Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঙালির বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে বিজেপি

বিজেপির প্রার্থী তালিকা দেখেছেন? দেখে মনে হবে, ভোটটা কি আদৌ বাংলায় হচ্ছে? নাকি বিহার কিংবা উত্তরপ্রদেশে

বাঙালির বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে বিজেপি
  • ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১৭:০৪
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: বিজেপির প্রার্থী তালিকা দেখেছেন? দেখে মনে হবে, ভোটটা কি আদৌ বাংলায় হচ্ছে? নাকি বিহার কিংবা উত্তরপ্রদেশে? সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলার রাজনৈতিক অলিন্দে। কারণ, বঙ্গভূমিতে বিজেপির প্রার্থী তালিকায় ‘অবাঙালি’ নামের ছড়াছড়ি। এন্টালির প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়াল, জোড়াসাঁকোর বিজয় ওঝা থেকে শুরু করে নোয়াপাড়ার অর্জুন সিং...। এই তালিকা দেখে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মনে প্রশ্ন, এটা কি বঙ্গের প্রার্থী তালিকা? নাকি সুকৌশলে বাংলাকে অবাঙালিদের হাতে তুলে দেওয়ার ছক কষছে বিজেপি?

Advertisement

আসলে বিজেপি দলটাই এমন! মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ভীতি প্রদর্শন আর হিংসার আশ্রয় নিয়ে বাংলায় এক নতুন রাজনৈতিক থিওরি তৈরি করেছে গেরুয়া শিবির। বিজেপি বললে এখন একটা শব্দই মাথায় আসে— জুমলা। একসময় নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা গোটা দেশে যে শব্দ ব্যবহার করে কংগ্রেস তথা বিরোধীদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছেন, বাংলার মাটিতে সেই ‘জুমলা’ শব্দই তাঁদের দিকে বুমেরাং হয়ে ফিরছে। সেই ২০১৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদি-শাহ একের পর এক যে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন, তাতে এতদিনে জুমলার পাহাড় তৈরি হয়ে গিয়েছে। কে ভুলতে চায়, ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের প্রচারে কালো টাকা বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনে সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ করে ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির গল্প। পরে খোদ অমিত শাহ নিজেই বলেছিলেন, ওটা তো একটা জুমলা! কারও অ্যাকাউন্টে যে ওইভাবে ১৫ লাখ টাকা ঢুকবে না, সেটা বিরোধীরাও জানে, দেশবাসীও জানত। অথচ, সেই স্বপ্ন দেখিয়ে কোটি কোটি গরিব-মধ্যবিত্তের ভোট পেয়েছিল বিজেপি। ক্ষমতায় বসে ফের কালো টাকার গল্প শুনিয়ে গোটা দেশে নোটবন্দির যন্ত্রণা নামিয়ে এনেছিল বিজেপি।
লোকসভার ভোট প্রচারে মোদি বলেছিলেন, বছরে ২ কোটি কর্মসংস্থান হবে। তা নিয়ে কিছু ‘আহাম্মক’, ‘মাথা মোটা’-র লাফালাফি দেখেছিল এই বাংলাও। অথচ, আজ সব তথ্যই বলছে, মোদি সরকারের আমলে দিনের পর দিন কমছে কর্মসংস্থান। রেলসহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থায় আজ লক্ষ লক্ষ শূন্যপদ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু রেলেই ১.২ লক্ষের বেশি শূন্যপদ পড়ে রয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ১.৫৫ লক্ষ শূন্যপদ রয়েছে। সেখানে নিয়োগ না করে বিলুপ্ত করে দেওয়া হচ্ছে বহু পদ। সেক্টর ধরে ধরে তুলে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি সংস্থার হাতে। সেই মোদিবাহিনী বাংলায় ভোট প্রচারে এসে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ক্ষমতায় এলে নাকি ৬ মাসের মধ্যে সব শূন্যপদ পূরণ করে দেবে। এই প্রতিশ্রুতি কে বিশ্বাস করবে? গালভরা নাম দিয়ে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ চালু করেছিলেন মোদি। বলেছিলেন, উৎপাদনশিল্পে ভারত বিশ্বসেরা হবে। তথ্য বলছে, উৎপাদনশিল্পের হার ক্রমশ তলানিতে।
রাজ্যের গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষের কথা মাথায় রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন আর্থিক ভাতা প্রকল্পকে ‘রেউরি’ বলে কটাক্ষ করতেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মোদি বলেছিলেন, এ হল ভোটারদের লুব্ধ করে ভোট কেনার চেষ্টা। অথচ এখন সেই ‘রেউরিতেই’ মোক্ষলাভের পথ খুঁজছে বিজেপি। বাংলার ভোটে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে প্রত্যেক মহিলাকে মাসে ৩০০০ টাকা দেবে। এটা অবশ্যই ১৫০০ টাকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পালটা প্রতিশ্রুতি। তবে এই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহের জায়গা রয়েছে। কারণ, বিজেপি শাসিত কোনো রাজ্যে এমন কোনো প্রকল্প চালু হয়নি। বিধবা ভাতা এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিশেষ বর্গের মহিলাদের কিছু অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়। তবে বাংলায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো মহিলাদের সর্বজনীন প্রকল্প বিজেপি শাসিত কোনো রাজ্যে নেই। দিল্লি, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলিতে ভোটের আগে এমন কিছু ‘রেউরি’ প্রতিশ্রুতি দিলেও, ভোট মিটতেই সেসব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ভোটের আগে তৃণমূল সরকার যুবসাথী নামে বেকার ভাতা চালু করে মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। তাতে বরাদ্দ হয়েছিল ৫ হাজার কোটি টাকা। বিজেপি ইস্তাহারে ঘোষণা করেছে, ক্ষমতায় এলে তারা নাকি দ্বিগুণ বেকার ভাতা বা ৩ হাজার টাকা দেবে। অর্থাৎ, সরকারকে তখন ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে। এত টাকা আসবে কোথা থেকে? তার কোনো উত্তর নেই।
মহারাষ্ট্রে বিজেপি সরকার মহিলাদের মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়ার জন্য ‘লাড়কি বহিন’ প্রকল্প চালু করেছিল। কিন্তু সেই টাকা দিতে গিয়ে পেনশনের তহবিলে টান পড়েছে। অমিত শাহ যখন কলকাতায় বিজেপির ইস্তাহারে মহিলাদের ৩ হাজার টাকা ভাতার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করছেন, সেই সময়ই বম্বে হাইকোর্ট মহারাষ্ট্রের বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারকে বলেছে, ‘রাজ্যের কর্মচারীদের পেনশনের টাকা না থাকলে লাড়কি বহিন বন্ধ করুন। কোষাগারে টাকা না থাকলে সরকারি অফিসের চেয়ার, টেবিল, এসি, দামি গাড়ি বেচে দিন। পেনশন দিতেই হবে।’ বিজেপি এলে এই একই অবস্থা হবে আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রেও। বাংলার মহিলারা সেই ফাঁদে পা দেবেন কেন? এই বাংলার নারীসমাজ জেনে গিয়েছে যে, বিজেপি আজ মহিলাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রীর গ্যারান্টি, বিজেপি ভয়ের বদলে ভরসা দেবে। বাংলায় মহিলাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। এমন ভাব, যেন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি মহিলাদের জন্য স্বর্গ রাজ্য। প্রধানমন্ত্রী মোদিকেও মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, তিনি যখন পশ্চিমবঙ্গে নারীসুরক্ষার প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন তা নিতান্তই রাজনৈতিক কুম্ভীরাশ্রু বলে বাঙালিরা মনে করে। কারণ, নারীর সম্মান রক্ষায় তাঁর দলের ট্র্যাকরেকর্ড যেমন বলার মতো নয়, তেমনই তাঁর দলের শাসনে থাকা রাজ্যে নারী-নির্যাতনের ঘটনায়, এবং তার প্রতিক্রিয়ায় সরকার ও দলের ভূমিকা ন্যক্কারজনক। কেউ ভুলে যায়নি, মণিপুরে যখন প্রবল নারীনিগ্রহ চলছে, প্রধানমন্ত্রী তখন টুঁ শব্দটিও করেননি। বিরোধীদের অভিযোগ, তাঁর সেই নীরবতা সে রাজ্যে বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থেই। 
রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকার শুধু নারীদের নিরাপত্তা দিতে চরম ব্যর্থ তাই নয়, একের পর এক ঘটনায় সামনে এসে গিয়েছে, তারা ধর্ষক-নির্যাতনকারীদের রীতিমতো পৃষ্ঠপোষকতা করে। মানুষ ভুলে যায়নি, নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের নিজের রাজ্য গুজরাতে বিলকিস বানোর ধর্ষণকারীদের জেলমুক্তির পর সেখানকার বিজেপি নেতারা কীভাবে সেইসব দুষ্কৃতীকে ফুল-চন্দন দিয়ে বরণ করে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন। মানুষ ভুলে যেতে পারেন না, কাঠুয়ায় এক নাবালিকা কন্যাকে মন্দিরে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ চালিয়ে হত্যা করেছিল যে নরপিশাচরা, তাদের সমর্থনে মিছিল করেছিল বিজেপি। সেই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিজেপির এক বিধায়ক। হাতরস, উন্নাও– বিজেপির শাসনে কলঙ্কিত অধ্যায়ের কোনো কমতি নেই। মোদির লোকসভা কেন্দ্রে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণে অভিযুক্ত বিজেপি ছাত্রনেতা— দলীয় সমর্থকরা যখন তাদের ফুল-মালায় বরণ করে নিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কোনো আপত্তি জানাননি। দেশের প্রথম সারির কুস্তিগিররা যৌন হেনস্তার স্পষ্ট অভিযোগ জানিয়ে বিপুল আন্দোলনে নামা সত্ত্বেও ব্রিজভূষণ শরণ সিং দৃশ্যত প্রধানমন্ত্রীর স্নেহবঞ্চিত হননি। খোদ অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র দফতরের অধীন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র ২০২৫-এর রিপোর্ট বলছে, সমস্ত রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে নবম স্থানে। এই রাজ্যের থেকে বেশি নারী নিগ্রহের হার যে আটটি রাজ্যে রয়েছে তার সাতটিই বিজেপি শাসিত। ধর্ষণের হিসাবে, ওই একই সরকারি সূত্র বলছে, প্রথম পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে (যাতে পশ্চিমবঙ্গ নেই) চারটিই বিজেপি শাসিত। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বড়ো শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে কম ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কলকাতাতেই। যারা নিজেদের শাসন করা রাজ্যে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, তাদের মুখে পশ্চিমবঙ্গে নারী 
সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি খুব একটা ভরসা জোগায় না। এরপরও ভোটের প্রচারে ‘ভয়’-এর গল্প শোনাচ্ছে বিজেপি। অথচ, তাদেরই রিপোর্ট বলছে, কলকাতা এখন দেশের বড়ো শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে সুরক্ষিত। আর দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দিল্লির, যেখানকার পুলিশ সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। কে বিশ্বাস করবে বিজেপিকে?
মোদি গ্যারান্টি দিয়েছেন, সরকারি সিস্টেম জনতাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকবে। শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু ঘটনা হল, সরকারের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার সুযোগ কমিয়ে এনেছে মোদি সরকারই। তথ্যের অধিকার আইনকে ভোঁতা করতে করতে প্রায় অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। সমাজমাধ্যমেও অস্বস্তিকর প্রশ্ন করা আটকানোর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এক সময় বিজেপি নিজেকে দুর্নীতিবিরোধী শক্তি হিসেবে দাবি করেছিল। আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা কাল পর্যন্ত বিজেপির চোখে ‘চোর’ ছিলেন, দলে ঢোকার পর তাঁরাই ‘ধোয়া তুলসী পাতা’। এই দ্বিচারিতাই বিজেপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ভিতর থেকে ক্ষয় করেছে। রাজনীতিতে মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ধারাবাহিক দ্বিচারিতা মানুষ ক্ষমা করে না। বাংলার মানুষ জানে, এটাই বিজেপির প্রকৃত ওয়াশিং মেশিন রাজনীতি। যে দুর্নীতির প্রশ্নে মোদিজির চোখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে, সেই দুর্নীতির পাঁকে হাবুডুবু খাচ্ছে তাঁর ডবল ইঞ্জিন সরকারগুলিই। মধ্যপ্রদেশে পঞ্চায়েত দফতরে নিয়োগ থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশে ৬৯,০০০ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ— বিজেপি আর মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে বিজেপি।
সবাই দেখছে, মোদির ‘সংকল্প’ আর জুমলা, মিলেমিশে একাকার!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ