Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘অ্যাডভান্টেজ’ মমতা

পশ্চিমবঙ্গে এমন ভোট নাকি কখনো দেখেনি কেউ। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় প্রথম পর্বে ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোট হল বৃহস্পতিবার।

‘অ্যাডভান্টেজ’ মমতা
  • ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পশ্চিমবঙ্গে এমন ভোট নাকি কখনো দেখেনি কেউ। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় প্রথম পর্বে ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোট হল বৃহস্পতিবার। ভোটদানের হার গড়ে ৯৩ শতাংশ। এরাজ্য তো বটেই, স্বাধীন ভারতে যেকোনো নির্বাচনে ভোটদানের হারকে পিছনে ফেলে নজির সৃষ্টি করল পশ্চিমবঙ্গ। দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনের ভোটে এই হার বজায় থাকবে কি না, তা বোঝা যাবে ২৯ এপ্রিল। তবে প্রথম দফার ভোট নিশ্চিতভাবেই তিনটি সত্যকে সামনে আনল। ১) প্রচণ্ড গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে প্রবল উৎসাহে ভোট দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। ২) অনেক আশঙ্কা ও উদ্বেগ থাকলেও বিক্ষিপ্ত অশান্তি ছাড়া ভোটপর্ব সাঙ্গ হয়েছে মোটামুটি শান্তিতে। ৩) বহু সংখ্যক বৈধ ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেও (ট্রাইবুনালে বিবেচনাধীন) রাজ্যের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রায় কোথাও ব্যাপকহারে ছাপ্পা ভোট বা বুথ দখলের অভিযোগ নেই। ভোট বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, এসআইআর-এর পর যেসব রাজ্যে ভোট হয়েছে, সেই বিহার, কেরল ও তামিলনাড়ুতেও ভোটের হার চোখে পড়ার মতো। বাংলা সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন এই রেকর্ড ভোটের কারণ হিসাবে মনে করছে, এসআইআর-এ বাংলায় ভোটার কমেছে প্রায় ৮৪ লক্ষ। গড় ভোটদানের হার তাই বেড়েছে। কিন্তু তা হলেও প্রথম দফায় ভোটদানের হার যে কয়েক শতাংশ বেশি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

Advertisement

স্বীকার করুক বা না করুক ভোটদানের এই চমকপ্রদ হার প্রায় সব পক্ষকেই ধন্দে ফেলে দিয়েছে। এতে কার সুবিধা হল, কারা এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় দফায় মাঠে নামবে—তাই নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই নির্বাচনের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল তৃণমূল ও বিজেপি দু’পক্ষই ‘কনফিডেন্ট’, তারাই সিংহভাগ আসন দখল করে সরকার গড়ার দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দাবি, ‘পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি বাংলায় পরিবর্তনের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন মহিলারাই।... ফল প্রকাশের পর চারদিকে শুধু পদ্ম ফুটতে দেখা যাবে।’ তাঁর ডেপুটি অমিত শাহের ধারণা, ‘আজ তৃণমূলের গুন্ডাদের সাহস হয়নি আঙুল উঁচিয়ে দেখানোর। সেই কারণেই মানুষ বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন।’ বিজেপি নেতাদের এইসব দাবিকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে তৃণমূলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পালটা দাবি, ‘প্রথম দফার ভোটে আমরা বিজেপির দফারফা করে এসেছি।’ আর বহু যুদ্ধে পোড়খাওয়া নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপলব্ধি, ‘আমার চোখ যদি সত্যি হয়, আমার মন যদি মানুষের ভাষা বোঝে, আমরা ইতিমধ্যে জেতার জায়গায় এসে গিয়েছি।’ দু’দলেরই অনুমান, তারাই জিতছে। শাহ বলেছেন, প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে ১১০টি আসন তাঁরা পাবেন। আর অভিষেক বলেছেন, এর মধ্যে কমপক্ষে ১২৫টি আসন তাঁরা পাচ্ছেনই। এখন দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনের ভোট বাকি। 
ভোট বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গে এই বিপুল হারে ভোট দুটি সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। এক, হতে পারে মমতা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া অথবা দুই, এসআইআর-এর নামে যে আতঙ্ক, হেনস্তার সাক্ষী থেকেছেন রাজ্যের মানুষ, বিজেপিকে সুবিধা করে দিতে নির্বাচন কমিশন তুঘলকি আচরণ করেছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে এবং এবার ভোট না দিলে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হতে পারে ধরে নিয়ে ইভিএমে তার জবাব দিয়েছেন রাজ্যের মানুষ। ঘটনা হল, এরাজ্যের সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্ত কিছু অভিযোগ থাকলেও তা ঝড়ের আকারে ভোটযন্ত্রে আছড়ে পড়েছে— সেই পরিস্থিতি কখনোই তৈরি হয়নি। এমন দাবি বিজেপি নেতারাও করতে দু’বার ভাবেন। তাই ‘চুপচাপ পদ্মফুলে ছাপ’-এর যে প্রচার বাজারে ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, তার বাস্তব ভিত্তি নিয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট সঙ্গত কারণ আছে। বরং এসআইআর-এর নামে গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে যা চলেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যেভাবে বৈধ ভোটারদের হেনস্তা করা হয়েছে, যে লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক এবার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলেন না—ইভিএম-এ তার প্রতিবাদ আছড়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাছাড়া ইতিহাস বলছে, মমতার দলের মূল ভোটব্যাংক হল সংখ্যালঘু ও মহিলারা। প্রথম দফার ভোট বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ১৫২টির মধ্যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা ও কেন্দ্রগুলিতে ভোটদানের হার বেশি ছিল। এসআইআর-এ এই সংখ্যালঘু মানুষের নামেই বেশি কোপ পড়েছে। ভোট বিশ্লেষণ করে এও দেখা যাচ্ছে, প্রথম দফায় পুরুষ ভোট পড়েছে ৯০.৯২ শতাংশ, মহিলা ভোট ৯২.৬৯ শতাংশ। আরও দেখা যাচ্ছে, ভোটে নাম কাটা যাওয়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন রাজ্যে কর্মরত হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক বহু বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ভোট দিতে এসেছেন। সুতরাং আতঙ্ক, হেনস্তা, ভয়ের পরিবেশ যারা তৈরি করল, তাদেরকেই ভোটদানের সম্ভাবনা খুব একটা যুক্তিসম্মত নয়। তাই সম্ভাবনার বিচারে প্রথম দফায় ‘অ্যাডভান্টেজ মমতা’ মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। যদিও অন্তর্যামী হয়ে ভোটাররা শেষপর্যন্ত কার কপালে জয়ের তিলকটা পরিয়ে দেবেন—তা জানা যাবে ৪ মে, ফল ঘোষণার পর।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ