এনসিআরবি রিপোর্ট অনুসারে, ২০২২ সালে সারা ভারতে ৪ লক্ষ ৪৫ হাজার ২৫৬টি নারীঘটিত অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। তার অর্থ এটাই যে, দেশে মহিলাদের উপর অপরাধ সংঘটনের হার প্রতি ঘণ্টায় ৫১টি! এই প্রসঙ্গে লক্ষণীয় যে, এই ধরনের অপরাধ পূর্ববর্তী দু’বছরের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। সংখ্যাটি ২০২০ সালে ছিল ৩ লক্ষ ৭১ হাজার ৫০৩ এবং ২০২১ সালে ছিল ৪ লক্ষ ২৮ হাজার ২৭৮। মহিলারা পারিবারিক হিংসার শিকার সবচেয়ে বেশি। নারীঘটিত অপরাধের মধ্যে ৩১ শতাংশের বেশি সংঘটিত হয়েছে পারিবারিক পরিণ্ডলে। এর পরেই রয়েছে অপহরণ (১৯+ শতাংশ) এবং ধর্ষণ (৭+) ও শ্লীলতাহানির (প্রায় ১৯ শতাংশ) মতো ভয়াবহ অপরাধগুলি। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর হিসেবে, নারীনির্যাতনে দিল্লির চিত্রটি ভয়াবহ, জাতীয় গড়ের অনেক উপরে। ভারতে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের হয়রানির হারও ক্রমবর্ধমান। ফলাফল সুখকর হবে না ধরে নিয়ে, কর্মক্ষেত্রে হয়রানির বহু ঘটনা মহিলারা নথিভুক্ত করেন না। তার পরেও ছবিটা লজ্জাজনক।
স্বভাবতই এনিয়ে মোদি সরকার বারবার সমালোচিত হয়েছে। উঠেছে দিল্লিতে নির্ভয়া, গুজরাতে বিলকিস বানো, উত্তরপ্রদেশে হাথরাস, হরিয়ানায়ায় মহিলা কুস্তিগিরদের অপমান, মণিপুরে মহিলাদের উপর পাশবিক আচরণসহ দেশজুড়ে অসংখ্য লজ্জার প্রসঙ্গ। কিন্তু মোদি সরকার নানা ইস্যুতে বিরোধীদের দিকেই পাল্টা অভিযোগের তর্জনী তোলে। তবে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের গাফিলতি, অপদার্থ, ব্যর্থতার দিকটি কখনও স্বীকার করা হয়নি। বরং দৌপদী মুর্মুকে রাষ্ট্রপতি পদে বরণ করে নেওয়ার মতো কিছু আত্মশ্লাঘ্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে মোদি সরকার। তাদের হাসি চওড়া হয়ে যায় মহিলা সংরক্ষণ বিল, লাখপতি দিদি, উজ্জ্বলা গ্যাস, জনধন যোজনা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও প্রভৃতির কথা শোনাতে গিয়ে। বিজেপি/এনডিএ’র প্রতিটি নির্বাচনী ইস্তাহার বা সংকল্পপত্রও এসব গাথায় ভরে থাকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার ছোট বড় সকল সদস্যই দাবি করেন যে, নারী সশক্তিকরণে ইতিপূর্বে কোনও সরকারই এত কাজ করেনি! বিজেপিসহ সমগ্র গেরুয়া শিবিরের রাজনৈতিক প্রচারেও তাদের ‘ঐতিহাসিক ভূকিা’র সাতকাহন হয়ে ওঠে বড় হাতিয়ার। কিন্তু সরকার স্বীকার করে না, বাস্তব ছবিটা কেন এত করুণ? নিজেকে প্রশ্ন করে না, অত্যাচার কার উপর বেশি হয়? দেশবাসীর কাছে আছে সোজা উত্তরটি, দুর্বলের উপর। ভারতে নারী এবং শিশুরাই সবচেয়ে বেশি অপুষ্টির শিকার। শারীরিকভাবে দুর্বল মহিলা আরও দুর্বল শিশুর জন্ম দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। রাজনীতি, সরকার, প্রশাসন প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রে মহিলাদের পিছনে রেখে দেওয়া হয়েছে। ভোটাধিকার প্রয়োগে পুরুষকে ছাপিয়ে যাওয়ার পরও রাজনৈতিক নেতৃত্বে মহিলাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় খুঁজে পাওয়া যায় না। নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রার্থী তালিকাতেও তাঁরা বৈষম্যের শিকার। মন্ত্রিসভা গঠনের সময়ও তাঁদের পুরুষের পিছনে রাখার প্রবণতা দূর হয়নি। কর্মী নিয়োগ থেকে বেতন/মজুরি প্রদান নানা ক্ষেত্রেই ভারতীয় মহিলারা ধারাবাহিক বৈষম্যের শিকার।
সব মিলিয়ে ভারতীয় নারী ঘরে বাইরে নির্যাতিত এবং বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে (৮ মার্চ) প্রসঙ্গগুলি ফিরে ফিরে আসে। তবু এই সরকার যে শোধরাবার পাত্র নয়, তার প্রমাণ কেন্দ্রের বাজেট। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটে নারী ও শিশুকল্যাণের প্রাপ্তি মাত্র ০.৫৩ শতাংশ! সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির রিপোর্টে এনিয়ে তীব্র ক্ষোভও ব্যক্ত হয়েছে। তাদেরও প্রশ্ন, নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের জন্য বাজেট বরাদ্দ এত কম কেন? আগামী অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেটে নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রককে দেওয়া হয়েছে ২৬,৮৮৯ কোটি টাকা। শুক্রবারই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের ‘ডিমান্ডস ফর গ্র্যান্টস’ নিয়ে পর্যালোচনা ও সুপারিশ সংবলিত রিপোর্ট পেশ হয়েছে সংসদে। তাতে বিস্মিত সংসদীয় কমিটির প্রশ্ন, ‘২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতের জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশই নারী ও শিশু। তাদের উন্নয়ন এবং আর্থ-সামাজিক উত্তরণের প্রধান দায়িত্ব নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের উপর ন্যস্ত। সেই মন্ত্রকের জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ কেন এত কম?’ গত অর্থবর্ষে এই বাবদ ২৬,০৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেও সংশোধিত বাজেটে অনেকখানি কমিয়ে দেওয়া হয়। সেই কমানো অর্থেরও পুরোটা খরচ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলিতে পারিশ্রমিক যাচ্ছেতাই রকমের কম বলেই কর্মী অমিল। তাই কাজ হচ্ছে না। সব মিলিয়ে নারীকল্যাণে মোদি সরকারের ‘সদিচ্ছাই’ প্রকট হয়ে পড়েছে। একজন দ্রৌপদী মুর্মু বা একজন রেখা গুপ্তকে দিয়ে ভারতের নারী সশক্তিরণের ছবিটা কোনোভাবেই বোঝানো সম্ভব নয়। সমস্যাটি বিচার করতে হবে দেশে প্রতি ঘণ্টায় নানাভাবে নির্যাতনের শিকার ৫১ জন মহিলার দিক থেকে। তবেই আগামী দিনে সমাধানের দিকে কিছুটা এগনো সম্ভব হবে। তার জন্য শাসকের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে জরুরি।