৭ বছরের বানু মুস্তাকের একবার নয়, বারংবার জন্ম হয়েছে। প্রতিটি জন্মমুহূর্ত তাঁকে আবার এক নতুন জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিটি জন্ম তাঁকে শিখিয়েছে মানুষ পড়ে যায় আরও একবার উঠে দাঁড়ানোর জন্য।
অন্য ভাষা শেখার কী দরকার? কোরান পড়ছে। উর্দু শিখেছে। এখন তো বয়স ৮। আর মাত্র কয়েক বছর। তারপর বিয়ে হয়ে যাবে। সংসার, সন্তান, সেবা। এই তো জীবনের লক্ষ্য! পাড়া, প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের এই ছিল মতামত। কিন্তু কর্ণাটকের হাসান জেলার প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার মজিলম সমাজের এক নিম্নবিত্ত পরিবারের কর্তা সরকারি কর্মচারী পিতার মনে কিছু একটা স্বপ্ন ছিল। এই মেয়েকে তিনি চেনা জীবনের আলো আঁধারির অনিশ্চয়তা থেকে বের করে নিয়ে যাবেন। কীভাবে সম্ভব সেটা? শিক্ষা। অতএব আট বছরের মেয়েকে কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। যেখানে সে শিখবে কন্নড় এবং ইংরাজি। বানু মুস্তাকের সেদিন দ্বিতীয়বার
জন্ম হল।
বানু মুস্তাক কন্নড় শেখার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই নতুন ভাষায় কবিতা লিখেছিলেন। পরিবারের কয়েকজন সেকথা জেনে ভ্রু কুঁচকে নিন্দা করে। তারপর যখন অগুনতি এরকম ভ্রু কুঁচকানো নিন্দার শ্বাস সঙ্গে নিয়ে একদিন বানু স্নাতক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন, তখন তাঁর আত্মীয়রা পিতাকে বলেছিলেন, এই মেয়ের জন্য তোমার নাক কাটা যাবে।
তৈরি থেকো।
২০২৫ সালের মে মাসে বিশ্বখ্যাত বুকার পুরস্কারের নমিনেশন পাওয়ার পর এই তো সেদিন বিখ্যাত ‘ভোগ’ পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে হাসতে হাসতে বানু মুস্তাক বললেন, ‘আজ বাবা বেঁচে নেই। থাকলে তিনি বলতেন আর কত নাক কাটবি আমার?’ কর্নাটক সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। দানা চিন্তামণি পুরস্কার পেয়েছেন। বানু মুস্তাক তাঁর গ্রন্থ ‘হার্ট ল্যাম্প’-এর গল্পগুলি ৩৩ বছর ধরে লিখেছেন। অবশেষে ২০২৫ সালে এসে সেই গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেল। আর তারপর ঘটল একটি মহাজাগতিক ম্যাজিক। ভারত নামক একটি দেশের কর্ণাটক নামক একটি রাজ্যের হাসান নামক একটি জেলার এক প্রান্তিক গ্রামের মাটি জল বাতাস মিশে মিশে যে গল্পগুলি তৈরি হয়েছিল, সেই জাদুকাঠামো পেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বানু মুস্তাক পেয়েছেন বুকার পুরস্কার। ভারতের আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্য চর্চা পেয়েছে মাথা উঁচু করে চলার অঙ্গীকার। তবে সবথেকে বেশি যারা এই পুরস্কারের জন্য কৃতিত্ব দাবি করবে, তারা হল, বানু মুস্তাকের গল্পের মেয়েরা। প্রধানত দলিত এবং মুসলিম সামাজিক ও পারিবারিকভাবে কোণঠাসা মেয়েদের একক লড়াই, গোপন সাহস এবং আগুনের মতো একদিন জ্বলে ওঠার উদ্দীপনা জাগানো সেইসব মেয়ে জিতে গেলেন অবশেষে।
যে আগুনের আঁচ একদিন বুকের মধ্যে রোপণ করেছিলেন বানু মুস্তাক। কীভাবে? ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন বানু। ভেবেছিলেন বিবাহের পর তাঁর গল্পরা অন্য মাত্রা পাবে অভিজ্ঞতার ডানা মেলে। কিন্তু বানু দেখলেন বিবাহ নামক যে মায়াবী দ্বীপে তিনি লেখিকা সত্তার বাসভূমি নির্মাণ করবেন, সেখানে আসলে একটি বন্দিশালা অপেক্ষা করছিল। তাঁকে শ্বশুরবাড়িতে বলা হল, এসব চলবে না। বাইরে বেরবে না। বোরখা পরতে হবে। ঘরের কাজ করবে। লেখালেখির প্রশ্ন নেই। বানু কি জানতেন যে কর্ণাটকের তাঁর এই শ্বশুরবাড়ি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের বাংলায় কোনও এককালে সুবর্ণলতা নামে একটি বধূ ঠিক এভাবেই চেয়েছিল একটুকরো বারান্দা আর ছাদে ওঠার সিঁড়ি? সেই ছিল তাঁর পরম চাওয়া? সেটুকুও সে পায়নি? সুবর্ণলতারা যুগে যুগে মুক্তি চেয়েছে। আশাপূর্ণা দেবীরা তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বানু মুস্তাক নিজেই নিজের মুক্তি খুঁজে নিলেন। ২৯ বছর বয়সে সন্তান হওয়ার পর একদিন তিনি আর বন্দিত্ব সহ্য করতে না পেরে গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে সবেমাত্র দেশলাইয়ের দিকে হাত বাড়াবেন। হঠাৎ তাঁর স্বামী ছুটে এসে তিন মাসের সন্তানকে কেরোসিনস্নাত বানুর পায়ের কাছে রেখে করজোড়ে বললেন, আমাদের ছেড়ে যেও না! বানুর চোখের জল কেরোসিনের তরলে মিশ্রিত হয়ে যেন অন্য আগুন জ্বালল। বানু পাল্টে গেলেন। ভাবলেন, এভাবেই লিখতে হবে নিজেদের গল্পগুলি। তাঁর মতো অন্য মেয়েদের কাহিনি তিনিই লিখবেন। সেদিন বানু মুস্তাকের তৃতীয়
জন্ম হল।
কোনও উজ্জ্বল কাহিনি লেখার চেষ্টাই করেননি বানু। তাঁর গল্পের নারীরা কেউ মহাকাশে যায়নি। কেউ এভারেস্ট জয় করেনি। অনিমা, সালমা, মেহরুনরা একটি করে ব্যক্তিগত যুদ্ধ জয় করেছে। যার মূল্য অপরিসীম। নিম্নবর্গের নারীদের যুদ্ধগুলি কেমন ছিল? ‘কালকেউটে’ গল্পের আমিনা একটির পর একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছে। সে আর পারছে না। তাঁর শরীর ভেঙে আসছে। তার মাথার প্রতিটি শিরা উপশিরা সারাক্ষণ দপদপ করে। আমিনা মুক্তি চায় এই অবিরত সন্তানধারণের যন্ত্রণা থেকে। কিন্তু স্বামী রাজি নয়। অবশেষে একদিন আমিনা একক সিদ্ধান্তে কাউকে না জানিয়ে ব্লক হাসপাতালে চলে যায় টিউবেকটমি অপারেশন করাতে। স্বামী, সমাজ, শ্বশুরবাড়ির পরোয়া না করে। এই জীবন আমার। এই শরীর আমার। এই শরীরের অধিকারও আমার। অতএব আমিনা আর সন্তান না হওয়ার সেই অপারেশন করানোর সাহস সঞ্চয় করতে পারল। এই ছিল তাঁর যুদ্ধ। এই যুদ্ধ সে জিতল।
বানু মুস্তাকের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেওয়া হয়েছে। তিনি যখন লঙ্কেশ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন, সেই সময় বানু মুস্তাককে ছুরি নিয়ে হত্যা করতে এসেছিল এক দুষ্কৃতী। সামাজিকভাবে তাঁকে একঘরেও করা হয়েছে। কিন্তু দমেননি তিনি। পিছিয়ে যাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া, পুরুষতন্ত্রে বন্দি নারীদের সংগ্রামে পাশে দাঁড়াতে হবে। তিনি জানতেন এইসব দলিত ও মুসলিম নারীদের আশা আকাঙ্ক্ষা অধিকার এবং স্বপ্নগুলি দৃশ্যগতভাবে ক্ষুদ্র হতে পারে, কিন্তু তাদের যুদ্ধগুলি ক্ষুদ্র নয়।
বানু মুস্তাক, একটি নিরন্তর সংগ্রাম এবং যুদ্ধজয়ের নাম!



