Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ব্যক্তিপুজো!

গত বছর লোকসভা ভোটের আগে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘অবতার’। মাহাত্ম্য প্রচারে এবার তিনি স্কুল পড়ুয়াদের ‘অনুপ্রেরণা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ!

ব্যক্তিপুজো!
  • ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

গত বছর লোকসভা ভোটের আগে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘অবতার’। মাহাত্ম্য প্রচারে এবার তিনি স্কুল পড়ুয়াদের ‘অনুপ্রেরণা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ! সাত বছর আগে, ২০১৮ সালে এই অনুপ্রেরণার আধারে তৈরি হয়েছিল ৩২ মিনিটের একটি শর্ট ফিচার ফিল্ম ‘চলো জিতে হ্যায়’। সিনেমার নায়ক নাবালক নাড়ু ওরফে নরেন্দ্রনাথ মোদি, যিনি তখন গুজরাতের বড়নগর স্কুলের ছাত্র। ছবিতে দেখানো হয়েছে, এই নাড়ু সেই বয়সেই বিবেকানন্দ, ভগৎ সিং, সুখদেব, রাজগুরুর আদর্শে অনুপ্রাণিত। তাঁদের উপদেশ মেনে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যদের হিতে একের পর এক পরীক্ষায় বসে সফল হচ্ছেন। মোদির ৭৫তম জন্মদিনে স্কুল ছাত্রছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করতে এর চেয়ে ভালো সিনেমা আর কী হতে পারে! অতএব কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত পক্ষকাল ধরে এই ছবির প্রদর্শনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে। ছবি দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছে দেশের ৫০০টি সিনেমা হলেও। খবরে প্রকাশ, ’১৮ সালে ছবিটি প্রথম দেখানো হয়েছিল রাষ্ট্রপতি ভবনে। তারপর পুরনো সংসদ ভবনের অডিটোরিয়ামে। কিন্তু এই ছবির তেমন দর্শক না মেলায় সিনেমার স্বত্ব একটি সংস্থাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তাতেও সাড়া না মেলায় ইউটিউবে ছেড়ে দেওয়া হয়। শোনা যাচ্ছে, ফ্রি-তে ছবিটি দেখার সুযোগ থাকলেও সাত বছরে সেরকম দর্শকও জোটেনি। যদিও ‘নন-ফিচার ফিল্ম’ বিভাগে ’১৮-তেই জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে ছবিটি। বিদেশেও বেশ কয়েকটি ফিল্ম উৎসবেও এই সিনেমাটি দেখানোর জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। বলা বাহুল্য,  সিনেমাটি মানুষ ভুলতে বসেছিল। 

Advertisement

স্কুলে এই সিনেমা দেখানোর যৌক্তিকতা বোঝাতে শিক্ষামন্ত্রকের সাফাই হল, এই ছবি ছাত্রছাত্রীদের চরিত্র গঠনে সহায়ক হবে, তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে, গড়ে তুলবে সহমর্মিতার দৃষ্টিভঙ্গি। এই সিনেমায় আত্মবিশ্লেষণ ও যুক্তিবোধের অনুপ্রেরণা মিলবে। কিন্তু গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, অধুনা দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কী করে স্কুল পড়ুয়াদের অনুপ্রেরণা হতে পারেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, ছবিতে যাঁরা নাবালক নাড়ুকে অনুপ্রাণিত করেছেন বলে বলা হয়েছে, সেই বিবেকানন্দ ছিলেন একজন ত্যাগী বরেণ্য মানুষ, যিনি সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। বাকি অন্য একজন ছিলেন বিপ্লবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী, ব্রিটিশ সরকার যাঁকে ফাঁসি দিয়েছিল। কিন্তু দেশের মানুষ জানেন, ক্ষমতা ও আত্মপ্রচারের মোহে আচ্ছন্ন মোদি একজন ‘ভোগী’ মানুষ, রাজনীতিকে অবলম্বন করে তিনি শীর্ষে থাকতে প্রতিদিন সিঁড়ি ভাঙার অঙ্ক কষে এগন। দ্বিতীয়ত, যিনি নিজেই নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ ‘অনুপ্রেরণা’ বলে তুলে ধরতে চান, তাঁকে ছাত্ররা কেন ‘আদর্শ’ বলে মনে করবে? তৃতীয়ত, যে ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে চাইছেন, সেই তাদেরই দেশের ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে অথবা ভুল ইতিহাস শেখানো হচ্ছে তাঁর জমানায়! একে ‘দ্বিচারিতা’ বলে। চতুর্থত, মোদি-বিজেপি-আরএসএস-এর ঘোষিত দর্শন হল হিন্দুরাষ্ট্র গঠন। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন করে মেরুকরণের রাজনীতিকে হাতিয়ার করেছে গেরুয়াবাহিনী। বিবেকানন্দ বা ভগৎ সিংদের ডিএনএ-তে এসবের কোনও স্থান ছিল না। মোদির দীর্ঘ জীবনের ইতিহাস বলছে, জীবে প্রেম, দেশপ্রেম নয়, তাঁর ভাবাদর্শে শুধুই ‘হিন্দুপ্রেম’ জাগ্রত। অনেকেই মনে করছেন মোদির জয়গান করে বিজ্ঞাপনী প্রচারই এই সিনেমা প্রদর্শনের মূল উদ্দেশ্য। এমন বিজ্ঞাপনী প্রচার অতীতে আর কোনও প্রধানমন্ত্রীর জমানায় হয়েছে কি না সন্দেহ। 
আসলে মোদির ভাবমূর্তি যে প্রায় অস্তমিত, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটেই তা দেখা গিয়েছে। তবু তাঁকে এক ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন ত্রাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে। যাতে সম্পূর্ণ স্পট লাইট তাঁর উপর পড়ে। এই কারণেই দলের অলিখিত বিধিকে উপেক্ষা করে ৭৫-এর মোদিকে ‘বাণপ্রস্থে’ পাঠানোর পরিবর্তে বাড়তি অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। এবারে দেশজুড়ে তাঁর জন্মদিন পালনের চোখ ধাঁধানো আয়োজনে বোঝানো হচ্ছে, মোদি সব কিছুর ঊর্ধ্বে। ঠিক যেমন দিল্লির বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী ফরমান জারি করেছিলেন, রাজধানীর সব পুজো মণ্ডপের মধ্যে অথবা প্রতিমার পায়ের কাছে নরেন্দ্র মোদির ছবি রাখতে হবে। অর্থাৎ যেন মা দুর্গার সঙ্গে তাঁরও পুজো করুক ভক্তরা! মুখ্যমন্ত্রীর এই উদ্যোগ অবশ্য ধাক্কা খেয়েছে। অধিকাংশ পুজো কমিটিই সরকারের এই ভাবনা সঙ্গতকারণেই প্রত্যাখ্যান করেছে। আসলে বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদির এটা বোঝা দরকার অবতার কিংবা অনুপ্রেরণা হয়তো ‘সাজা’ যায়, কিন্তু আসল আর নকলের পার্থক্য থেকেই যায়। বিবেকানন্দ ওরফে নরেনের নাম ব্যবহার করলেও প্রধানমন্ত্রী সেই নরেন্দ্র মোদিতেই থেকে যাবেন। যাঁর শাসনকালে মানুষ আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখে নিরাশ হয়েছে। তাঁর নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে হয়েছে নানা বিতর্ক। যাঁর সরকার দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৈরিকীকরণের প্রয়াস চালাচ্ছে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকেও রাজনীতির আঙিনায় এনে ফেলতে চাইছে! ব্যক্তিপুজো বা প্রচারের আলোয় থাকার এমন লজ্জাজনক চেষ্টার নজির খুঁজে পাওয়াটাই দুষ্কর। ক্ষমতার দম্ভে শাসক বোধহয় ভুলে যাচ্ছে এর উপযুক্ত জবাব মানুষই একদিন দেবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ