একগুচ্ছ প্রশ্ন আর একরাশ সংশয় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর শুরু হতে চলেছে। কালীপুজো, দেওয়ালি উৎসব মিটলে চলতি মাসের শেষেই তালিকা সংশোধনের বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য, আগামী বছরের শুরুতেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা। তার দু’ মাসের মধ্যে বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হতে পারে। এসআইআর-এ একজনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাবে না বলে দাবি করে এক বৈঠকে কমিশন জানিয়েছে, এ রাজ্যে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তাদের বৈধতা প্রমাণে কোনও নথি জমা দিতে হবে না। রাজ্যে বর্তমানে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬৪ লক্ষ। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ভোটারের নাম রয়েছে ২০০২-এর ভোটার তালিকায়। এর অর্থ, কমিশন নির্ধারিত ১১টি নথির কোনও একটি দেখিয়ে নিজেকে বৈধ ভোটার হিসেবে প্রমাণ করতে হবে বাকি প্রায় ২ কোটি ৬৪ লক্ষ নাগরিককে। এছাড়া নতুন ভোটার তো রয়েছে। কমিশন সূত্রের আরও দাবি, কোনও ভোটারের কাছে উল্লিখিত নথির কোনওটাই না থাকলে তাঁর ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের থেকে খোঁজ নিয়ে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএলও-দের। এ রাজ্যে ভোটার তালিকায় যে বহু ভুয়ো ও মৃত ভোটার রয়েছে, তা নিয়ে প্রায় কোনও দলেরই সন্দেহ নেই। সুতরাং একটি ত্রুটিমুক্ত স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে এ নিয়েও কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্রশ্ন উঠেছে, নিবিড় সংশোধনের নামে এসআইআর আসলে কিছু বৈধ ভোটার বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা নয় তো? এই আশঙ্কা থেকেই কমিশনের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হুঙ্কার, বিহারে ডাবল ইঞ্জিনের সরকার থাকায় সে রাজ্যে বিজেপির পার্টি অফিসে বসে এসআইআর-এর তালিকা তৈরি করা যায়। বাংলায় তা করতে গেলে জনবিস্ফোরণ হবে, তাই আগুন নিয়ে খেলবেন না।
তবে মুখ্যমন্ত্রী তথা এ রাজ্যের অন্যান্য কোনও কোনও বিরোধী দলেরও উদ্বেগের কারণ হল, বিহারকে ‘মডেল’ করে বাংলায় এসআইআর করতে চাইছে কমিশন। অথচ বিহারে এসআইআর নিয়ে মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। পড়শি রাজ্যে এসআইআর-এর খসড়া তালিকায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যায়, ৪৭ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকায় নেই! এর মধ্যে খসড়া তালিকায় থাকা ৩ লক্ষ ৬৬ হাজারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। যুক্ত হয়েছে ২১ লক্ষ ৫৩ হাজার নাম। বিহারে এসআইআর-এর খসড়া তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, মূলত মহিলা, আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের নাম বাদ পড়েছে তালিকা থেকে। বিহারের এই ভোটারদের অধিকাংশই বিজেপি-বিরোধী দলগুলির ভোটার হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। একইভাবে চূড়ান্ত তালিকায় ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার নাম কেন বাদ পড়ল সেই তথ্য কমিশন প্রকাশ করেনি বলেও অভিযোগ। পাশাপাশি আরও অভিযোগ, যে ২১ লক্ষের বেশি নাম খসড়া তালিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তারও কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি কমিশন। ফলে ধোঁয়াশা কিছুটা রয়েই গিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গেও এই আশঙ্কা দানা বাঁধছে। যেখানে সারা বছর ধরে ভোটার তালিকায় নাম তোলা বা বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে কেন ঠিক নির্বাচনের আগে বিহার বা বাংলায় তড়িঘড়ি এসআইআর করা হচ্ছে—সেই সঙ্গত প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। বিজেপির বক্তব্য, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দিতেই ভোটের আগে এসআইআর করা হচ্ছে। অথচ ঘটনা হল, বিহারে এসআইআর করে কতজন বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা পাওয়া গিয়েছে—তার তালিকা দিতে পারছে না কমিশন। এই প্রেক্ষিতে বাংলায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ মমতার। স্বয়ং দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কারসাজি রয়েছে বলতেও তিনি দ্বিধা করেননি। কেন্দ্রীয়মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর আবার প্রকাশ্যে বলেছেন, এ রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে দেড় কোটি নাম বাদ দেওয়া হবে। রাজ্যের বিজেপির এক নেতা বলেছেন, বাদ পড়বে এক কোটি নাম! তাহলে কি কমিশনকে সামনে রেখে এসআইআর-এর নামে বৈধ ভোটার তাড়ানোর খেলায় নেমেছে বিজেপি? ভোটার প্রমাণের নথি হিসেবে আধার কার্ড নিয়েও জটিলতা অব্যাহত। প্রশ্ন হল, বাংলায় ভোটার তালিকা থেকে কত নাম বাদ পড়বে তা বিজেপির ওই মন্ত্রী বা নেতা জানলেন কীভাবে? রাজনৈতিক মহলের মতে, এ রাজ্যের বিশেষত সংখ্যালঘু ভোটার অধিকাংশই গত দেড় দশক ধরে প্রতিটি ভোটে মমতার দলকে নিরঙ্কুশ সমর্থন জানিয়ে আসছে। ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটেও তার অন্যথা হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে, প্রায় ঘোষিতভাবে সংখ্যালঘুবিরোধী বিজেপি এদেরই ‘টার্গেট’ করেছে। অভিযোগ, তাদেরই নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। সুতরাং নেপথ্যে এই ভোট-রাজনীতির অঙ্কেই এসআইআর শুরুর আগে বিতর্ক সপ্তমে উঠেছে। আগামী কয়েকমাস হাওয়া যে আরও গরম হবে— তাতে সন্দেহ নেই।