Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অনন্য ভূমিকায় নগর পুলিস

অনন্য ভূমিকায় নগর পুলিস
  • ২৪ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মোদি জমানার ‘খ্যাতি’ এবং ‘অখ্যাতি’র নেপথ্যে দুটি জিনিস—‘ডিজিটাল’ লেনদেন এবং ‘ট্যাক্স টেররিজম’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্ন—ভারতকে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’য় রূপান্তরিত করা, ডিজিটাল লেনদেনে ভারতকেই বিশ্বসেরা করে তোলা। কোনও সন্দেহ নেই, গত এক দশকে দেশজুড়ে অনলাইন লেনদেন দ্রুত বেড়ে চলেছে। ছোটখাট জিনিস থেকে স্থাবর সম্পত্তি, গয়নাগাঁটি থেকে শেয়ার প্রভৃতি ক্রয়-বিক্রয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক আমানত, কর জমা ও ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা পর্যন্ত বহুকিছু অনলাইনে করার প্রবণতা বেড়েছে। ইতিমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে নগদ লেনদেন। সব মিলিয়ে, অল্প সময়ের ভিতরে ডিজিটাল লেনদেনে ভারতের যে অগ্রগতি ঘটেছে তা নিঃসন্দেহে  চমকপ্রদ। তবে এই ব্যবস্থা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়, অনলাইন বা ডিজিটাল লেনদেনকে অনুসরণ করেছে জালিয়াত শ্রেণিও। এই প্রতারকরা, অনলাইন লেনদেনকারীদের নিত্যনতুন এবং নানাবিধ ফাঁদে ফেলে সর্বস্বান্ত করে চলেছে। অর্থাৎ ডিজিটাল লেনদেন এখন নতুন এক বিপদেরও নাম। অন্যদিকে, আয় বা রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য মোদি সরকার একাধিক পদক্ষেপ করেছে। চেষ্টা চলছে, একদিকে কর ফাঁকি কমানোর এবং অন্যদিকে কর সংগ্রহের উপায় বৃদ্ধির। এই দু’ভাবে রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আয়কর, ইডি, সিবিআই প্রভৃতি কেন্দ্রীয় এজেন্সিকেও অতিসক্রিয় করে তোলা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, কর আদায় বৃদ্ধির নামে মোদি জমানায় ট্যাক্স টেররিজম চালু হয়েছে। 

Advertisement

অতি সাধারণ ব্যক্তি, যাঁরা আর্থিক দুর্নীতি থেকে হাজার হাত দূর দিয়েই চলাফেরা করেন, এই চক্করে তাঁদেরও কেউ কেউ এজেন্সির নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে শোনা যায়। এছাড়া শিল্পপতি-ব্যবসায়ী থেকে বিরোধী রাজনীতির কারবারি হলে তো কথাই নেই—অনাবশ্যক কারণে এমন বহু ব্যক্তিকে হয়রান করা হচ্ছে। মোটা টাকা জরিমানা ধার্য থেকে জেলযাত্রা—কোনও কিছুই বাদ পড়ছে না তাঁদের জীবনে। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে যে লোক দেখানো ‘স্বচ্ছতার অভিযান’ জারি রয়েছে, তা সাক্ষাৎ এক আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। জালিয়াত শ্রেণি এই মওকার সদ্ব্যবহার করতে মরিয়া। ডিজিটাল লেনদেন প্রতারণায় পাকানো হাত এখন ট্যাক্স টেররিজমে ম্যাজিক দেখাচ্ছে। তাদের নয়া শো’য়ের নাম ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’! ব্যাপারটা এতদিনে দেশবাসীর কাছে খোলসা হয়ে গিয়েছে। এই বিপদ থেকে আত্মরক্ষার নানা উপায় লাগাতার জানাচ্ছে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলি। তবুও ডিজিটাল অ্যারেস্টের ‘ভিকটিম’ হওয়া থামছে না। সব জেনেও কিছু মানুষ দুষ্কৃতীদের ফাঁদে পড়ছেন, এটা সত্যিই পরিতাপের বিষয়। এই কলকাতার বুকেই, সম্প্রতি এক ব্যবসায়ী ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ হয়ে তিনদিন নিজগৃহে স্বেচ্ছাবন্দি ছিলেন! এমনকী নকল ঝামেলা এড়াতে মোট ৭০ লক্ষ টাকা মিটিয়েছেন তিনি। তার মধ্যে ৪০ লক্ষ টাকা তিনি জোগাড় করেন ঋণ করে! বিপুল অঙ্কের ধারদেনা করে প্রতারকদের দাবি মেটানোর নজির কলকাতায় সম্ভবত এই প্রথম। গত এক বছরে সারা দেশে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদে পড়ার পর পুলিসের দ্বারস্থ হন ৯২ হাজারের বেশি মানুষ। এখনও পর্যন্ত তাঁদের খোয়ানো অর্থের পরিমাণ ২,৪০০ কোটি টাকা। গত এক বছরে শুধু কলকাতায় এমন অভিযোগ জমা পড়েছে এক হাজারের বেশি। ৭৫ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ‘ডিজিটাল পুলিস’। 
এরই মধ্যে স্বস্তির খবরও মিলেছে যে—সম্প্রতি বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানা ৩০ জন প্রতারিত ব্যক্তিকে ২ কোটি টাকা ফেরাতে সক্ষম হয়েছে। তবে এ কোনও স্থায়ী সুরাহা নয়। কেননা, প্রতারিত সব ব্যক্তিকে টাকা ফেরানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাই বেশি। প্রতারকদের প্রধান হাতিয়ার হল ভুয়ো আইপি (ইন্টারনেট প্রোটোকল) অ্যাড্রেস। তার ফলে প্রতারকদের সঠিক লোকেশন চিহ্নিত করাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। এবার সেই বাধা অতিক্রম করতে চলেছে কলকাতা পুলিস। সৌজন্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর দু’টি সফটওয়্যার। এর সাহায্যে ভুয়ো আইপি’র ‘আসল উৎস’ খুঁজে পাওয়া কার্যত জলভাত হয়ে যাবে পুলিসের কাছে। ওইসঙ্গে গলার স্বর নকল করে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতা পুলিসের সাইবার বিভাগ ঢেলে সাজা চলছে। এআই নির্ভর নতুন সফটওয়্যার দুটি তারই অঙ্গ। ‘লোকেশন’ নিয়ে কারসাজি ঠেকাতে পুলিসের সফটওয়্যারে বিশেষ ‘প্রোগ্রামিং’ যুক্ত করা হয়েছে। তার সাহায্যে গোয়েন্দারা সহজেই জেনে যাবেন, ভয়েস ক্লোন কোন অ্যাপ কাজে লাগিয়ে এবং কোন আইপি অ্যাড্রেস থেকে ‘আপলোড’ করা হয়েছে। কলকাতা পুলিসের বিশেষ সুখ্যাতি ইংরেজ আমল থেকেই সুবিদিত। ডিজিটাল প্রতারণার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে তাদের বর্তমান অবস্থান তারই সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আশা করা যায়, পুলিসের এই পদক্ষেপ ডিজিটাল লেনদেনে মানুষকে বাড়তি ভরসা জোগাবে, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হবে গোট দেশের সামনে। ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে পূর্ণ সফল ও সার্থক করে তুলতে কলকাতা পুলিসের এই ভূমিকা উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হবে।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ