সংবাদদাতা, দাঁতন: বাংলা-ওড়িশা সীমান্তবর্তী শহর দাঁতনের পাশ দিয়ে সুবর্ণরেখা নদী বয়ে গিয়েছে। বহুকাল ধরে এই নদীর তীরে চৈত্র সংক্রান্তিতে একদিনের ‘বালিমেলা’ বসে। সুবর্ণরেখার পূর্বপাড়ে বেলমুলা, বারাসতী ও সোনাকোনিয়ায় তিনটি নদীঘাটে গরম বালির উপরই এই জমজমাট মেলা বসে যায়। লোকমুখে এটি বালিযাত্রা নামেও পরিচিত। হরেকরকম নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, সব্জি, মিষ্টি, তেলেভাজা, পুজোর উপকরণ এই মেলায় পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে অবশ্যই থাকে নদীতে পুণ্যস্নান। আট থেকে আশি-সবাইকে নিয়ে নদীর পাড়ে সারাদিন ধরে পূর্বপুরুষদের স্মৃতি রোমন্থন ও পিণ্ডদান চলে।
বহুকাল ধরে চৈত্র সংক্রান্তির দিন ওড়িশার প্রথায় এমন ‘বালিমেলা’ উদযাপিত হয়ে আসছে। যে মেলায় মিলেমিশে এক হয়ে যান বাংলা ও ওড়িশার মানুষ। একবেলার জন্য ভাষার বিভেদ মুছে যায়। সূর্যের প্রথম আলো নদীতে পড়া মাত্রই পূর্বপুরুষদের পিণ্ডদানের ধর্মীয় রীতি পালন শুরু হয়। লোকে লোকারণ্য মেলায় বালিতে বসেই ধর্মপ্রাণ মানুষ ছাতু খাওয়া শুরু করেন। তাই স্থানীয় ভাষায় এই প্রথা ‘ছাতু সংক্রান্তি’ নামেও পরিচিত।কলাপাতায় আতপ চাল, দুধ, ছাতু, মধু, তিল, তুলসীপাতা ও পাকা কলা অথবা সেদ্ধ আলু দিয়ে পিণ্ড তৈরি করেন পুরোহিত। পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনে, ধূপের সুগন্ধে, বেদমন্ত্র উচ্চারণে তর্পণের নৈবেদ্য সেজে ওঠে। নৌকোর মতো করে পাতায় মুড়ে নৈবেদ্য নদীতে ভাসানো হয়।
গবেষক সন্তু জানা বলেন, বালিযাত্রা ওড়িশার ইতিহাসের একটি রোমাঞ্চকর স্মৃতি। অতীতে সমুদ্রপথে কলিঙ্গের সঙ্গে জাভা, বালি, সুমাত্রা, সিংহল প্রভৃতি দ্বীপের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। সেকথা এখনও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন ওড়িশাবাসী। বালিদ্বীপের উদ্দেশে বাণিজ্যযাত্রার জন্যই মেলার নাম হয়েছে বালিযাত্রা তথা বালিমেলা। প্রাচীন ওড়িয়া প্রথাটি ধীরে ধীরে সুবর্ণরেখা ছাড়িয়ে বাংলার সীমান্ত এলাকায় লোকায়ত সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে।