তন্ময় মল্লিক: নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন, ‘তাঁর শরীরে রক্ত নয়, সিন্দুর বইছে।’ সেই হিসেবে ‘অপারেশন সিন্দুরে’র সাফল্যের কথা দেশে দেশে গিয়ে তাঁরই প্রচার করার কথা। কিন্তু সেটা না করে ৩২টি দেশে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল পাঠানো হচ্ছে। এর কারণটা কী? বিজেপি খুব ভালো করেই জানে, নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতের বৈদেশিক সম্পর্ক প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে।
যুদ্ধবিরতি চললেও সঙ্কট কি কেটেছে? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথাতেই তৈরি হয়েছে এই সংশয়। যুদ্ধের কথা মাথায় রেখেই চলছে মক ড্রিল। বেশি মানুষ আক্রান্ত হলে বা মারা গেলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে, দেশজুড়ে চলছে তারই প্রশিক্ষণ। স্টেশনের মতো জনবহুল এলাকায় জঙ্গিহানা হলে কী করতে হবে, তাও বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ড্রোন হামলা, এয়ার স্ট্রাইক বন্ধ হলেও পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র কিন্তু অব্যাহত। এই পরিস্থিতিতেও বিজেপি রাজনীতি করে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে সাংসদদের প্রতিনিধি দল পাঠানো নিয়ে যা হল তা অনেকের চোখেই ‘নোংরা রাজনীতি’। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যখন সমস্ত দল এককাট্টা, তখন এই রাজনীতির কি খুব দরকার ছিল?
পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারত কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটা বিশ্ববাসীকে জানানোর সিদ্ধান্ত অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই উদ্যোগে শুধু পাকিস্তানের নয়, তার সহযোগী দেশগুলিরও মুখোশ খুলে যাবে। দেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি বিভিন্ন দেশে গিয়ে একই সুরে কথা বললে বিশ্বের দরবারে ভারতের মর্যাদা অবশ্যই বৃদ্ধি পাবে। এটা বোঝানো যাবে, ‘আমরা কোনও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নই। আমাদের লড়াই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। তাই কেবল জঙ্গিঘাঁটি লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে প্রত্যাঘাত। ভারত শান্তি চায় বলেই অ্যাডভান্টেজে থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। কোনও দেশের ‘দাদাগিরি’তে লড়াই থামায়নি।’
পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার ঘটনার পর কেটে গিয়েছে একটি মাস। এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। জানা যায়নি, কার ব্যর্থতার জন্য ২৬ জন নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হল। এখনও অজানা, ‘অপারেশন সিন্দুরে’ জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও পহেলগাঁওয়ের খুনিরা মারা গিয়েছে কি না! কোন অধিকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প আগাম যুদ্ধবিরতির কথা ঘোষণা করলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া সত্ত্বেও বিরোধীরা দেশে দেশে তাদের প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়েছে। তারপরেও কেন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা না করেই বিজেপি একতরফাভাবে প্রতিনিধি ঠিক করেছিল?
সর্বদলীয় প্রতিনিধি মনোনীত করা নিয়ে বিজেপি যা করল সেটা এড়িয়ে চললেই ভালো হতো। ৩২টি দেশে সাতটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের। অবশ্যই অভিনব পদক্ষেপ। কিন্তু কোন দল কাকে প্রতিনিধি করে পাঠাবে, তার দায়িত্ব কেন বিজেপি নিতে গেল? কেন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রতিনিধিদের নামের তালিকা আগাম প্রকাশ করা হল? একে ‘দাদাগিরি সুলভ’ আচরণ না বললেও কিছুতেই ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি বলা যাবে না। কংগ্রেসের সঙ্গে তো বটেই তৃণমূলের প্রতিনিধি পাঠানো নিয়ে বিজেপি যা করেছে, তার পিছনে রাজনীতি আছে বলে অনেকে মনে করছেন।
বিজেপি হিন্দুদের স্বঘোষিত অভিভাবক। তারা অত্যন্ত সচেতনভাবেই এই বার্তাটা দেশবাসীকে দিয়ে থাকে। শুধু কথায় নয়, কাজের মধ্যে দিয়েও সেটা প্রমাণের চেষ্টা করে। এত বড় দেশে বিজেপি কোনও মুসলিমকে লোকসভা ভোটে প্রার্থী করেনি। বিজেপির ‘সংখ্যালঘু মুখ’ মুক্তার আব্বাস নাকভিকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেয়নি। এমনকী, রাজ্যসভার প্রার্থী করেনি। এহেন বিজেপি বাংলা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে বহরমপুরের সাংসদ ইউসুফ পাঠানকে মনোনীত করাটা বিজেপির রাজনৈতিক চাল ছাড়া কিছুই নয়।
বছর ঘুরলেই বাংলার বিধানসভা নির্বাচন। বঙ্গ-বিজেপি যেভাবে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে লাগাতার বিষোদ্গার করেছে তাতে তারা মুসলিম ভোট পাবে না, সেটা দিল্লির নেতারাও বুঝে গিয়েছেন। বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতির ধাক্কায় সংখ্যালঘু ভোটের সিংহভাগ তৃণমূলে গেলে বাংলা দখলের দৌড়ে তারা টিকে থাকতে পারবে না। তাই কি সংখ্যালঘু ভোটকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে বিজেপি? সেই কারণেই কি তারা ইউসুফ পাঠানের নাম নিয়েছিল? এই প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
যে বিজেপির ঠিক করা নাম পত্রপাঠ খারিজ করে দেবেন, সেটা গেরুয়া শিবির খুব ভালোই জানত। গেরুয়া শিবির ভেবেছিল, তৃণমূল ইউসুফ পাঠানকে বাদ দিলে তাদের মুসলিম ভোট না ভাঙলেও সুড়সুড়ি দেওয়ার রাস্তাটা তৈরি হবে। আর তাতে কুলোর বাতাস দেওয়ার জন্য বঙ্গে ‘রামধনু জোটে’র সঙ্গীরা তো আছেই।
তৃণমূল সুপ্রিমো ইউসুফ পাঠানের নাম খারিজ করতেই রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বঙ্গ-বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিনিধি না পাঠিয়ে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদীদের সুবিধে করে দিচ্ছেন, এমন প্রচারও শুরু করে দিয়েছিল। বিজেপি ভেবেছিল, তাতে হয়তো হিন্দুভোট এককাট্টা হবে। কিন্তু, শেষরক্ষা হয়নি। উল্টে চাপে পড়ে বিজেপি সরকার তৃণমূল মনোনীত সদস্যকে পাঠাতেই বাধ্য হল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের একবার প্রমাণ করলেন, চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ে শেষপর্যন্ত
জয়ী হন তিনিই।
পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মানেই কিন্তু সঙ্কটমুক্তি নয়। পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পর এমন কিছু বিষয় সামনে আসছে, যাতে দেশবাসীর চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। হরিয়ানার ভ্লগার জ্যোতিরানি মালহোত্রার একের পর এক কীর্তি ফাঁস হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, ভারতের বহু গোপন তথ্য শুধু পাকিস্তানের হাতে নয়, চলে গিয়েছে চীনের কাছেও। তাতে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ট্রাভেল ভ্লগিংয়ের নামে জ্যোতি অরুণাচলপ্রদেশ, কাশ্মীর সহ দেশের স্পর্শকাতর ও সামরিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ছবি এবং খুঁটিনাটি তথ্য ‘শত্রু’ দেশের হাতে তুলে দিয়েছে।
গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, জ্যোতি একাধিকবার পাকিস্তানে ও চীনে গিয়ে দুই দেশের গুপ্তচর সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। তাদের নির্দেশমতো ভারতের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এমন সব তথ্য হাতে তুলে দিয়েছে যাতে পাকিস্তান এবং চীন তাদের দেশে বসেই ভারতে নাশকতা চালানোর ছক কষতে পারে।
শুধু জ্যোতি নয়, বিভিন্ন রাজ্যের আরও অনেকে এই ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাদের বেশিরভাগই অমুসলিম। সেই সব বেইমানের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজনকে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এখনও অনেকে বিশ্বাসঘাতক, বেইমান, গদ্দার দেশের খেয়ে দেশেরই ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ফের একটা পহেলগাঁও বা তারচেয়েও মারাত্মক কিছু ঘটনা ঘটবে না, এমন গ্যারেন্টি কেউ দিতে পারছে না। তাই যুদ্ধবিরতি মানেই যাঁরা সঙ্কটমুক্তির আনন্দে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেছেন, তাঁরা পরোক্ষে দেশেরই ক্ষতি করছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বিজেপি সরকার সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল পাঠানোর উদ্যোগ নিল? ইতিহাস বলছে, কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ মোদিজি কিছুতেই হাতছাড়া করতে চান না। নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। উদ্দেশ্য, প্রচারের সমস্ত আলো নিজের দিকে টানা। রামমন্দিরের উদ্বোধন কোনও সাধু-সন্তকে দিয়ে না করিয়ে তিনি নিজেই করেছেন। তিনিই দেশের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী জীবিত অবস্থায় যাঁর নামে স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন, ‘তাঁর শরীরে রক্ত নয়, সিন্দুর বইছে।’ সেই হিসেবে ‘অপারেশন সিন্দুরে’র সাফল্যের কথা দেশে দেশে গিয়ে তাঁরই প্রচার করার কথা। কিন্তু সেটা না করে ৩২টি দেশে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল পাঠানো হচ্ছে। এর কারণটা কী?
বিজেপি খুব ভালো করেই জানে, নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতের বৈদেশিক সম্পর্ক প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। রাজনৈতিক মহল মনে করে, তার অন্যতম প্রধান কারণ বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। এই নীতির জন্য বহু দেশ আমাদের অপছন্দ করে। সম্ভবত সেই কারণে সন্ত্রাসবাদীদের মদতদাতা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে খুব বেশি দেশকে পাশে পাওয়া যায়নি।
বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব হয়তো বুঝতে পারছে,
যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা নরেন্দ্র মোদির
একার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিজেপি সরকার নানাভাবে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করতে
চাইছে। দেশে-দেশে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল পাঠানো তারই অঙ্গ। শুরুটা হয়েছিল সোফিয়া কুরেশিকে
দিয়ে। ফিনিশিংটা কীভাবে হবে, সেটা মোদিজিই জানেন। তবে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলে আছেন আসাউদ্দিন ওয়াইসিও। আপাততন হিন্দুত্ব ছেড়ে এখন সর্বদল, সর্বধর্ম। বিজেপি না পারছে গিলতে,
না পারছে ফেলতে। এসব দেখে অনেকেই
বলছেন, আক্ষরিক অর্থেই বিজেপির এখন সাপের ছুঁচো গেলা অবস্থা।