বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: ফুটবল জ্বরে কাঁপছে ভারত তথা গোটা বিশ্ব। চারিদিকে এখন ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালের উন্মাদনা। আজ, রবিবার বিশ্বসেরা হওয়ার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। সেই উন্মাদনার পারদ চড়ছে বাংলার অলিগলিতেও। স্বপ্ন বুনছেন ভারতের তরুণ খেলোয়াড়রাও। তাঁদেরই মধ্যে একজন রামপুরহাট পুরসভার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বছর বাইশের তরুণ ফুটবলার বৈদ্যনাথ মুর্মু। তিনি গত মরশুমে কলকাতার ময়দানে মহামেডান স্পোর্টিংয়ের ডিফেন্ডার হিসাবে মাঠ কাঁপিয়েছেন। এই মরশুমে কলকাতা পুলিশ ক্লাবের হয়ে খেলছেন। ছোট্ট ভগ্নপ্রায় ঘরে বসে খেলা দেখতে দেখতে তাঁর আক্ষেপ, ফুটবলের এই মহাযুদ্ধে কবে স্থান পাবে ভারতীয় ফুটবল দল?
বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতের খেলতে না পাওয়ার এই যন্ত্রণা বৈদ্যনাথের ব্যক্তিগত লড়াইয়ের মতোই দীর্ঘ এবং কঠিন। মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহারা হওয়া এই যুবকের ফুটবলার হয়ে ওঠা সহজ ছিল না। মা সুখমণি কিসকু দু’বেলা পেটের ভাত জোগাতে রাজমিস্ত্রির শ্রমিকের কাজ করেছেন। একটু বড়ো হয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াতে বৈদ্যনাথ নিজেও দিনমজুরের কাজ বেছে নেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর রামপুরহাটের এসডিএসএ গ্রাউন্ডে রক্তজল করা প্র্যাকটিস করেছেন। তার ফলস্বরূপ, আজ তিনি কলকাতার বড়ো ক্লাবের খেলোয়াড়। ঘরে বসেই তিনি বলেন, এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে তাঁর পছন্দের দল স্পেন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর অন্ধভক্ত বৈদ্যনাথ তাঁর প্রিয় তারকার দলের বিদায়ের পর স্পেনের ফুটবল দেখেই মন ভরাচ্ছেন। মেসিকে পছন্দ করলেও খেলার ধরনের নিরিখে তিনি চান এবার কাপ উঠুক স্পেনের হাতেই।
সেই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, ভারতে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। সমস্যাটা সুযোগ ও সঠিক প্ল্যাটফর্মের। দিল্লিতে যে ফুটবল অ্যাকাডেমি রয়েছে, সেখানকার জুনিয়ররা ভারতের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৩ বা ১৫ টিমে যখন খেলছে, তখন বাইরের দেশের টিমগুলিকে ৫-৬ গোলে অনায়াসে হারাচ্ছে। আমাদের জুনিয়রস্তরে এত ভাল ভাল প্লেয়ার উঠে আসছে, কিন্তু তারা যখন সিনিয়ার হচ্ছে, তখন আর কোনো অপশন বা প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছে না। ফলে মাঝপথেই হারিয়ে যাচ্ছে দেশের সেরা প্রতিভারা। ক্রিকেটের আকাশছোঁয়া জৌলুস আর ফুটবলের প্রতি সৎ মায়ের আচরণের বৈষম্য আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়।
ভারতের অনূর্ধ্ব-২৩ দলে ঢোকার জন্য বৈদ্যনাথ দিনরাত এক করে নিজেকে নিংড়ে দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে তাঁকে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করতে হচ্ছে চরম আর্থিক অনটনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের মতো প্রান্তিকস্তরের খেলোয়াড়রা কোনো সরকারি বা স্থায়ী সাপোর্ট পায় না। সারা বছরের প্র্যাকটিস, ডায়েট, বুট কেনা বা যাতায়াতের খরচ সব নিজেদের পকেট থেকে করতে হয়। যে ক্লাবের হয়ে খেলি, তারা সামান্য কিছু টাকা দেয়, যা দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। ক্রিকেটের মতো ফুটবল খেলায় যদি সরকার নজর দেয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আধুনিক ফুটবল অ্যাকাডেমি গড়ে তোলে, যদি ভালো ইনভেস্টর এগিয়ে আসে, তাহলে অবশ্যই ভারতের টিমও একদিন না একদিন বিশ্বকাপ খেলবে। বৈদ্যনাথের মতে, এই আক্ষেপ তাঁর একার নয়, এটা ভারতীয় ফুটবলের হাজার হাজার প্রতিভার আক্ষেপ।