মাঝেমধ্যে মনে হয় এই রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা চালিয়ে যাওয়াটাই কি বঙ্গের ললাট লিখন! কেননা, গত দু’দশক ধরেই কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগে তোলপাড় হচ্ছে রাজ্য। জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন কেন্দ্রের মাশুল সমীকরণ নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল রাজ্যের বাম সরকার। এই নীতির কারণে রাজ্যে বিনিয়োগ আসছে না— এই ছিল মূল অভিযোগ। এর পাশাপাশি বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প ও বরাদ্দে রাজ্যকে বঞ্চিত করার অভিযোগও ছিল। তখন কেন্দ্রে মূলত কংগ্রেসের সরকার। রাজ্যে ছিল তাদের বিরোধী বামফ্রন্ট। রাজ্যে বামেরা থাকার কারণেই কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার প্রাপ্য অর্থ দেয় না বলে এই বাংলায় কেন্দ্র বিরোধী আন্দোলন চলেছে বছরের পর বছর ধরে। এমনকী এই ইস্যুতে বারবার বন্ধ পর্যন্ত হয়েছে। এখন কেন্দ্রে সেই কংগ্রেস সরকার নেই। রাজ্যেও নেই বামেরা। কিন্তু বঞ্চনার যে ইতিহাস শুরু হয়েছিল কংগ্রেসের হাত ধরে, মোদি জমানার এগারো বছরে তা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে! অনেকের মতে, দুই জমানায় কেন্দ্রের বঞ্চনার চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য আছে। আগে বঞ্চনা হলেও কিছু রাখঢাক ছিল। এখন তা হচ্ছে একেবারে খুল্লামখুল্লা। উপরন্তু এই আমলে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজ্য তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রাপ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে যে অভিযোগ তুলে টাকা আটকে রাখছে কেন্দ্র, সেই একই অভিযোগ থাকলেও বিশেষ কিছু রাজ্যের ক্ষেত্রে উপুড়হস্ত কেন্দ্র! কারণ ওইসব রাজ্যে চলছে ডাবল ইঞ্জিন সরকার। বঞ্চনার সঙ্গে বৈষম্যের এক নতুন নজির তৈরি করেছে মোদি সরকার।
চলতি অর্থবর্ষের বাজেট পেশ করে গ্রাম সড়ক যোজনার চতুর্থ পর্যায় চালুর প্রস্তাব সংসদে পেশ করেছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। সেই মতো রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার জনবসতিকে রাস্তা দিয়ে যুক্ত করার জন্য বরাদ্দের দাবি জানিয়েছিল মমতা সরকার। তার উত্তরে সম্প্রতি চিঠি দিয়ে কেন্দ্র যা বলেছে তার মোদ্দা অর্থ হল, এই চতুর্থ পর্যায়ের কাজের জন্য বাংলার মতো বিজেপি-বিরোধী কোনও রাজ্যকেই অর্থ বরাদ্দ করা হবে না। টাকা পাবে মূলত ডাবল ইঞ্জিন শাসিত রাজ্যগুলি এবং এনডিএ সরকারের প্রাণভোমরা শরিক শাসিত রাজ্য। যেমন, অন্ধ্রপ্রদেশ ৪০০ কোটি, অসম ৬০০ কোটি, ছত্তিশগড় ৭৫০ কোটি, ওড়িশা ৫০০ কোটি, রাজস্থান ৮০০ কোটি টাকা পাবে। নিয়ম হল, যে কোনও প্রকল্পে বরাদ্দ চূড়ান্ত করার আগে এক্সকিউটিভ কমিটির বৈঠক করতে হয়। এক্ষেত্রে নাকি সেই বৈঠকের আগেই প্রাপকদের তালিকা ও অর্থের পরিমাণ ঠিক হয়ে গিয়েছে! প্রত্যাশিতভাবেই এই নিয়মবহির্ভূত কাজের কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বৈষম্য ও বঞ্চনা শুধু এইটুকুই নয়। এর আগে গ্রাম সড়ক যোজনার তৃতীয় পর্যায়ে বাংলার ৬ হাজার ২৮৭ কিমি গ্রামীণ রাস্তা সংস্কারের অনুমোদন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিল কেন্দ্র। কিন্তু অনুমোদন মেলে ৩ হাজার ৩৭৯ কিমি রাস্তা সংস্কারের। এই অর্ধেক কাজের জন্য রাজ্যকে ২ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত মিলেছে মাত্র ২২০ কোটি টাকা! রাজনৈতিক অভিসন্ধি এতেই স্পষ্ট। আসলে ব্রাত্য বাংলা।
বস্তুত মোদি জমানায় কেন্দ্রের কাছে বাংলার সরকারের প্রাপ্য হয়েছে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। টাকার এই অঙ্ক কোনও ছোট রাজ্যের সারা বছরের বাজেটের চেয়ে কম নয়। বাংলার পাওনার মধ্যে রয়েছে একশো দিনের কাজের টাকা, গরিব পরিবারের জন্য আবাসন যোজনা এবং গ্রাম সড়ক যোজনার মতো প্রকল্পর টাকা। দুর্দশা ঘোচাতে এই প্রকল্পগুলি রাজ্যের কোষাগারের অর্থ দিয়েই চালু রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই প্রকল্পগুলিতে রাজ্যের প্রাপ্য বরাদ্দ না দেওয়ার কারণ হিসাবে দুর্নীতিকে দায়ী করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ঘটনা হল, বিভিন্ন প্রকল্পে যেসব ক্ষেত্রে এই অভিযোগ উঠেছে, তা শুধরে নিয়েছে রাজ্য সরকার। তাতে সন্তোষ প্রকাশ করলেও বকেয়া কিন্তু মেটাচ্ছে না কেন্দ্র। তাই প্রশ্নও উঠেছে, কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির জন্য কেন গোটা প্রকল্পের কাজ বা রবাদ্দ বন্ধ রাখা হবে? কার্যত এই প্রশ্ন তুলেই একশো দিনের কাজ ১ আগস্ট থেকে চালু করার জন্য কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছে মহামান্য কলকাতা হাইকোর্ট। কোনও কেন্দ্রীয় প্রকল্প অনন্তকালের জন্য ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না বলে জানিয়েছিল আদালত। আসলে কেন্দ্রের এই ভূমিকা হল রাজনৈতিক লড়াইয়ে হেরে গিয়ে বাংলাকে ভাতে মারার কৌশল। ইতিহাস বলছে, ১৯৭২-৭৭- এ কংগ্রেসের সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জমানার পর গত প্রায় ৫০ বছরে কেন্দ্রের প্রায় কোনও শাসক দল এ রাজ্যের মসনদ দখল করতে পারেনি। মোদি জমানার বিরুদ্ধে এই বঞ্চনার অভিযোগের পক্ষে বরাবর মমতা সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলার মানুষ। ২০২৬-এ আরও একটা বিধানসভার ভোট আসন্ন। সেই ভোটেও রাজ্যের মানুষ বঞ্চনার বিরুদ্ধেই মত দেয় কি না তা ভবিষ্যৎ বলবে। ফলাফল যাই হোক, তাতে বঞ্চনা ও বৈষম্যের ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যাবে না।