সুদীপ্ত সেন কলকাতা
সুদীপ্ত সেন কলকাতা
দীর্ঘ লাইন দিয়ে ভিড় ঠেলে মণ্ডপে ঢুকে দু’হাত কপালে ঠেকাতে না ঠেকাতেই হাতে যদি চলে আসে শারদোৎসবের শুভেচ্ছাবার্তা। বহু প্রাচীন একটি লেটারপ্রেস থেকে তা ছাপা হয়েছে। সদ্য ছেপে বেরিয়েছে বলে মৃদু গরম। এমন যদি হয় ঠাকুর দেখার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাই না? এবার দর্শনার্থীদের এমন অভিজ্ঞতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা পাঁচের পল্লির।
এবার এই পুজোর ৮৬ তম বর্ষ। থিম, ‘এই শহর, সেই সময়’। সৃজনে সৌমিক-পিয়ালি। সৌমিক জানালেন, আমাদের কাজের মূল জায়গা বটতলার ছাপা ও ছবি। স্যার জেমস লং ও তাঁর দুই বন্ধুর হাত ধরে এর সূত্রপাত হয়েছিল। তাঁরা হরফ তৈরি করেছিলেন। কারণ এখানে ব্যবসা চালাতে ও শাসন করতে বাংলা ভাষা জানা জরুরি হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী কালে বাঙালিটোলার (শোভাবাজার থেকে জোড়াসাঁকো, চিৎপুর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল) অলিগলিতে বাঙালি মালিকানাধীন একাধিক ছাপাখানা গড়ে ওঠে। প্রচুর চাহিদা থাকায় প্রথমে পঞ্জিকা ছাপা হতো। পরে প্রেসগুলি ধীরে বই ছাপানো শুরু করে। তার অধিকাংশ ছিল আদি-রসাত্মক ধরনের। বঙ্কিমচন্দ্র পর্যন্ত এই বইয়ের সমালোচনা করেছিলেন। তবে পরবর্তী কালে গল্প, অনুবাদ সাহিত্যও ছাপা হতে থাকে। এই বটতলা সাহিত্যের বিশেষত্ব হল, এখানকার ছাপাখানার বই দোকানে পাওয়া যেত না। মাথায় ঝুড়ি করে বিক্রি হতো। তৎকালীন সময়ের এইসব কাজ নিয়েই আমাদের বিষয়ভাবনা। মণ্ডপে ঢুকলে মনে হবে টাইম মেশিনে উঠে দেড়শো বছর পুরনো কলকাতায় পৌঁছে যাওয়া হয়েছে। কী কী থাকছে মণ্ডপে? সৌমিক বলেন, পাথুরিয়াঘাটা বহু পুরনো এলাকা। এখানে রয়েছে টেগোর ক্যাসেল, যদুনাথ মল্লিক, খেলাত ঘোষদের প্রাসাদের মতো বাড়ি। ছবির মাধ্যমে সেগুলি তুলে ধরছি প্যান্ডেলে। এখানে হেরিটেজ রক্ষার তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। মণ্ডপসজ্জায় সে সংক্রান্ত বার্তাও থাকছে। প্রাচীন লেটারপ্রেস, প্রায় দেড়শো বছর পুরনো পঞ্জিকা, বর্ষপঞ্জির দেখা মিলবে। অন্দরমহলে শোভা পাবে কলকাতার একটি ১৬৫ বছরের পুরনো মানচিত্রের ছবিও। সবমিলিয়ে দর্শনার্থীরা পুরনো কলকাতাকে ফিরে দেখার সুযোগ পাবেন এখানে এলে। আর প্রতিমা? শিল্পীর উত্তর, এই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পিয়ালি বা আমার পছন্দ নয়। তাই সাবেক ধাঁচের প্রতিমাই করা হয়েছে। মহালয়ায় দেবীর চক্ষুদান করেছেন পিয়ালি।
পাঁচের পল্লির ঠাকুর দেখে পাথুরিয়াঘাট স্ট্রিট থেকে খানিক হাঁটলেই জোড়াসাঁকো সাধারণ দুর্গোৎসব সমিতির পুজো। ৮৮তম বছরে পা তাদের। এবছর তাদের থিম ‘প্রবাহিনী’। প্রাচীন নৃত্যশৈলী ভরতনাট্যমকে ভিত্তি করে মণ্ডপ ও প্রতিমা সাজিয়ে তুলেছেন মলয়-শুভময় জুটি। মলয় বলেন, মণ্ডপসজ্জায় প্রাচীন স্থাপত্য শৈলীকে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। দক্ষিণের মহাবলীপুরমের ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক স্তম্ভও থাকছে। প্রতিমায় মৌলিকত্ব রাখতে ভরতনাট্যমের মঞ্চের মতো করে তৈরি হচ্ছে দুর্গার বেদী। থিয়েটারের স্টেজের ধাঁচের বারান্দা ও সিঁড়ি। এখানে দুর্গা সাধারণ নারী। তিনি দশভুজা নন। দু’টি হাত। ভরতন.ট্যমের মুদ্রা সহ অধিষ্ঠিত। সাধারণের মধ্যে আসাধারণত্বকে উদযাপন করতেই দেবীকে এভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। থিম ‘প্রবাহিনী’র ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শুভময় বলেন, ভরতনাট্যম শুধু মাত্র একটি নৃত্যধারা নয়, এটি সাধনা। তবুও সাদির আট্টম থেকে দাসী আট্টম হয়ে ভারতনাট্যমের পথ ছিল বন্ধুর। তা সত্ত্বেও প্রাচীন এই শৈলীকে আটকে রাখা যায়নি। যুগের পর যুগ ধরে অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো জাতির মজ্জায় মজ্জায় প্রবাহিত। প্রতিমা, মণ্ডপসজ্জায় প্রবাহিনীর সেই বার্তাই তুলে ধরার চেষ্টা।