কৌশিক ঘোষ , কলকাতা: ঈশ্বরী পাটনিকে দেবী অন্নপূর্ণা তাঁর স্বামীর পরিচয় দিয়েছিলেন, ‘বন্দ্যবংশখ্যাত’ বলে। অর্থাৎ, সমাজের ভাষায় কুলীন ব্রাহ্মণ। সেই বন্দ্যোপাধ্যায় তথা ব্যানার্জি কি না তফসিলি উপজাতি! পাবলিক সার্ভিস কমিশনের তত্ত্বাবধানে হওয়া ‘মিসলেনিয়াস’ পরীক্ষায় এই তাজ্জব করে দেওয়া তথ্যই সামনে এসেছে। ২০২৩ সালে সরকারি আধিকারিক নিয়োগে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সফল প্রার্থীদের তালিকা গত ১৬ জুলাই প্রকাশ করেছে পিএসসি। সেখানেই দেখা গিয়েছে এই ‘অনিয়ম’। মোট ১০ হাজার ২২৯ জন প্রাথমিক পরীক্ষা পাশ করেছেন। ৩১ আগস্ট তাঁরা চূড়ান্ত লিখিত পরীক্ষায় বসবেন। কিন্তু সেখানেও গলদ। কীভাবে জেনারেল ক্যাটিগরির প্রার্থী এসসি-এসটির সুবিধা হাতিয়ে পরীক্ষা দিয়ে দিলেন? এই প্রশ্নে চরম ক্ষুব্ধ নবান্ন। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ঝাড়াই-বাছাইয়ের কাজ। বেশ কয়েকজন এমন প্রার্থী চিহ্নিতও হয়েছে। আর ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। সফল প্রার্থীদের তালিকায় ৪৬৫৪ নম্বরে রয়েছে তাঁর নাম। তিনি যে ‘এসসি’ হিসেবে এই ‘সাফল্য অর্জন’ করেছেন, সেটাও লেখা আছে নামের পাশে। বস্তুত এই ঘটনাই টনক নাড়িয়ে দিয়েছে পিএসসি কর্তৃপক্ষের। এরইমধ্যে বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই চাকরিপ্রার্থীকে (রোল নম্বর- ১৮০০৫৭৫) বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। চূড়ান্ত পরীক্ষায় তিনি বসতে পারবেন না। পিএসসি জানিয়েছে, ওই চাকরিপ্রার্থী এসটি শ্রেণিভুক্ত নন, সেটা জানা মাত্র তাঁকে নথিপত্র নিয়ে দেখা করার নোটিস পাঠানো হয়েছিল। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি নিজের শ্রেণি ও যোগ্যতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেননি। এই কারণে সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থিপদ বাতিল করা হয়েছে।
জানা যাচ্ছে, এই প্রার্থী শুধু হিমশৈলের চূড়ামাত্র। প্রাথমিক পরীক্ষায় সফলদের তালিকায় এসটি হিসেবে ‘নথিভুক্ত’ আরও জনা চারেক প্রার্থীকে নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ওই প্রার্থীদেরও নোটিস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাঁদের থেকে সাড়া মেলেনি। পিএসসি কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নথি দেখিয়ে সন্তুষ্ট করতে না পারলে তাঁদেরও বাতিল করা হবে। এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য পিএসসি-র চেয়ারপার্সন মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। যদিও তিনি ফোন ধরেননি। তাঁকে মেসেজ পাঠিয়েও উত্তর মেলেনি। তবে পিএসসি সূত্রে দাবি, প্রিলিমিনারিতে পাশ করলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় এই প্রার্থীরা নিশ্চিতভাবে বসতে পারতেন না। কারণ, তার আগেই নথি যাচাই হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রাথমিক পরীক্ষাতেও তাঁরা বসলেন কীভাবে? তাদের ব্যাখ্যা, মিসলেনিয়াস সার্ভিস বা অন্য কোনও সরকারি চাকরির জন্য অনলাইনে আবেদন করার সময় প্রার্থী নিজেকে যে ক্যাটিগরির বলে উল্লেখ করেন, সেটাই নথিভুক্ত হয়। এর জন্য প্রামাণ্য নথি তখন আপলোড করতে হয় না। নথি যাচাই হয় পরবর্তী পর্যায়ে।
এসটি হিসেবে অনলাইনে আবেদন করার ফলে প্রার্থীদের ‘সাফল্যের হার’ অবশ্যই বেড়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের মিসলেনিয়াস সার্ভিসের প্রাথমিক পরীক্ষায় একজন জেনারেল বা সাধারণ শ্রেণির প্রার্থীর ‘কাট অফ’ নম্বর ছিল ১৪৫ (২০০ মধ্যে)। সেখানে এসটি শ্রেণির কাট অফ নম্বর ১১৭। অনিয়ম সামনে আসায় প্রশাসন যেভাবে কড়া মনোভাব নিয়ে আসরে নেমেছে, তাতে চূড়ান্ত পরীক্ষায় মোট প্রার্থীর সংখ্যা কমতে বাধ্য। কিন্তু একটা বিষয় সত্যি— ‘তফসিলি শ্রেণিভুক্ত কুলীন ব্রাহ্মণ’দের জন্য বেশ কয়েকজন যোগ্য প্রার্থী এবার চাকরির সুযোগ হারালেন।