


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে গৈরিকীকরণ চলে আসছে গত কয়েক বছর ধরেই। প্রায় প্রতিটি ক্রীড়া সংস্থার মাথায় বিরাজ করছেন শাসক দলের প্রীতিভাজনরা। এবার তার সঙ্গে উড়ল উগ্র হিন্দুত্ববাদের ধ্বজাও! দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট আইপিএল থেকে বিতাড়িত বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। আচমকাই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে এমন নির্দেশ পাঠিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। পরিবর্তে অন্য কোনও ক্রিকেটারকে দলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বোর্ড সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। অগত্যা সেই নির্দেশ শিরোধার্য করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুস্তাফিজুরকে রিলিজের কথা ঘোষণা করেছে শাহরুখ খানের ফ্র্যাঞ্চাইজি।
আগামী আইপিএলে বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে দল পেয়েছিলেন ৩০ বছর বয়সি বাঁ হাতি পেসার। মিনি নিলামে তাঁকে ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকায় কিনেছিল কেকেআর। হায়দরাবাদ, মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাই, রাজস্থানের ফ্র্যাঞ্চাইজির জার্সিতে অতীতে মোট আটবার এই আসরে খেলেছেন মুস্তাফিজুর। আদায় করে নিয়েছেন সমীহ। কিন্তু বল গড়ানোর আগেই গেরুয়া শিবির প্রভাবিত বিসিসিআইয়ের বাউন্সারে ক্লিন বোল্ড ‘কাটার মাস্টার’। তাঁকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে দু’দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতির কথা উল্লেখ্য করেছেন বোর্ড সচিব সাইকিয়া। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সংশয় দূর হচ্ছে না। মাথায় রাখতে হবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কিংবা ভারতকে উদ্দেশ্য করে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের আস্ফালন দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। তবু এতদিন পাকিস্তানের মতো সে দেশের সঙ্গে ক্রীড়া সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটেনি কেন্দ্র সরকার কিংবা বিসিসিআই। এমনকী, ওপার বাংলায় মৌলবাদীদের হাতে দীপু দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরেও চুপ থেকেছেন পদাধিকারীরা। কিন্তু সঙ্গীত সিং, মীরা রাঠোরের মতো গেরুয়া ব্রিগেডের নেতা-নেত্রীরা উগ্র হিন্দুত্ববাদের সুর চড়াতেই কাঁধ ঝুঁকে গেল বোর্ডের। সেই দলে যোগ দেন কয়েকজন ধর্মীয় গুরুও। মুস্তাফিজুরকে দলে নেওয়ার ‘অপরাধ’-এ কেকেআর কর্ণধার শাহরুখকে পর্যন্ত আক্রমণ করতে ছাড়েননি তাঁরা। হিন্দু নেত্রী মীরা তো আবার কিং খানের জিভ ছিঁড়ে ফেলার জন্য এক লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন! পার্টি দরদীদের আক্রোশের বহর দেখেই পিলে চমকেছে অমিত-পুত্র জয় শাহর অনুগত বিসিসিআই কর্তাদের। অগত্যা আইপিএলে দরজা বন্ধ বাংলাদেশি ক্রিকেটারের। শনিবার সাইকিয়া বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর কথা মাথায় রেখে বিসিসিআই একটি নির্দেশ দিয়েছে কেকেআরকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। পরিবর্ত ক্রিকেটার নিতে চেয়ে আবেদন করলে বোর্ড তাদের সেই অনুমতি দেবে।’
২০০৮ সালে মুম্বইয়ে জঙ্গি হামলার পর থেকে ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট স্থগিত রয়েছে। পরের বছরই পাক ক্রিকেটারদের জন্য বন্ধ হয়ে যায় আইপিএলের দরজা। এবার বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেও কি সেই পথে হাঁটার বার্তা দিল বিসিসিআই? মুস্তাফিজুরকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এমন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। শুধু তাই নয়, ভারতের মাটিতে আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় মাথাচাড়া দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তানের মতো তারাও বিকল্প ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কায় খেলতে চেয়ে আইসিসি’কে চিঠি দিতে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানান, মুস্তাফিজুরের আইপিএল থেকে বাদ পড়া সংক্রান্ত সরকারি নথি হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন তাঁরা। শনিবার সন্ধ্যায় বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকেও বসেন তিনি। রাতের দিকে স্বয়ং মুস্তাফিজুরের প্রতিক্রিয়াও আসে। তাঁর ছোট্ট মন্তব্যে স্পষ্ট অসহায়তা, ‘ছেঁটে ফেললে আর কী করার থাকতে পারে?’
তবে মুস্তাফিজুর ইস্যুতে কোনওরকম আর্থিক ক্ষতি হবে না কেকেআরের। কারণ, আইপিএল শুরুর আগেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটারটিকে। তাছাড়া এই বহিষ্কার সম্পূর্ণ অক্রিকেটীয় কারণে, যা নাইট কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নেই।