


বিশেষ নিবন্ধ, সমৃদ্ধ দত্ত: বাংলার ভোটের ফলাফলের পর সবথেকে বিস্মিত হবে নির্বাচন কমিশন। বাংলায় যে ফরমুলা এবং মডেল চালু করে নির্বাচন কমিশন সেটিকে ‘সাকসেস ফরমুলা’ হিসেবে ভবিষ্যতে গোটা দেশে চালু করার ব্লু প্রিন্ট করা যাবে বলে নিশ্চিত হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। বস্তুত এসআইআর নামক ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার গোটা ব্যবস্থাটাই ঢেলে সাজাতে হবে। এই যে মরজি-মাফিক, এআই দিয়ে, রাজনৈতিক কারণে কিংবা কোনো নথিপত্র যাচাই না করেই ঢালাও ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, এই হঠকারিতা কমিশন আর কোনো রাজ্যে করার সাহস করবে না বাংলার ভোটের পর।
বাংলার ভোটে নির্বাচন কমিশন নিশ্চিতভাবেই বিজেপিকে মরিয়া হয়ে সাহায্যই করতে চাইছে। কিন্তু সমস্যা হল, কমিশন যেটা বুঝতে পারছে না, সেটি হল, নিজেদের অজান্তে তারা বিজেপির বঙ্গ রাজনীতিতে চরম ক্ষতি করে দিয়েছে এই ভোটে। এই যে কমিশনের অতি সক্রিয়তাকে বিজেপি ধরে নিচ্ছে তৃণমূলের জন্য মহাবিপদ, সেটিও মস্ত বড়ো এক ভ্রান্তি। কারণ সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করা গেলে দেখা যাচ্ছে, যতটা তৃণমূল বিপদে পড়ছে, তার থেকে অনেক বেশি সংকট, দুর্দশা ও দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। শুধুই মুসলিম নয়, হিন্দুও সমানভাবে। আর যে ভোটব্যাংক কিছুটা হলেও তৃণমূল বিরোধী ছিল, তারাও অনেকটাই আবার কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও রাগের কারণে এককাট্টা হয়ে যাচ্ছে। নিছক এসআইআরের কারণে নয়। প্রতিনিয়ত ভোটের প্রাক্কালে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার নামে নির্বাচন কমিশন যে ব্যবস্থাগুলি কায়েম করছে, সেটির মধ্যে যথেচ্ছাচার এবং স্বৈরাচারেরও আভাস স্পষ্ট। যার মধ্যে ক্ষমতার প্রদর্শন বেশি, বাস্তবতা কম।
এবার এমনভাবে কিছু সিদ্ধান্ত আরোপ করা হচ্ছে, যা নিত্যদিনের জীবনকে প্রভাবিত করছে। কমিশন যেটা ধরতে পারছে না সেটি হল, তারা ভালো কাজ করুক অথবা অন্যায় কিছু করুক, তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরক্তি এবং ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে। এটা ক্ষতিকর হয়ে যাচ্ছে বিজেপির কাছে। কারণ বিজেপি আগেভাগেই কমিশনের দায়দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে নিয়েছে। কমিশনের পক্ষ নিয়ে নিজেরা সওয়াল করছে। তাই মানুষও ধরে নিচ্ছে কমিশন আর বিজেপি একই। কমিশনের উপর ক্ষোভের দায় বিজেপিকেই নিতে হচ্ছে। এটা দরকার ছিল না বিজেপির। ভুল স্ট্র্যাটেজি। কমিশনের উপরে যে রাগ সেটি গিয়ে পড়ছে বিজেপির উপর।
এবার যদি নির্বাচন কমিশনের উপর ভরসা না করে, এসআইআরের মতো কোনো অস্ত্র ব্যবহার না করে সরাসরি রাজনৈতিক লড়াইয়ে বিজেপি ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং আগাগোড়া রাজনৈতিক ইস্যুতে তৃণমূলকে আক্রমণ এবং কোণঠাসা করে যেত লাগাতার, তাহলে বিজেপির ইতিবাচক ফলাফলের সম্ভাবনা কিছুটা হলেও দেখা যেত। বিজেপি বঙ্গ রাজনীতিতে কী কী ভুল করেছে? একঝাঁক। ফ্লপ ফরমুলাকে বারংবার ব্যবহার করা। সবথেকে শক্তিশালী সাম্প্রদায়িক বিভাজন। কিন্তু এই ফরমুলার সর্বোচ্চ সুফল বিজেপির পাওয়া হয়ে গিয়েছে। এর বেশি আর বাড়বে না। কারণ উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুর একটি বৃহৎ অংশ তৃণমূলের ভোটার এখনও। এই ভোটব্যাংক বিজেপি ২০২৪ সালেও ভাঙতে পারেনি। সেই ভোট ছিল মোদির ভোট। তা সত্ত্বেও। এবারও বিজেপি এই ভোটব্যাংকে থাবা বসানোর চেষ্টাই করেনি। যদি চেষ্টা করত, তাহলে মুসলিম তাড়াও, অনুপ্রবেশ, এই রাজ্য পশ্চিম বাংলাদেশ হয়ে যাবে, এই একই থিওরিতে আটকে থাকত না। কারণ এই থিওরিতে আকৃষ্ট হয়ে যারা বিজেপির ভোটার হয়েছে, তারা ইতিমধ্যেই বিজেপির কাছে আছেই। বিজেপির দরকার ওই নিজস্ব ভোটের সঙ্গে আরও কিছু ভোট যুক্ত করা। সেটা সম্ভব হত তৃণমূলের ভোটে ভাগ বসালে। একমাত্র তৃণমূলের হিন্দু ভোটের অন্তত ৫ শতাংশ নিজের দিকে টানতে না পারলে বিজেপির কোনো লাভ নেই। সেটা কীভাবে টানতে হবে সেটা বিজেপি জানে না। এই না জানাটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। বিজেপির কাছে একটি সিলেবাসই আছে। হিন্দুত্ব। শুধু সেটি দিয়ে এই অতিরিক্ত হিন্দু ভোট কাছে টানা যাবে না। অতএব এবারও এই হিন্দু ভোট বিজেপির অধরা থেকে যাচ্ছে।
সুতরাং তৃণমূলের কাছে থাকছে মহিলা-মুসলিম-সেকুলার হিন্দু-প্লাস ক্যাশ ট্র্যান্সফার প্রকল্পের উপভোক্তা ভোটব্যাংকের একাংশ। এই আশ্চর্য পাওয়ার ব্লক ভারতের কোনো দলের কাছে নেই। সেই কারণেই বিজেপি বাংলায় বছরের পর বছর নিজের ভোটব্যাংক কমবেশি ধরে রাখতে পারছে ঠিকই, কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে ভোট শতাংশের ফারাক কমছে না। বরং বেড়ে যাচ্ছে। এই ধাঁধার জবাব নিছক এসআইআর থেকে ২৭ লক্ষ নাম বাদ দিয়ে পাওয়া যাবে না। অন্য কোনো বিকল্প হতে পারত। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে সংহত করতে পারত বিজেপি। নানারকম সরকার বিরোধী ইস্যুকে নিয়ে রাজনীতি করতে পারত। কিন্তু সেসব করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। বরং বিজেপির ভুল পদক্ষেপে তৃণমূলের বিস্তর সুবিধা হয়ে গিয়েছে। যুবসাথী নতুন সংযোজন ক্ষোভ দূরীকরণে।
বিজেপির দ্বিতীয় ভুল, ভয়ের রাজনীতি, হুংকার, হুঁশিয়ারির রাজনীতিতে আস্থা রাখা। অর্থাৎ রামনবমীতে মিছিল হলেও অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় একটা ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করা, আবার রাজনীতির মঞ্চ থেকেও হুংকার দেওয়া যে, ২ কোটি মানুষকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দেশছাড়া করব। সর্বদাই একটা ভয় দেখানো টাইপ আচার আচরণ। সমস্যা হল, তৃণমূলকে ভয় দেখাতে গিয়ে, বিজেপি নেতানেত্রীরা আম জনতাকেই ভয় দেখাচ্ছে। আমাদের নাম না থাকলে কী হবে? আমাদের কি বাংলাদেশ চলে যেতে হবে? আমার কাছে তো ওই নথিটা নেই, তাহলে কী হবে! এসব নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে মানুষকে রেখে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে সম্পৃর্ণ আত্মহত্যা।
ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, থ্রেট করা, অস্থিরতা সৃষ্টি করা এসব কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে কোনোদিন জয়ী হতে পারেনি। তাহলে নকশালপন্থাকে সাধারণ মানুষ মেনে নিত। সমস্ত আপার ও মিডল ক্লাস পরিবার থেকেই ভালো ছাত্রছাত্রী ছেলেমেয়েরা ওই নকশাল আন্দোলনে গিয়েছিল। যখন থেকে সমাজ, নিত্যদিনের জীবনে অস্থিরতা, আতঙ্ক, খতমের রাজনীতির চোরাগলিতে তারা ঢুকে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল নিজেদের। তাদের পরিবারেরা যে সামাজিক শ্রেণির অন্তর্গত, সেই শ্রেণিটাই এই আন্দোলনকে গ্রহণ করল না।
সিপিএম ক্ষমতায় এসেই ভূমি সংস্কার করে সমাজের নিচুতলায় বিরাট এক বিপ্লব করে ফেলেছিল। আর্থিক একটি সুস্থিতি উপহার দিয়েছিল খেতমজুর, ভূমিহীন, ক্ষুদ্র কৃষকদের। গ্রামীণ সমাজের আর্থিক স্থিতাবস্থা সামান্য লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তৃণমূল ক্ষমতায় এসেই সরাসরি হাতে টাকা দেওয়া শুরু করে দেয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সিপিএম, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরই ভয়ের রাজনীতির আমদানি করেনি। ভরসা উপহার দিয়েছে। ভয়ের আমদানি করেছে পরবর্তীকালে। আর যখনই সেটা শুরু হয়েছে, ঠিক তখন থেকেই অভিযোগ ও ক্ষোভ বেড়েছে ওই দুই দলের বিরুদ্ধেই। সিপিএম মাত্রাছাড়া হয়ে যাওয়ায় তারা ক্ষমতাচ্যুত। বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগেই ভয়ের, হুমকির, হুঁশিয়ারির রাজনীতি করছে। এটাই ক্ষতি করে দিচ্ছে তাদের।
আর একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর। বিজেপির যখন দরকার ছিল এসব ভয় দেখানোর রাজনীতি থেকে সরে এসে ভরসা দেওয়ার, উন্নয়নের স্বপ্ন দেখানোর, তখন উলটে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে এসে আরও দ্বিগুণ ভয়ের ও আতঙ্কের পরিস্থিতি সৃষ্টি করল। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেল, বিজেপিও ভয় দেখায়, কমিশনও ভয় দেখায়।
এসআইআর তৃণমূলের লোকসান করেনি? করেছে। কিন্তু তৃণমূলের ভোটশেয়ার এতই বেশি যে, সেই লোকসান সামান্য। বরং কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের জেরে এবং কিছু কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিপূরণ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, একটি অংশ হয়তো তৃণমূলকে ভোট দিত না। এবার সেই অংশও বিরক্ত হয়ে তৃণমূলকেই ভোট দিতে চাইছে। সেটাই বিজেপির বৃহত্তম ক্ষতি। সংবিধানের ৩২৬ নং ধারা ভারতবাসীকে ভোটের অধিকার দেয়। কিন্তু সন্দেহবশত বৈধ নাগরিককে সন্দেহভাজন রেখে ভোটদান থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কোন সংবিধানে? সংবিধানের ২১ নং ধারা হল জীবন যাপনের অধিকার। অর্থাৎ নাগরিকদের নিজের মতো করে জীবনযাপন করার অধিকার আছে। রাষ্ট্র বাধা দিতে পারে না। সংবিধানের ২৯ নং ধারা ভাষা ও সাংস্কৃতিক যাপনের অধিকার দেয়। সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নং ধারা অধিকার দেয় যার যা ধর্ম ও বিশ্বাস সেই ধর্ম পালন করার।
লক্ষ্য করা যাবে যে, এই প্রতিটি বিষয়ে বিগত বছরগুলিতে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে লাগাতার। যার কোনো দরকারই ছিল না। মানুষ সবথেকে বেশি ক্ষুব্ধ হয়, বিরক্ত হয়, ক্রুদ্ধ হয় কী কারণে? অযথা অধিকারে হস্তক্ষেপ করলে! আর ভোটের অধিকার সবথেকে শক্তিশালী একক স্বাধীনতা। সেটাই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হওয়ায় কমিশন ভিলেন হয়ে গিয়েছে। ফল ভুগছে বিজেপি। কমিশন নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্যতা হারালো। বিজেপি হারাচ্ছে ভোটব্যাংক। যৌথ আত্মহত্যা।