কয়েক মাসের অপেক্ষা।
সঙ্গে তাঁর অব্যর্থ টাইমিং। গত বুধবার মঞ্চ থেকেই তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি ভয়াবহ কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া দরকার। আজকের সভার কথা শুনে দলের অনেকেই বলেন, চার-পাঁচ দিন পরেই তো ২১ জুলাইয়ের সভা, আজ আবার পথে নামছেন কেন? তাঁদের বলি লোহা গরম থাকতে থাকতেই হাতুড়িটা মারতে হয়।’ প্রায় ১৫ বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকার পরও এই নিখুঁত সময় জ্ঞান যাঁর, তাঁকে চ্যালেঞ্জ করা বড় সহজ কাজ নয়!
কয়েকমাস আগেও মনে হয়েছিল এবার হয়তো খেলাটা জমবে। বিস্তর ইস্যু। দুর্নীতির সাতকাহন। যোগ্য চাকরিহারাদের দীর্ঘশ্বাস। মোদি-শাহের ডেলি প্যাসেঞ্জারি। আয়োজনের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু খেলাটা যত এগিয়ে আসছে পিচে বল ঘুরছে। এবং দিশাহারা বঙ্গ বিজেপি নিজেদের অপদার্থতায় ম্যাচটা নেত্রীর কাছে আগাম সঁপে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। সব ছাপিয়ে বাংলা বাঙালির লড়াইয়ের এই আকস্মিক টুইস্টই বলে দিচ্ছে আর সব ইস্যু চাপা পড়ে এবার একতরফা ছুটবে নেত্রীর রথ। দীঘা থেকে যার সূচনা হয়েছে, সেই জয়রথই আগামী বৈশাখের মাঝামাঝি নবান্নে চতুর্থবার মমতার ক্ষমতায় বসার সূচনা করবে।
কালই আর একটা একুশে জুলাই। বাঙালি অস্মিতাকে নতুন করে শান দেওয়ার এবং ৩২ বছর আগে যেমন সিপিএমের অত্যাচার, অনাচারের বিরুদ্ধে যেভাবে মানুষ রুখে দাঁড়িয়ে ছিল আর একবার সেই পথেই মমতার নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়। রাজনীতির ময়দানে লক্ষ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েও তিনি আজও বাঙালি অস্মিতার আপসহীন প্রতীক। অপ্রতিরোধ্য!