Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

যুগান্তকারী সংস্কার

বেঁচে থাকার জন্য মানুষের ন্যূনতম চাহিদা হল—খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান। এই তিনটি উপাদানের কোনোটিকেই অন্যটির চেয়ে ছোটো বা বড়ো ভেবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

যুগান্তকারী সংস্কার
  • ৩ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বেঁচে থাকার জন্য মানুষের ন্যূনতম চাহিদা হল—খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান। এই তিনটি উপাদানের কোনোটিকেই অন্যটির চেয়ে ছোটো বা বড়ো ভেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটির উপযোগিতা একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেকোনও একটির অনুপস্থিতি বা ন্যূনতা অন্যটিকে প্রভাবিত করে। তার দ্বারা একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের ভালো থাকা বা না-থাকার পর্যায় পরিবর্তিত হয়। তাই সুষম ও পর্যাপ্ত খাদ্যের সংস্থানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত বস্ত্র এবং স্বাস্থ্যকর বাসস্থানের ব্যবস্থা প্রতিটি মানুষের জন্য জরুরি। এই তিনটি জোগাড় করতে মানুষকে বস্তুত আজীবন সংগ্রাম করে যেতে হয়। খাদ্য ও বস্ত্র হল জীবনধারণের উপকরণ। কিন্তু বাসস্থান হল ব্যক্তি ও পরিবারের স্থায়ী সম্পদ। এই সম্পদ বারবার কেনা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। ভারতসহ সারা পৃথিবীতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বিরাট। আর কিছু মানুষ গৃহহীন না-হলেও অন্যের ভাড়াটিয়া। অর্থাৎ দেশ-দুনিয়া জুড়ে মানুষ জীবনপাত করার পরেও নিজস্ব জমি-বাড়ির মালিকের শতকরা হার আহামরি নয়। 

Advertisement

তারপরেও রয়ে গিয়েছে প্রতারিত হওয়ার ভয়। জমি/বাড়ি/ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের প্রতারণা চক্র দেশজুড়ে ফাঁদ পেতে আছে। একই সম্পত্তি তারা একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তির নামে কিংবা জাল দলিল/মিউটেশন সার্টিফিকেট দাখিলসহ বেচার ধান্দা করে। এই দুষ্কর্ম রুখতেই রেজিস্ট্রেশন ও মিউটেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং গতি আনা জরুরি। রাজ্যের ক্রেতাদের সুরক্ষা প্রদানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনা মতো নবান্ন ইতিমধ্যেই একাধিক পদক্ষেপ করেছে। যেমন জমি বা বাড়ি কিনলে ভূমিদপ্তরের তথ্যভাণ্ডারে নতুন মালিকের নাম স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে যুক্ত হওয়ার সুবিধা চালু হয়ে গিয়েছে। তারপরেও ঘাটতি রয়ে গিয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। যেমন পুরসভা এলাকায় মিউটেশন বা নামপত্তন করার জন্য ক্রেতাকে এখনও বেশ ঝক্কি পোয়াতে হয়। নতুন কেনা জমি/বাড়ির জন্য সংশ্লিষ্ট পুরসভার তথ্যভাণ্ডারে সেই সম্পত্তি নিজের নামে নথিভুক্ত করাতে হয়। সোজা কথায়, পুর-মিউটেশনের জন্য আলাদাভাবে আবেদন করতে হয় পুরসভার কাছে। হয়রানি এড়াতে অনেকেই কাজটি ফেলে রাখেন। তাই নাগরিকের স্বার্থে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পুর-মিউটেশনের ব্যবস্থা চালু করছে রাজ্য। অর্থাৎ, জমি-বাড়ি কেনার পর রেজিস্ট্রেশনের সময়েই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুর-মিউটেশনও হয়ে যাবে। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলেই পুর নথিতে পুরোনো মালিকের জায়গায় চলে আসবে সম্পত্তির নতুন মালিকের নাম। বর্তমানে রেজিস্ট্রেশনের পর পুর-মিউটেশনের জন্য আবেদনকারীকে দলিলসহ মালিকানা সংক্রান্ত একাধিক নথি পৃথকভাবে জমা দিতে হয়। জমা দিতে হয় পূর্ববর্তী ত্রৈমাসিকের সম্পত্তি করের ‘পেমেন্ট রিসিট’ এবং সচিত্র পরিচয়পত্র। 
এই প্রক্রিয়া এখন অনলাইনেই করা যায়। তারপরও কিছু ঝক্কি থাকে। তাই পৃথকভাবে আবেদন প্রক্রিয়া অনেকে এড়িয়ে যান। সেই কারণে পুরনথিতে পুরোনো মালিকেরই নাম রয়ে যায়। এতে ক্ষতি নাগরিক এবং পুরসভা উভয়েরই। একদিকে প্রতারিত হলেও নতুন ক্রেতা শুরুতে তা ধরতে পারেন না। অন্যদিকে, সম্পত্তি কর সংগ্রহে পুরসভাও বঞ্চিত হতে পারে। সর্বোপরি, ওই সম্পত্তি পরবর্তীকালে হস্তান্তরিত হলে বকেয়া সম্পত্তি কর মেটানোর দায় বর্তায় নতুন ক্রেতার উপর। এখন শুধুমাত্র অনলাইনেই পুর-মিউটেশনের জন্য আবেদন করা যায়। গত দু-বছরে এভাবে পুর-মিউটেশন হয়েছে সাড়ে ৩ লক্ষাধিক। কাজটি আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছে পুরদপ্তর। এই ঘাটতি পূরণে কর্তৃপক্ষের আধুনিক চিন্তাভাবনাই গুরুত্ব পেয়েছে। তারা নিশ্চিত যে, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পুর-মিউটেশনই এই ঘাটতি পূরণের সেরা উপায়। এই সুবিধা চালু হলে সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত সঠিক তথ্য পুরসভাগুলির হাতে থাকবে। এই পরিষেবা দ্রুততার সঙ্গেই চালু করতে চায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। এজন্য একযোগে কাজ করছে পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তর এবং অর্থদপ্তরের অধীন ডিরেক্টরেট অফ রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড স্ট্যাম্প ডিউটি। রাজ্যের প্রতিটি পুরসভায় একত্রে এই ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা চলছে। অন্যান্য পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুরদপ্তর, কলকাতা পুরসভা এবং নিউটাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সঙ্গে আগেই রেজিস্ট্রেশন ডিরেক্টরেটের পোর্টাল সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পুর মিউটেশন প্রদানে নথি যাচাই প্রক্রিয়া সহজেই সম্পন্ন হবে।  পুর-মিউটেশনের অবশিষ্ট ঘাটতি দূরীকরণ অবশ্যই এক যুগান্তকারী সংস্কার হতে চলেছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ