


পি চিদম্বরম: আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনে (আইইইপিএ) গত ২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আদালত ওই সিদ্ধান্ত বাতিলের রায় ঘোষণা করেছে। তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের তিনি গালমন্দ করেছেন (এমন একটি আইন যা তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবমাননার এক্তিয়ারকে আকর্ষণ করত)। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম সংশোধনীর শপথ নিয়েছে এবং বিচারপতিরা অটল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গালমন্দ করেই থামেননি, অন্যান্য চালু আইন ব্যবহার করে কমবেশি একই শুল্ক আরোপ করার সময় তিনি নষ্ট করেননি:
* বাণিজ্য আইন, ১৯৭৪-এর ধারা ১২২ (যা প্রেসিডেন্ট প্রয়োগ করেছেন);
* বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইন, ১৯৬২-র ধারা ২৩২;
* বাণিজ্য আইন, ১৯৭৪-এর ধারা ৩০১ (যা প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেছেন এবং বেশ কয়েকটি দেশের রপ্তানির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার হুমকি দিয়েছেন); এবং
* স্মুট-হাওলি ট্যারিফ আইন, ১৯৩০-এর ধারা ৩৩৮।
* রায় ঘোষণার পর ভারতের ক্ষেত্রে প্রায় সকল পণ্যের উপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে (গত ২ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ১৮ শতাংশ
শুল্কের পরিবর্তে)। বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের ধারা ২৩২-এর অধীনে, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সেমিকন্ডাক্টর এবং কিছু অটোকম্পোনেন্টের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। শুল্ক
এখনো বেশি, এবং ভারতের রপ্তানিতে তা প্রভাব ফেলবে। ভারত সরকার বলেছে যে, তারা রায় ঘোষণার পর পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। তবে, রায়ের তাৎক্ষণিক পরিণতি এটাই যে, খসড়া চূড়ান্ত করা এবং অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে সইসাবুদ সংক্রান্ত আলোচনা স্থগিতের বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে। তারা এই ঐকমত্যে পৌঁছেছে কোনো দিনক্ষণ নির্দিষ্ট না করেই!
সকলেই অসহায়
এদিকে মার্কিন কংগ্রেস থেকে একাধিক কণ্ঠস্বর উঠে এসেছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে আইইইপিএ ট্যারিফ বাতিল না-হওয়া পর্যন্ত, সরকারের কর আরোপের ক্ষমতা নিয়ে কংগ্রেস অসহায় ছিল। রায়ের পরেও, কংগ্রেস অসহায় কারণ অনুমোদন চাইতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসে যাবেন না। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে কংগ্রেসের কাছ থেকে ইতিমধ্যেই তিনি কর্তৃত্ব লাভ করেছেন। তাছাড়া, ‘পারস্পরিক’ শুল্ক হার বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট আইন রয়েছে আইন গ্রন্থে। অনেক বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে, রায়-পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ করেছেন, সেটা আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে। তবে সেই জট কাটাবার জন্য আইন তৈরি জরুরি নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বাণিজ্য অংশীদার সম্প্রতি চুক্তিতে প্রবেশ করেছে (বেশিরভাগই পারস্পরিক শুল্ক এড়াতে) তারাও অসহায়। ২ ফেব্রুয়ারি একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ভারতও অসহায়। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার ইতিমধ্যেই অন্যান্য দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে বলেছেন যে, ‘কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি এবং এমন পরামর্শ দেননি যে তাঁর দেশ চুক্তি থেকে সরে যেতে চায়।’ বাস্তবে, গ্রিয়ার সাহেব প্রমাণ করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী সমস্ত দেশই ‘গুড বয়’। তিনি এই ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, তারা ‘গুড বয়’ থেকে যাবে, এমনটাই ধরে নেওয়া যায়। তাঁর পক্ষ থেকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দুবার সতর্ক করেছেন যে, যেকোনো দেশ চুক্তি ভঙ্গ করলে কঠোর শুল্ক আরোপের ঝামেলায় পড়ে যাবে। ‘গুড বয়েজ’ যদি বাস্তবে ‘ব্যাড বয়েজ’ হয়ে যায়, তাহলে তাদের উপর প্রতিশোধ আছড়ে পড়বে। এই হুঁশিয়ারিকে ধোঁকাবাজি বা ফাঁকা আওয়াজ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ইচ্ছা অনুসারে এবং ধারাণার ভিত্তিতে কাজ করেন। তিনি ট্যারিফকে কেবলমাত্র ট্যাক্স হিসেবে নয়, বরং হাতিয়ার হিসেবে দেখেন।
বিশৃঙ্খলায় বাণিজ্য
মারাকেশ চুক্তি (যেটা জিএটিটি বা গ্যাট-এর জায়গায় এসেছিল) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লুটিও) সৃষ্টি সাধুবাদের যোগ্য। এর ফলেই বিশ্বের দেশগুলি একটি নিয়মতান্ত্রিক বাণিজ্যব্যবস্থা অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছে। মতানৈক্য এবং বিরোধ সত্ত্বেও, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ডব্লুটিও একটি বিশ্বাসযোগ্য প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। ডব্লুটিও ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিশ্ব বাণিজ্যের এক অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের সূচনা করেছে। যা কিছু বিশৃঙ্খলা রয়েছে, তার সবটাই মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌজন্যে। কঠোর পারস্পরিক শুল্ক হুমকির মুখেই অনেক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে প্রবেশ করেছে। বিশাল প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা। বিনিময়ে পেয়েছে আংশিক শুল্ক ছাড়। পারস্পরিক শুল্ক হয়তো চলে গিয়েছে কিন্তু অন্যান্য আইন ও আদেশের মাধ্যমে ফেরানো হয়েছে একই শুল্ক। তাই, অন্যান্য দেশ যতটা পরিমাণ শুল্ক ছাড় নিশ্চিত করেছিল তা বস্তুত গোল্লায় গিয়েছে, কিন্তু এখনো বহাল রয়েছে তাদের তরফে প্রদত্ত বিশাল প্রতিশ্রুতি।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ‘লুলা’ ডি সিলভা যথার্থই বলেছেন যে বিশ্বের দেশগুলিকে একজোট হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটি একটি যুক্তিসংগত পরামর্শ, কারণ কোনো দেশ (চীন বাদে) একা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। আজকের এই বিশ্ব অসম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির নেতা ভীষণ খামখেয়ালি এবং তাঁকে বুঝে ওঠা দায়। ভারত প্রকৃতপক্ষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করেছে। শুধু আমাদের দেশই-বা কেন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলিসহ আরো অনেক দেশও করেছে একই কাণ্ড।
অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অপ্রিয় এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর ‘অ্যাপ্রুভাল’ রেটিং ৪০ শতাংশ কিংবা তারও নীচে নেমে গিয়েছে। চাকরির সংকট চলছে। ভোগ্যপণ্যের দাম সাধারণের সাধ্যের মধ্যে নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন-বিরোধী অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয়। তবে এর ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কারণ প্রেসিডেন্টের এই অবস্থানে মানবাধিকার, শিশুদের অধিকার, রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন এবং আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া নির্মমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। ফেডারেল সরকারের, বিশেষ করে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) বাড়াবাড়ির কারণে, অবৈধ অভিবাসনের বিরোধী অনেক আমেরিকানই হতাশ।
অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং ২০২৬ সালের নভেম্বরে নির্বাচনি বিপর্যয়েরও মুখোমুখি হতে পারেন তিনি। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। এর ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আরো দুবছর বাকি থাকতেই ‘খোঁড়া’ হয়ে যাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসন নিয়মানুগ বাণিজ্য এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি শ্রদ্ধার রাস্তায় ফিরে আসতে পারেন। ততক্ষণ পর্যন্ত, ভারতের জন্য কোনো সম্ভাব্য বিকল্প না-থাকলে, একটি ঘূর্ণায়মান যাত্রার (রোলার-কোস্টার রাইড) জন্য তৈরি থাকুন।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত