হিমাংশু সিংহ: আবার প্রমাণ হল, আমেরিকার অভিধানে ‘বন্ধু’ শব্দটার অর্থ বড্ড গোলমেলে। আসলে সবই স্রেফ বাণিজ্য সহযোগী মাত্র। বিলিয়ন ডলারের অর্ডার দাও সাময়িক হ্যান্ডশেকের তৃপ্তি পাও! আমরা তৃতীয় বিশ্বের নাদানরা ভুল করি, পরে সময় এলেই ভ্রমটা ভাঙে। কিন্তু কিছুতেই আক্কেল হয় না। মোদিজি যতই হাত বাড়ান, সংসদ কামাই করে লোকলস্কর নিয়ে ওয়াশিংটনে দৌড়ে যান, ভবি ভোলবার নয়। নাহলে ভরা যুদ্ধে যুযুধান বিরোধীরা নয়, শেষে ‘বন্ধু’ ট্রাম্পের চালেই মাত হতে হল মোদি সরকারকে!
অপারেশন সিন্দুরে ভারতের জয় যখন নিশ্চিত, রাওয়ালপিন্ডির নুর খান সহ একাধিক পাক বিমানঘাঁটি বিধ্বস্ত, ৯ কুখ্যাত জঙ্গি ডেরা ধ্বংস, পাক এয়ার ডিফেন্স খানখান, রাফাল, এস ৪০০, আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্রহ্মসের মিলিত শক্তিতে পাকিস্তান পরাজয়ের সিঁদুরে মেঘ দেখছে তখন জঙ্গি রাষ্ট্রকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন কে? স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট। চোদ্দো হাজার কিলোমিটার দূরে হোয়াইট হাউসে বসে তাঁর আগাম যুদ্ধবিরতির নিদান মোদিজির বীরগাথাকে এক মুহূর্তে ব্লটিং পেপারে শুষে নিল। এতক্ষণ মুখে আঙুল দিয়ে বসে থাকা ব্যাজার মুখের নিন্দুকদের নীরবতা চকিতে ভেঙে গেল। হাজার কণ্ঠে আওয়াজ উঠল, পিছন থেকে দেশটাকে চালাচ্ছে কে, কোন অদৃশ্য শক্তি? এইখানেই মোদি সরকারকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছেন বিশ্বের স্বঘোষিত ‘দাদা’। উঁচু তারে বাঁধা যুদ্ধের ন্যারেটিভ, বিজেপি’র আইটি সেলের উদ্দাম প্রচার— সবকিছুকেই কোথায় যেন লঘু করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একবার নয় গত সাতদিনে অন্তত পাঁচ থেকে ছ’বার। শেষে অস্বস্তি বাড়িয়েছেন ভারতের বিতর্কিত ‘শূন্য ট্যারিফ’ নিয়ে আগাম মন্তব্য করে। তাও আবার তৃতীয় এক দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে। নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকার পাকিস্তানকে শিক্ষা দেওয়ার উচ্চকিত বীররসের লাগাতার সাহসী বিপণন চালিয়ে গেলেও একাধিকবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, তাঁর সক্রিয় মধ্যস্থতাতেই যুদ্ধ থেমেছে। উত্তেজনা কমেছে। দুই রাষ্ট্র যাতে দ্রুত শুধু আলোচনার টেবিলেই নয়, নৈশভোজে মিলিত হয়, সেই আশাও তিনি জানিয়েছেন বুক ফুলিয়ে। দ্বিপাক্ষিক একটা সমস্যার সমাধানে আমেরিকার প্রো অ্যাক্টিভ ভূমিকা সাধারণ দেশবাসীর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে বাধ্য।
শুধু যুদ্ধের আবর্তেই নয়। দিল্লির সরকারের পরোয়া না করেই বৃহস্পতিবার আবার একপ্রস্থ বোমা ফাটিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ভারত ইতিমধ্যেই মার্কিন পণ্যের উপর শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু গোটাটাই যৌথ ঘোষণার দাবি রাখে। এরকম একতরফা কেউ জানাতে পারে? বিশেষ করে আমাদের মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল যখন আমেরিকায় আলোচনায় ব্যস্ত। তাহলে আলোচনার মানে কী? ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে গত কয়েক মাসের ভারত-মার্কিন শুল্ক যুদ্ধ নতুন খাতে প্রবাহিত হবে। এমনকী খুলে আম অ্যাপল সংস্থার কর্ণধার টিম কুককে ভারতে উৎপাদনের পথে অগ্রসর হতেও নিষেধ করেছেন তিনি। দু’ক্ষেত্রেই ভারত সরকারকে পাত্তা না দিয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আগাম ঘোষণা আমাদের দেশপ্রেম ও শ্লাঘাকে আহত করতে বাধ্য। ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি, সার্বভৌম রাষ্ট্রে দেশের স্বার্থই সবার উপরে। এখানে তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে কোনও আপস চলে না। ট্রাম্পের আগাম যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ও ভারতের শূন্য শুল্ক নিয়ে তৃতীয় দেশে দাঁড়িয়ে ঘোষণা কোথায় যেন আমাদের সেই ‘সবার উপরে দেশ সত্য’ এই সদর্প উচ্চারণ ও অমোঘ বিশ্বাসের মূলেই কুঠারাঘাত করেছে। যুদ্ধের সময় আমরা সবাই রাষ্ট্রের পাশে, এই প্রতিষ্ঠিত সত্যকে মেনে নিয়েও কোথায় যেন হজম করতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে।
এটা ঠিক, পাকিস্তানকে উন্নত বিশ্বে কেউ বিশ্বাস করে না। সম্ভবত আমেরিকাও নয়। ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি আর পাকিস্তানের মাত্র ২৫ কোটি। ব্যবসার নিরিখে তাই ভারতের বাজার অনেক বড় আকর্ষণের কেন্দ্রে। গোটা বিশ্বে ইসলামিক মৌলবাদ এবং সন্ত্রাস আজ দগদগে ঘায়ের মতো। এর কোনও বিনাশ নেই, শুদ্ধিকরণও সম্ভব নয়। যেখানে দেখবে সেখানেই সর্বশক্তি দিয়ে উপড়ে ফেলতে হবে। চীন বাদে বিশ্বের তাবড় শক্তি এটা বিলক্ষণ মানে। মাত্র ৭২ ঘণ্টার উপর্যুপরি প্রত্যাঘাতে যদি সাফল্য এসেই থাকে সেখানে বাগে পেয়েও জঙ্গিদের মদতদাতা দ্বিচারী পড়শিকে সবক শেখানোর সুবর্ণ সুযোগ আমরা হাতছাড়া করলাম কেন? কোনও কোনও প্রাক্তন সেনাকর্তা যখন অপারেশন সিন্দুর ওয়ান ও টুয়ের সাফল্যে উদ্বেল হয়ে উপমহাদেশের মানচিত্র বদলের আনন্দে তালি বাজাতে শুরু করেছেন তখন কেন এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধবিরাম? আমেরিকার ভয়ে না অন্য কোনও বাধ্যবাধকতায়। সেই অসহায়তা কি বাণিজ্য সংক্রান্ত নাকি পরমাণু যুদ্ধের জুজু দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল? কেন মোদিজি বারবার বলছেন, ভবিষ্যতে আর ভারতকে পরমাণু যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিরস্ত্র করা যাবে না। এবার কি সেরকম কোনও আশঙ্কা থেকেই মার্কিন মধ্যস্থতা মানতে বাধ্য হয়েছে ভারত সরকার?
রাজনাথ সিং মাত্র গত বৃহস্পতিবার কাশ্মীরে গিয়ে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের হাতে পরমাণু অস্ত্র মোটেই নিরাপদ নয়। একদম হক কথা। সমীক্ষা বলছে, পরমাণু অস্ত্র সম্ভারের হিসেবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে খুব বেশি ফারাক নেই। দু’দেশের হাতেই ১৭০ থেকে ১৮০টি করে নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডস আছে। যদিও প্রযুক্তির ব্যবহারের নিরিখে ভারত এগিয়ে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনা ও জঙ্গি সংগঠন মিলেমিশে একাকার। ওরাই সবটা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের উপর আন্তর্জাতিক নজরদারি একান্ত প্রয়োজন। উন্নত দুনিয়ার নিরাপত্তার স্বার্থেই এটা জরুরি। আমেরিকা যেন এই সরল সত্যটা না ভোলে যে লাদেনও আত্মগোপন করেছিল পাকিস্তানেই।
যুদ্ধ দামামা আপাতত একটু কমলেও আমাদের বায়ুসেনা আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাদারি দক্ষতার নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের সময় আমরা সবাই এক। আমাদের একটাই পরিচয় আমরা ভারতবাসী। তবে আকস্মিক যদি ‘ঘুস কর মারেঙ্গে’র ৫৬ ইঞ্চি ছাতি বাইরের শক্তির চাপে গুটিয়ে যান সেক্ষেত্রে দেশবাসীর শ্লাঘায় চোট লাগে বইকি! যদি আমেরিকাই কলকাঠি নাড়বে তাহলে অত বড় বড় কথা বলা কেন বাপু? পাকিস্তানের ডিজিএমও শনিবারের বারবেলায় ফোন করলেন আর ২৬ জন নিরীহ পর্যটকের মৃত্যুর পরের ফুঁসে ওঠা ক্রোধ মিটে গেল! ফোনে যে দু’পক্ষ কথা বলছে তাও আমেরিকা আগাম জানাল। আমাদের সরকারি প্রতিনিধি বক্তব্য রাখলেন হোয়াইট হাউসের অব্যবহিত পরে। বুঝিয়ে দিলেন টিকিটা কার কাছে বাঁধা!
যুদ্ধ, গোলাগুলি, লোকক্ষয় কেউ শখ করে চায় না, কিন্তু জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে দান ছেড়ে দেওয়া! নৈব নৈব চ। এ তো সীমান্তে দু’দণ্ড শ্মশানের শান্তি। ১০ মে যা অবস্থা হয়েছিল তাতে আর দু’দিন এরকম চললে নতজানু হয়ে ক্ষমাভিক্ষা করতে বাধ্য হতো ইসলামাবাদ। এখন পাকিস্তান যদি আইএমএফ আর বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণের টাকায় অতিআধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাল্টা আঘাত করে তখন আমেরিকা বাঁচাবে? চীন ইতিমধ্যেই যুদ্ধবিমান ও এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলছে। খুব পিছিয়ে থাকবে না আমেরিকাও।
মানতেই হবে চাপ সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী কিন্তু যুদ্ধবিরতির ফাঁদে পা দেননি। যদিও তা ৫৪ বছর আগের কথা। তখন দোর্দণ্ডপ্রতাপ রিচার্ড নিক্সন হোয়াইট হাউসে ক্ষমতায়। আর সাম্প্রতিক বিশ্বে গত তিন বছর ধরে শক্তিধর রাশিয়ার বিরুদ্ধে কী অসম লড়াইটাই না লড়ছে ইউক্রেন। সেখানেও আমেরিকার চাপ নেই? আলবাত আছে। কিন্তু মাত্র ৪ কোটি জনসংখ্যার দেশটা দাঁতে দাঁত চেপে প্রত্যাঘাতে ব্যস্ত। হোয়াইট হাউসে বসে ঝগড়া করে এসেছেন সেদেশের রাষ্ট্রপ্রধান জেলেনস্কি। রিমোটে কেউ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করার সাহস দেখায়নি। বরং আরও বড় লড়াইয়ের জন্য রেকর্ড ৫৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায়, যা সেই দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ২৬ শতাংশ। আর প্রতিপক্ষ রাশিয়া চলতি বছরে ইউক্রেনের চাপে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দই বাড়িয়েছে ২৮ বিলিয়ন ডলার। এবছর রাশিয়ার ডিফেন্স বাজেট জিডিপি’র ৭.২ শতাংশ, মোট ১২৬ বিলিয়ন ডলার। এই সপ্তাহেই দু’পক্ষের একসঙ্গে মিলে যুদ্ধবিরতি নিয়ে কথা বলার ঠিক ছিল। কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন আলোচনার টেবিলে হাজিরই হননি। ইজরায়েল ও হামাসের যুদ্ধও আমেরিকাকে আমল না দিয়েই চলছে। তাহলে ট্রাম্পের সফট টার্গেট শুধু ভারতই বা কেন? বাণিজ্য আর পরমাণু যুদ্ধের ব্ল্যাকমেলের জাল কেটে বেরতে না পারলে হোয়াইট হাউসের এই খবরদারি চলতেই থাকবে। পরিত্রাণ নেই। মনে রাখতে হবে, নিজের প্রয়োজনেই আমেরিকা ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ তৈরি করে। ফল ভোগ করতে হয় অন্যদের।