


সম্পন্ন হল বাংলায় বহু প্রতীক্ষিত বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা। হয়ে গেল ১৬ জেলায় ১৫২ আসনে মোট ১,৪৭৮ জন প্রার্থীর নির্বাচনি ভাগ্য নির্ধারণ। প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বেশকিছু হেভিওয়েট রাজনীতির কারবারিও। পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। এজন্য এসআইআর পর্ব থেকেই শুরু হয়েছে বজ্রআঁটুনি। ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণের প্রক্রিয়া জারি রয়েছে কয়েকমাস যাবৎ। কিন্তু দিনের শেষে নাগরিকের হয়রানিই হয়েছে সার। ফাঁস হয়ে গিয়েছে এর পিছনে মোদি-শাহের পার্টির রাজনৈতিক খোয়াব পূরণের মতলব। সোজা কথায়, কমিশন-বিজেপি আঁতাঁতই দেশজুড়ে নিন্দার কেন্দ্রে এখন। উপযুক্ত কারণ ছাড়াই, নানা দফায়, লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে তারা। সারা দেশ জানে, বঞ্চিতদের মধ্যে রয়েছেন বহু প্রকৃত নাগরিক এবং যোগ্য ভোটার।
কমিশন-নাগরিক বিবাদ গড়িয়েছে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ট্রাইবুনাল গঠনের মাধ্যমে চলছে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সর্বশেষ চেষ্টা। শোনা গিয়েছিল, ভোটগ্রহণের আগেই বঞ্চিতরা ভোটাধিকার ফিরে পাবেন। কিন্তু শেষমেশ যা মিলল তা পর্বতের মূষিক প্রসবের অধিক কিছু নয়। কেননা, প্রায় ৩৮ লক্ষ ‘বৈধ’ ভোটার ট্রাইবুনালে আবেদন করেছিলেন। নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৬৫০ জনের আবেদন। বাদ গিয়েছেন ৫১১ জন। নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মাত্র ১৩৯ জনের। অর্থাৎ হাতেগোনা এই সংখ্যা নিয়েই প্রথম পর্বের ভোট করল বাংলা। প্রথম দফায় ভোটদানের জন্য নথিভুক্ত হয়েছে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ ৭৭ হাজার ১৭১ জনের নাম। অথচ, সংখ্যাটি আরো কয়েক লক্ষ বেশি হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তেমনই উদ্যোগ নিয়েছিল দেশের শীর্ষ আদালত। কিন্তু তার জন্য যে মজবুত পরিকাঠামো জরুরি সেটাই পাননি ট্রাইবুনালের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা। ইসিআইয়ের এই অদক্ষতা অপদার্থকে খুব ছোট্ট কথায় যথার্থই ব্যাখ্যা করছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস—ডিলে ট্যাকটিকস! এটা যুগপৎ বিজেপির প্রতি আরো একদফা পক্ষপাতিত্ব এবং বড়ো মাপের পাপ বললে অন্যায় হবে না। যাই হোক, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অন্যায়ের শিকার বাংলার মানুষ। যদিও রাজ্যের সিইও দায় ঝেড়ে ফেলার মতো করেই জবাব দিয়েছেন তাঁদের কৃতকর্মের। মনোজ আগরওয়ালের দাবি, ‘ট্রাইবুনালের কাজে আমরা নাক গলাচ্ছি না।’ জবাবখানা তাঁর লা জবাব! কিন্তু বহু মানুষের বেনজির নরকযন্ত্রণার দায় তাঁদেরকেই নিতে হবে।
গেরুয়া শিবিরের নির্দেশে কমিশনের বজ্রআঁটুনি এসআইআর কেলেঙ্কারিতেই শেষ হয়ে যায়নি। প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্র এবং সমস্ত বুথ নিয়ে জারি রয়েছে কমিশনের হাজারো ফতোয়া। প্রথম দফাতেই মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীর আড়াই লক্ষাধিক জওয়ান এবং ৪১ হাজার পুলিশ। বুলেট প্রুফ একগুচ্ছ সাঁজোয়া গাড়ির টহল চলেছে প্রতিটি অঞ্চলে। এছাড়া চক্কর কেটেছে ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং ওয়েব কাস্টিং হয়েছে সমস্ত বুথে। কিন্তু অভূতপূর্ব বজ্রআঁটুনির মধ্যেও বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবর মিলেছে কিছু জায়গা থেকে। ইভিএম ব্যবস্থাপনার গলদও ধরা পড়েছে অনেক বুথে। জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে গিয়ে হতাশ হয়েছেন কেউ কেউ! সোজা কথায়, হাজার ঢাক ঢোল পিটিয়েও কমিশন কমসংখ্যক নাগরিকের ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। এর জবাব জ্ঞানেশ কুমার এবং মনোজ আগরওয়ালকেই দিতে হবে। তবে আসল জবাব দেওয়া শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার থেকেই। অনেক লড়াই করে ভোটাধিকার বাঁচিয়েছেন যাঁরা, মোক্ষম জবাবটা দিচ্ছেন তাঁরাই। ভোটযন্ত্রে এই জবাব দিয়েছেন তাঁরা অবাঞ্ছিত এসআইআর যন্ত্রণার। ষড়যন্ত্র করে যাঁদেরকে ভোটার তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে, এই জবাব দেওয়া চলছে, নিশ্চিত করে তাঁদের হয়েও। কারণ সহনাগরিকের প্রতি সহমর্মিতার নীতি এখনো বিসর্জন দেয়নি বাংলা। এই জবাব বাংলা ও বাঙালির অস্মিতারক্ষার দায় থেকেও বটে।