Bartaman Logo
১১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দাঁড়ি পড়ল না লাইনে দাঁড়ানোয়

ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে। এসআইআর আতঙ্কের মাঝে আবেদনকারীদের শুনানির প্রয়োজন। বিস্তারিত পড়ুন।

দাঁড়ি পড়ল না লাইনে দাঁড়ানোয়
  • ১১ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিস্তর বিতর্ক, আর মামলা-মকদ্দমার জট কাটিয়ে রাজ্যে এসআইআর হয়েছে। সংশোধিত ভোটার তালিকা ধরেই হয়েছে বিধানসভা ভোট। গঠিত হয়েছে নবনির্বাচিত সরকার। তবে এসআইআর শেষ হলেও কাটল না আতঙ্ক। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর ভোটার লিস্টে নাম তোলার জন্য কমিশনের দপ্তরে বহু আবেদন জমা পড়েছিল। ভোট প্রক্রিয়ার কারণে এতদিন সেসব স্থগিত ছিল। ভোটার তালিকা ফ্রিজ হওয়ার সময় ৬ নম্বর ফর্ম জমে ছিল প্রায় ৬ লক্ষ। তারপর আরো কয়েক লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। তাঁদের বেশিরভাগই এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া। তাই ভোট মিটতেই তালিকায় নতুন নাম তোলার প্রক্রিয়া ইসিআই ফের শুরু করেছে। শুধু বদলে গিয়েছে নিয়মকানুন। কারণ, আগে প্রয়োজনীয় নথিসহ আবেদন করলেই পরবর্তী তালিকায় সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম উঠে যেত। এবার তা হবে না। তালিকায় নাম তোলার জন্য পূরণ করা ৬ নম্বর ফর্ম নিয়ে সামান্য সংশয় থাকলেই সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে শুনানিতে তলব করা হবে। ধেয়ে আসবে অবিকল এসআইআর পর্বের ঝক্কি। এমনকি, এবার থেকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে যোগসূত্র দাখিল করতে হবে। আর সেটা বাধ্যতামূলক। যোগসূত্র দেখাতে হবে ২০০২ সালের এসআইআর তালিকার ভিত্তিতে। সেখানে আবেদনকারীর বাবা-মা কিংবা কোনো ‘গ্রহণযোগ্য’ আত্মীয়েরনাম থাকা চাই। সেই তথ্য কমিশনের মানদণ্ডে ‘যথাযথ’ হওয়া জরুরি। কমিশন  তখন প্রয়োজনে তাঁকে শুনানিতে ডাকবে। অর্থাৎ, ফিরে আসবে লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর যন্ত্রণা-বিষাদের স্মৃতি। ‘যুক্তির অতীত’ যাচাই পর্ব এবং ভোটাধিকার রক্ষার নিমিত্ত উদ্বেগইউঁকি মারছে। রাজ্যবাসীর ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র ক্ষত এখনো দগদগে। 

Advertisement

১৮ বছর উত্তীর্ণ হলেই ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য আবেদন করা যায়। এবার যাঁরা প্রথমবার নাম তোলার জন্য আবেদন করেছেন অথবা করবেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ৬ নম্বর ফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত যাবতীয় নথি যথাযথ কি না, কমিশনের রিটার্নিং অফিসার তা যাচাই করে দেখবেন। এক্ষেত্রে সামান্য সংশয় দেখা দিলেই আবেদনকারীর ডাক পড়বে শুনানিতে। তবে প্রত্যেক আবেদনকারীকে এসআইআরের মতোই একটি গণনা ফর্ম পূরণ করতে হবে। সেটি দেওয়া হবে ৬ নম্বর ফর্মের সঙ্গেই। সেখানেও ২০০২ সালের ‘এসআইআর লিঙ্ক’জানতে চাওয়া হচ্ছে। আগে নতুন নাম তোলার জন্য আবেদনকারীর জন্মতারিখের কোনো একটি প্রমাণপত্র দিলেই তা গ্রাহ্য করা হত। তার সঙ্গে দিতে হত বাবা-মায়ের (বা অভিভাবকের) ভোটার কার্ডের তথ্যাদি। এক্ষেত্রে আরো কড়াকড়ি করা হয়েছে এবার। বদলেছে অন্য একাধিক নিয়মকানুনও। আমরা জানি, এসআইআরে পশ্চিমবঙ্গের কয়েক লক্ষ পুরানো ভোটারের নাম বাদ হয়ে গিয়েছে। অভিযোগ পাওয়া যায়, কয়েক দশক যাবৎ ভোটার লিস্টে নাম ছিল কিংবা ওই সময়কালে টানা ভোট দিয়েছেন, এমন অসংখ্য নারী-পুরুষেরও নাম রয়েছে ওই বাদের তালিকায়। এসআইআর আতঙ্কে গত কয়েক মাসে নানা বয়সি কিছু নারী-পুরুষ আত্মঘাতী পর্যন্ত হয়েছেন। রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলন হয়েছে, বিচার চাওয়া হয়েছে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট অব্দি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে ট্রাইবুনাল গড়েও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের (২০২৬) আগে এর পুরো ফয়সালা করা সম্ভব হয়নি। 
অন্তত ২৭ লক্ষ নাগরিক তাঁদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিতে অ্যাপিলেট ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন। অনেকে ট্রাইবুনালে না গিয়ে নতুন করে ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করেছেন। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়াই তাঁদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। তাঁদের সকলকেই ফের শুনানির যন্ত্রণা পোহাতে হবে। তার জেলাভিত্তিক কাজ ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ ভোটার তালিকায় নতুন করে নাম তোলার ক্ষেত্রে এসআইআর পর্বের মতোই নিজ নিজ যোগ্যতার প্রমাণ দাখিল করতে হবে। নয়া নিয়মে, ৬ নম্বর ফর্মের সঙ্গে পূরণযোগ্য পৃথক ফর্মটি এসআইআর পর্বের গণনা ফর্মেরই অনুরূপ। সব মিলিয়ে দাঁড়ি পড়ল না লাইনে দাঁড়ানোয়। নানা দরকারে লাইনে দাঁড়ানো ভারতের এক অনবদ্য সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে বস্তুত জোয়ার এনেছে মোদি জমানা। নোট বাতিল, আধার দিয়ে যার শুরু, এসআইআরেও তার অন্ত হল না!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ