বুধবার পুণ্য অক্ষয় তৃতীয়ায় দ্বারোদ্ঘাটন হয়ে গেল দীঘায় নির্মিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের জগন্নাথ মন্দিরের। প্রাণপ্রতিষ্ঠাও হল প্রভুর বিগ্রহে। মঙ্গলবার বিশেষ ক্ষণে সেখানে সম্পন্ন হয়েছিল দারুব্রহ্ম মঙ্গলপূজন এবং মহাযজ্ঞ। একই দিনে নতুন মন্দির চূড়ার অষ্টধাতুর শ্রীচক্রে উড়ল ‘পতিতপাবন বানা’ বা পবিত্র ধ্বজা। বস্তুত মঙ্গলবার বিকেলেই প্রভু জগন্নাথের নতুন আলয়ের ঠিকানা নির্দিষ্ট হয়ে গেল—বাংলার দীঘা সমুদ্রতট। মঙ্গলবার পবিত্র ধ্বজা উড়তেই মুখ্যমন্ত্রী দু’হাত তুলে বলে ওঠেন ‘জয় জগন্নাথ’। মমতার স্বপ্নপূরণ সহজ ছিল না। একাধিক অবাঞ্ছিত বাধা একে একে দূর করেই বাংলার অগণিত ভক্তজনকে বহু আকাঙ্ক্ষিত এই উজ্জ্বলতম দিন এনে দেন তিনি। বুধবার সকালে মাহেন্দ্রক্ষণে নিমকাঠের তৈরি জগন্নাথ মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয়। রুদ্ধদ্বার কক্ষে পুরী জগন্নাথ ধামের অন্যতম প্রধান সেবায়েত রাজেশ দয়িতাপতির নেতৃত্বে পুরোহিতরা প্রাণপ্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এই দারুমূর্তিই নিত্যপূজা পাবেন এখানে। এর কিছু পর পাথরের জগন্নাথ মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন ইসকনের সেবায়েতরা। একই সঙ্গে প্রাণপ্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয় পাথরে নির্মিত রাধাকৃষ্ণের মূর্তিতেও। এদিন বিশেষ পূজাপাঠের সঙ্গে দেবতাকে ৫৬ ভোগ নিবেদন করা হয়। নানা পদের সঙ্গে ছিল গজা, পেঁড়া, রসগোল্লার মতো বাংলার বিখ্যাত মিষ্টান্ন। মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন করেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। প্রভু জগন্নাথের উদ্দেশে প্রথম সন্ধ্যারতিও করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রীতিমতো উৎসবের মেজাজেই সম্পন্ন হয় যাবতীয় অনুষ্ঠান।
এই ঐতিহাসিক আনন্দমুহূর্তকে সামনে রেখে সেজে উঠেছে সৈকতশহর দীঘা। যেসব শিল্পী, স্থপতি, শ্রমিকের তিনবছর কালের কঠোর শ্রমে এই উদ্যোগ সফল হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী এদিন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং অভিনন্দন জানান। এদিন মন্দিরে দিনভর বেজেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ও সুরারোপিত ‘জয় জগন্নাথ’ গান। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বাংলার বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাবে দীঘা জগন্নাথ মন্দিরের ছবি এবং প্রসাদ। তাঁর বিশ্বাস, এই অনুপম সৃষ্টি হাজার হাজার বছর স্থায়ী হবে। বাংলায় নতুন ধর্মীয় তরঙ্গ সৃষ্টি হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। চারিদিকে যখন অধর্মের এত আঘাত, সত্যিই বাংলার মানুষ পেল নতুন ধর্মীয় আশ্রয়। ইতিহাস ভুলে যায়নি, রানি রাসমণিও বিনা বাধায় দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। আমরা জানি, সেই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরই অচিরে দেশে ধর্ম আন্দোলন এবং সমাজ সংস্কারে এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে। ‘অব্রাহ্মণ’ কন্যা রাসমণি সেদিন এই উদ্যোগ না নিলে বাংলার ধর্ম আন্দোলনের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লিখিত হতো। আমরা জানি না, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং স্বামী বিবেকানন্দকে এই ভারত অন্য কোনভাবে পেত। তাই, ইতিহাস এক্ষেত্রেও নিশ্চয় নজর রাখবে তাঁদের উপর যাঁরা দীঘায় জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠায় নেতিবাচক ভূমিকা নিলেন। যুগ বদলেছে। অতীতে উৎসব, মেলা, ধর্মস্থান প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যের ধারণা ছিল না। এখন যেখানে যত জনসমাগম সেখানেই তত বাণিজ্যের সুযোগ। কেননা, অর্থনীতির চাকা মানুষের ব্যয় কেন্দ্রিক। একজন মানুষ কিছু খরচ করলে তাতে অন্য এক বা একাধিক মানুষের ততটাই আয় রোজগার হয়। যেমন কলকাতাসহ বাংলার দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে এখন ৫০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। বিপুল বাণিজ্য হয় কুম্ভমেলা, এমনকী বাংলার গঙ্গাসাগর মেলাকে কেন্দ্র করেও। দীঘা এমনিতেই বাংলার অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র। বাংলার পর্যটন শিল্পে নীল সাগরের তীরে দীঘার অবদান অনস্বীকার্য।
এখন থেকে পর্যটকরা দীঘার প্রতি আরও অধিক আকর্ষণ অনুভব করবেন। বাড়তি আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকবে বুধবার উদ্বোধন হওয়া জগন্নাথ মন্দির। দীঘাকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে অর্থনীতির যে শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে তার সঙ্গে পড়শি রাজ্য ওড়িশার পুরীর মিল থাকবে অনেকটাই। ইতিমধ্যেই পুরী এবং দীঘাকে নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই মুখ্যমন্ত্রীর স্লোগান ধার করে নিয়ে বলতে হয়, বাংলার ধর্মীয় আন্দোলন এবং অর্থনীতির বিকাশে নয়া দিগন্ত খুলে দিলেন দীঘার ‘জয় জগন্নাথ’।