Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

২৫০০ বছরের চন্দ্রকেতুগড় আগলে ব্যাকটেরিয়া

রহস্যময় চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক-গবেষকদের বিস্তর অবদান রয়েছে।

২৫০০ বছরের চন্দ্রকেতুগড় আগলে ব্যাকটেরিয়া
  • ২১ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: রহস্যময় চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক-গবেষকদের বিস্তর অবদান রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এক্ষেত্রে ‘রাইজয়েড ব্যাকটেরিয়াম’ নামে এক উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা তার চেয়ে কম কিছু নয়! বরং বলা ভালো, ছত্রাক ধ্বংসকারী এই ব্যাকটেরিয়া শত-সহস্র বছর ধরে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে। কলকাতা থেকে মাত্র ৩৫ কিমি দূরে উত্তর ২৪ পরগনার বেড়াচাঁপায় রয়েছে এই সুপ্রাচীন ধ্বংসাবশেষ। সেখানেই উন্মোচিত হল সভ্যতার আরও এক চমকপ্রদ রহস্য। সৌজন্যে চিকিৎসক ও গবেষকদের পাঁচজনের একটি দল। 

Advertisement

তাঁদের গবেষণালব্ধ তথ্য চমকে ওঠার মতোই। জানা গিয়েছে, ওই উপকারী‌ ব্যাকটেরিয়া ফাঙ্গাস বা ছত্রাক ধ্বংস করে প্রত্ন নিদর্শনগুলিকে বছরের পর বছর টিকিয়ে রেখেছে। বলা ভালো, সেগুলি বিলীন হতে দেয়নি। খনা, বরাহমিহির, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মতো ঐতিহাসিক যোগসূত্রগুলি এখনও টিকে রয়েছে বহাল তবিয়তে। গুপ্ত ও কুষাণ যুগের মুদ্রা, পাল যুগের শিল্প নিদর্শন, টেরাকোটার সিল, জাতকের কাহিনির চিত্র কর্যত অক্ষতই রয়েছে। এমনই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে ওই দলটি।
বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডাঃ শতদল দাসের নেতৃত্বে ওই টিম সম্প্রতি এই গবেষণা করেছে। দলের সদস্য ছিলেন দীপকুকমার বড়া পন্ডার মতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়াম অব ইন্ডিয়ান আর্টের গবেষকও। ছিলেন ডঃ দেবস্মিতা চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ কৃষ্ণেন্দু পয়রা এবং গৌতম দে। চাঞ্চল্যকর এই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘সাউথ এশিয়ান জার্নাল অব রিসার্চ ইন মাইক্রোবায়োলজি’তে। 
ঐতিহাসিকরা বলেন, একদা বিদ্যাধরী নদীর মাধ্যমে গঙ্গার সঙ্গে যোগ ছিল এই ‘বন্দর শহর’-এর। চলতি বছরের মার্চ মাসে চন্দ্রকেতুগড়ের লাল মসজিদের ধ্বংসাবশেষের মাটির নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়ে গবেষকদের এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, চন্দ্রকেতুগড় যতই বিদ্যাধরীর কাছে অবস্থিত হোক না কেন, কিংবা এই প্রাচীন সভ্যতা যতই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অংশ হোক না কেন, এখানকার আর্দ্র মাটিতে কোনও ছত্রাকের অস্তিত্ব নেই। অথচ একথা সকলেই জানেন যে, আর্দ্র ও সিক্ত আবহাওয়ায় ছত্রাক জন্মায়।
শতদলবাবু বলেন, চন্দ্রকেতুগড়ের ধ্বংসাবশেষের মাটি পরীক্ষা করার পর এই গবেষণার প্রতি আমাদের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। এরপর মে মাসে মাটির জিন সিকোয়েন্সিং সহ আরও কিছু পরীক্ষা করে সেখানে ‘রাইজয়েড ব্যাকটেরিয়াম’ নামের এক উপকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়। এই ব্যাকটেরিয়ার কারণেই কোনও ছত্রাক জন্মাতে পারেনি। আসলে ব্যাসিলাস মাইকয়েডিস গোত্রের তালিকাভুক্ত এই ব্যাকটেরিয়া ছত্রাক ধ্বংসকারী বলেই চিহ্নিত। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যদি এই ব্যাকটেরিয়া সেখানকার মাটিতে না থাকত, তাহলে লাল মসজিদ সহ চন্দ্রকেতুগড় সভ্যতার অস্তিত্ব অনেক আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। খননকার্যে সভ্যতার চিহ্নমাত্র মিলত না। কারণ ছত্রাক মাটি ও বিভিন্ন কাঠামো অনবরত ক্ষয় করে।
এর উত্তর পাওয়া গেলেও কেন এবং কীভাবে রহস্যময় চন্দ্রকেতুগড়ের লাল মসজিদের মাটিতে এই উপকারী ব্যাকটেরিয়া এল, তা এখনও অজানাই থেকে গিয়েছে। বিজ্ঞানী-গবেষকদের বক্তব্য, ঐতিহাসিক এই মাটি নিয়ে আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা জরুরি। কে জানে, হয়তো আরও কিছু আশ্চর্য রোগধ্বংসকারী উপকারী জীবাণুর খোঁজ পাওয়া যাবে এখানেই। - ফাইল চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ