


গণতন্ত্রের গুণমান যতগুলি বিষয়ের উপর নির্ভর করে তার মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল সুষ্ঠু নির্বাচন। সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রতিটি বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগ সুনিশ্চিত হওয়া জরুরি। তার জন্য প্রথমেই চাই ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা। ভোটকেন্দ্র তৈরি করা দরকার এমন স্থানে যেখানে ভোটদাতারা সহজে এবং নিরাপদে পৌঁছাতে পারবেন। প্রতিটি ভোটার ভোটদান করবেন তাঁর পছন্দের প্রার্থীকে এবং নির্ভয়ে। তাঁর ভোটদানের তথ্যাদি অবশ্যই গোপন থাকতে হবে। ভোট দিতে যাওয়ার পথে এবং ভোটদানের পরেও যেন ভোটারের আক্রান্ত হওয়ার কোনো ভয় না থাকে। এটাই হল ভোটগ্রহণে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার সুষ্ঠু ব্যবস্থা। তবে এই আদর্শ ব্যবস্থা গণনা পর্বেও সুনিশ্চিত হওয়া কাম্য। কারণ গণনাতেও যেন ভোটদাতার আশা-আকাঙ্ক্ষার হুবহু প্রতিফলন মেলে, অসাধু উপায়ে কেউ যেন তাতে কোনোরকম ফারাক সৃষ্টি করতে না পারে। তাহলে এই বিপুল আয়োজন অর্থহীন হয়ে পড়বে এবং বাস্তবে ধ্বংস হয়ে যাবে গোটা গণতান্ত্রিক প্রয়াস। বলা বাহুল্য, এই ‘রাজসূয় যজ্ঞের’ একমাত্র অধিকারী জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং প্রশ্নাতীত নিরপেক্ষতার সঙ্গে এই দায়িত্ব ইসিআইকেই পালন করতে হবে। এই গুরুদায়িত্বপালনে কমিশন সফল হলেই একটি প্রকৃত জনগণের সরকার তৈরি হতে পারবে।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে—‘ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে’! এই প্রবাদের মধ্যে বাড়াবাড়ি বা অতিসক্রিয়তার বার্তাটি সুস্পষ্ট। জ্ঞানেশ কুমারের ইসিআই অন্তত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এবার সেই ‘কীর্তিটাই’ স্থাপন করেছে। এর সূচনা হয়েছে সংশোধিত ভোটার তালিকা তৈরির জন্য এসআইআরের মধ্য দিয়ে। এসআইআর প্রক্রিয়াটি রকমারি ত্রুটিতে ভরা, যার চড়া মূল্য চোকাতে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে। শীর্ষ আদালতের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও এসআইআর যন্ত্রণার অবসান এখনো হয়নি। ভোটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার নামে বেনজির সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী নামানো হয়েছে রাজ্যজুড়ে এবং ভোটের অনেক আগে থেকেই। ওইসঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কমিশনের নিত্যনতুন ফতোয়া। যেমন সোমবার জারি হয়েছে বাইক নিয়ন্ত্রণের বেনজির বিজ্ঞপ্তি। তাতে বস্তুত তুঘলকি কারবার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে। কারণ আম জনতার সওয়ারি মোটর বাইকও এখন কমিশনের কোপে! বিজ্ঞপ্তির বক্তব্য, বাইক বাহিনীর চেনা দৌরাত্ম্য এবার রুখবেই তারা। তাই ভোটের দুদিন আগে থেকেই বাইক ‘নিষিদ্ধ’! ছাড় শুধু মেডিকেল ইমার্জেন্সি এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে। মঙ্গলবার সকালে এই নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসামাত্রই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। অসংখ্য মানুষ তাঁদের সহজ যাতায়াত, এমনকি রুজিরুটির প্রয়োজনেও দু-চাকার যান ব্যবহার করেন। তিনদিন বাইক বা স্কুটার চালানো বন্ধ হলে তার গুনাগার কে মেটাবে? কমিশন তো নয়? এমনকি, নির্দেশিকায় সাধারণ মানুষকে ‘দুষ্কৃতী’ দেগে দেওয়ার মতো হঠকারিতাও খুঁজে পাচ্ছেন সকলে। স্বভাবতই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে গোটা বাংলা। বাংলার মুড আঁচ করে মঙ্গলবার কিছুটা পিছু হঠেছে কমিশন। অ্যাপনির্ভর ডেলিভারি পরিষেবা এবং অ্যাপ ক্যাবগুলিকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তারপরও যে অসংখ্য বাইক-স্কুটার ব্যবহারকারী এর বাইরে থেকে গেলেন, তাঁদের বিষয়ে স্পিকটি নট কমিশন। উলটে, এবার ভোটে ‘অশান্তিপ্রবণ’ অলিগলিতে দ্রুত পৌঁছাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও বাইকে চাপানোর সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আর সেজন্য আগামী কদিন ব্যাপক হারে বাইক ধরপাকড় শুরু হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন রাজ্যের সিইও স্বয়ং।
২০ এপ্রিল এক বিজ্ঞপ্তি মারফত কমিশন জানায়, বাইক মিছিল করা যাবে না ভোটের দুদিন আগে থেকে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাইক চালানো যাবে না। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাইক চালানো যাবে ঠিকই, কিন্তু বাইকের পিছনে বসতে পারবেন না কোনো যাত্রী। ভোটগ্রহণের দিন বাইক চালানোর ক্ষেত্রে কী শর্ত? ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে বা জরুরি কোনো কাজে বাইক নিয়ে বেরোলে তবেই এই ছাড় মিলবে। চিকিৎসা, পারিবারিক কাজ কিংবা স্কুলে শিশুদের নিয়ে যাতায়াতকে জরুরি প্রয়োজনের বন্ধনীতে রেখেছে ইসিআই। পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য বাইকে সওয়ার হওয়ার বিষয়টিকেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব বিধিনিষেধের বাইরে ছাড় দরকার হলে ছুটতে হবে স্থানীয় থানায়। আম জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ শোনা যাচ্ছে, রাজ্যে কি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে! যা-খুশি তাই বললেই হল নাকি? কমিশন কী চাইছে এবং কার জন্য? সব মিলিয়ে মানুষের দুর্ভোগের যে ছবিটা উঠে আসে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়, বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ঘটনা নিন্দার ভাষা হারায় বইকি! এরপরও কি কমিশন স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার গ্যারান্টি দিতে পারছে? গত কয়েকমাসে তাদের বিতর্কিত কারবার দেখে বাংলা হারাচ্ছে সেই কাঙ্ক্ষিত ভরসা। ইসিআই যদি দিনের শেষে বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া উপহার দিয়ে বসে, তা হবে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত।