ভারতের নির্বাচনে একাধিক রাজ্যে সংখ্যালঘু ভোটদাতাদের বিশেষ গুরুত্ব। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ রয়েছে অগ্রভাগে। এরাজ্যের ধর্মীয় সংখ্যালঘু শ্রেণির মধ্যে মুসলিমরাই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। তারা মোট জনসংখ্যার প্রায় তিনভাগের একভাগ বলেই অনুমান করা হয়। বস্তুত উত্তরপ্রদেশের পর পশ্চিমবঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। ২০১১ সালের সেন্সাস অনুসারে, বাংলার ২৩টি জেলার মধ্যে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, দুই ২৪ পরগনা, বীরভূম, নদীয়া, হাওড়া, কোচবিহার প্রভৃতি জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা ২৫ শতাংশের বেশি। গত একদশকে এই ভারসাম্য আরো বদলে গিয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান। রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৬০টি রয়েছে উপর্যুক্ত নয়টি জেলায়। ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেই মুসলিম ভোটের গুরুত্ব অনুধাবন করে। এটাকে তারা যতদিন ভোটব্যাংক হিসেবে রক্ষা করতে পেরেছিল, ততদিন সিপিএম তথা বামফ্রন্টের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামেরা ওই দুর্গ রক্ষায় ব্যর্থ হয়। সেবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস যে বিপুল জয় পেয়েছিল তার পিছনে ছিল সংখ্যালঘু ভোটারদের অকুণ্ঠ আশীর্বাদ।
মমতা পরপর তিনবার রাজ্যে ক্ষমতাসীন। ২০২১ সালে তৃণমূলকে হটাবার জন্য মরিয়া হয়েছিল বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরন্দ্রে মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডা-সহ একঝাঁক কেন্দ্রীয় নেতা বস্তুত ডেইলি প্যাসেঞ্জারের পর্যায়ে নেমে এসে মমতার বিরুদ্ধে প্রচারে ঝড় তুলেছিলেন। দুশোর বেশি আসন নিয়ে নবান্ন দখল করবে বলেও হুংকার ছেড়েছিল গেরুয়া শিবির। কিন্তু বাস্তবে একশোর অনেক আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল তাদের অশ্বমেধের ঘোড়া। ভোট বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মুসলিম ভোটের প্রায় কিছুই বিজেপির ঝুলিতে ঢোকেনি। পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে তারই পুনরাবৃত্তি প্রকট হয়। বিজেপিওয়ালারা বেশ বুঝে গিয়েছে, বাংলায় সংখ্যালঘু ভোট বাদ দিয়েই তাদের নির্বাচনি লড়াই দিতে হবে। তাদের মূল ভরসা হিন্দু ভোট। হিন্দু ভোট এককাট্টা করতে না পারলে গেরুয়া শিবির ক্ষমতার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারবে না। তাই বিরোধী দলনেতা থেকে শুরু করে বিজেপির অনেকেই মেরুকরণের অস্ত্রে শান দিতে নেমে পড়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে নস্যাৎ করার আওয়াজ উঠে গিয়েছে ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগেই। তবে এখানে হিন্দু ভোট এককাট্টা হওয়া অসম্ভব। তার কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাজকল্যাণমূলক সরকারি প্রকল্পগুলির বেনিফিসিয়ারি হিন্দু, মুসলিমসহ সকলেই। রাজনৈতিক মহলের অনুমান, এই কারণে বিজেপি আসন্ন ভোটের ঘুঁটি সাজাচ্ছে মুসলিম ভোটকে মাইনাস ধরেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রার্থীরা ঢালাও সংখ্যালঘু ভোট পান। তৃণমূলের জয়ের চওড়া মার্জিন ওই ভোটে বহুলাংশে নির্ধারিত হয়। তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জব্দ করার সহজ ফন্দি কী হতে পারে? মুসলিম ভোটার কমিয়ে ভোটার তালিকা তৈরি হলেই কেল্লা ফতে বলে মনে করে বিজেপির অনেকে।
এসআইআরে কি গেরুয়া শিবিরের এমন মতলবের ছাপ দেখা যাচ্ছে? তূণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ তেমনই। প্রথম পর্বের চূড়ান্ত ভোটার তালিকাই যেন সিলমোহর দিয়েছে এই অভিযোগে। পাঁচটি জেলায় ইতিমধ্যে প্রায় ২৩ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে এবং ওই জেলাগুলিতেই ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় ঝুলে রয়েছে ৩৫ লক্ষাধিক ভোটারের ভাগ্য। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে ইসিআইয়ের ফুল বেঞ্চ রাজ্যে আসার মুখে এই ইস্যুতে বিতর্ক ক্রমবর্ধমান। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লাগাতার অভিযোগ করে চলেছেন, গোটাটাই বিজেপির ছক। তাদের নির্দেশেই জ্ঞানেশ কুমাররা অঙ্ক মেলানোর খেলায় নেমেছেন। জ্ঞানত গোলমেলে ভোটার তালিকা প্রকাশ অনুচিত। ধর্মের ভিত্তিতে একজনেরও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া অন্যায়। তাই প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও আশু নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। মানুষ তাদের পছন্দমতো ভোট দেবে। তাদের পছন্দের সরকার তৈরি হবে। ইসিআইকে নিশ্চিত করতে হবে এটাই। মনে রাখতে হবে, জ্ঞানেশ কুমাররা টি এন সেশনের মতো লৌহমানবের উত্তরসূরি। ভারতীয় গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেশন যে ঐতিহাসিক অবদান রেখে গিয়েছেন তা যেন কোনোভাবে খাটো না-হয়, বরং সেটাকে সাহসের সঙ্গে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নয়তো ‘বৃহত্তম গণতন্ত্র’ তকমা স্রেফ খাতাকলমেই রয়ে যাবে, ভারত আগামী দিনেও ইলেক্টোরাল অটোক্রেসির নিন্দা ঘোচাতে পারবে না।