পিনাকী ধোলে, আড়ষা: এ যেন মেঘ না চাইতে জল! মেঘ হোক বা না হোক, জলই চেয়েছিলেন আড়ষা ব্লকের হেঁসলা গ্রাম পঞ্চায়েতের বারপাড়ার বাসিন্দারা। দাবি মেনে গ্রামে একটি নলকূপ বসাচ্ছিল পঞ্চায়েত। মাত্র কয়েক ফুট বোরিং হতেই হু হু করে জল বেরোতে থাকে। তার পর থেকে আর থেমে থাকা নেই। প্রায় তিন বছর হতে চলল বোরিংয়ের মুখ থেকে জল বেরিয়েই চলেছে। এমনিতেই গোটা পুরুলিয়া রুখাশুখা। গ্রীষ্মে প্রবল জলকষ্ট। খাল-বিল-পুকুর—সব শুকিয়ে কাঠ। আড়ষার এই বারপাড়াও ব্যতিক্রম নয়। সেখানে এভাবে রুক্ষ বসুন্ধরার অনর্গল ‘জল বমি’ দেখে অবাক এলাকাবাসী। মুখে মুখে খবর পেয়ে দূর-দুরান্তের মানুষও ইদানীং আসতে শুরু করেছেন। ক্রমেই দ্রষ্টব্য হয়ে উঠছে বারপাড়া।
পুরুলিয়া থেকে সিরকাবাদ যেতে পড়ে বারপাড়া। অযোধ্যার অন্যতম শৃঙ্গ ঢলবুরু পাহাড়ের কোলেই অবস্থিত এই গ্রাম। সেখানেই বসুন্ধরার অকৃপণ জলদান। পাম্প করার বালাই নেই। বৈদ্যুতিন কোনও মোটর নেই। অথচ, বছরের সব ঋতুতেই জল বেরোচ্ছে বোরিংস্থলে। হেঁসলা গ্রাম পঞ্চায়েত সূত্রের খবর, ২০২২-২৩ সালে পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের প্রায় ৮৪ হাজার টাকা বরাদ্দ হয় গভীর নলকূপ বসাতে। বোরিংয়ের কাজ শুরু হয়। জলস্তর পেতে কমপক্ষে ৬০০ থেকে ৭০০ ফুট খুঁড়তে হয়। কিন্তু, এই নলকূপের বোরিংয়ের কাজ শুরু হতেই ঘটে যায় অভাবনীয় কাণ্ড!
স্থানীয় বাসিন্দা কৃষ্ট মান্ডি, জমিশ্বর মান্ডিরা বলছিলেন, ‘নলকূপটি বসাতে মাত্র দেড়শ ফুট পাইপ পোঁতা হয়েছে। এমন সময় হঠাৎ তীব্র গতিতে জল বেরিয়ে আসতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে মিস্ত্রিরা নলকূপ বসাতে ব্যর্থ হন। পোঁতা পাইপও তাঁরা আর তুলতে পারেননি। সেই পাইপের মুখ দিয়ে জল বেরোচ্ছে বেশ গতিবেগে। এবং এতটাই গতি যে, মোটর চালিত পাম্পও হার মানবে!’ এমন কাণ্ডকে অনেকটা ‘বসুন্ধরার আশীর্বাদ’ বলছেন ময়না মুর্মু, বুদ্ধেশ্বর মান্ডিরা। তাঁদের কথায়, ‘আমাদের জেলায় এই গরমে একটু জল পেতে মানুষ হাহাকার করে। তৃষ্ণায় কত মানুষের যে বুক ফেটে যায়, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। অথচ দেখুন, আমরা এত জল কি করব ভেবেই কুল কিনারা পাই না! আমাদের এখানে কোনও নালা নেই। ওই জল রাস্তার উপর দিয়ে গড়িয়ে যায়। সবসময় রাস্তা কাদা হয়ে থাকে। প্রশাসনের কাছে আর্জি, কোনওভাবে যদি ভূগর্ভের এই দানকে সংরক্ষিত করা যায়।’
কিন্তু কেন এমন ঘটনা? পুরুলিয়ার সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ বেরা বলছিলেন, ‘আর্টেজিও কূপের কারণে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে, বিষয়টি আরও ভালো করে বুঝতে আমি ওই এলাকা পরিদর্শনে যাব।’ আর্টেজিও কূপ কি? বিশ্বজিৎবাবুর ব্যাখ্যা—‘দুটো অপ্রবেশ্য শিলাস্তারের মধ্যে যদি প্রবেশ্য শিলাস্তর অর্ধচন্দ্রকারে অবস্থান করে এবং এই আবদ্ধ শিলাস্তরের উভয় পার্শ্ব যদি ভূ-পৃষ্ঠের সঙ্গে উন্মুক্ত থাকে সেক্ষেত্রে বৃষ্টিপাতের জল দু’পাশের উন্মুক্ত প্রবেশ্য জলবাহী এবং জলধারণকারী শিলাস্তরে প্রবেশ করে। এক্ষেত্রে প্রবেশ্য শিলাস্তরে জলজ চাপ বায়ুমন্ডলীয় চাপের থেকে বেশি হওয়ায় অপ্রবেশ্য শিলাস্তরে কোন দুর্বল স্থান বরাবর জল বাইরে স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে আসতে চায়। বারপাড়ায় ঠিক এই ঘটনা ঘটেছে বলে আমার প্রাথমিক অনুমান।’