Bartaman Logo
১৪ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

অ্যাজটেকার মায়া

১৯৭০ সালে অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জয় করে। ফুটবলের ইতিহাসে এটি একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। বিস্তারিত পড়ুন।

অ্যাজটেকার মায়া
  • ১৪ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সোমনাথ বসু

Advertisement

• মারাকানাজো...
১৬ জুলাই, ১৯৫০। বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। চ্যাম্পিয়ন হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা হলুদ জার্সিধারীদের কাছে। ড্র করলেই খেতাব জিজিনহোদের। মারাকানায় সেদিন হাজির প্রায় দু’লক্ষ ফুটবলপ্রেমী। ফিফাও তাদের আগাম অভিনন্দন বার্তায় লেখে, ‘প্রথমবার বিশ্বসেরা হওয়ার জন্য ব্রাজিলকে অফুরান অভিনন্দন।’ মিডিয়াও হেঁটেছিল একই পথে। 
ফুটবল দেবতা কিন্তু অন্য কিছু ভেবেছিলেন। ঘিগিয়ার গোলে ১-২ ব্যবধানে হার মানে ব্রাজিল। স্তব্ধ মারাকানা। আর সাও পাওলোর এক বস্তির ঘরে রেডিওয় সেই ম্যাচের রিলে শুনছিলেন ডনডিনহো ও তাঁর ন’বছরের ছেলে এডসন অ্যারান্টেস ডো নাসিমেন্টো। দেশের অপ্রত্যাশিত হারে অঝোরে কাঁদছিলেন ডনডিনহো। এই দৃশ্য নির্বাক করে দেয় ছেলেকে। বাবার হাত ধরে ছোট্ট ছেলেটি প্রতিজ্ঞা করে, সে ফুটবলই খেলবে এবং শুধু তাই নয়... দেশকে এনে দেবে বিশ্বকাপও। 
কথা রেখেছিলেন এডসন অ্যারান্টেস ডো নাসিমেন্টো। থুড়ি, পেলে। মারাকানাজোর ঠিক ৮ বছর বাদে প্রথম বিশ্বজয়ের স্বাদ পায় ব্রাজিল। সৌজন্যে ১৭ বছরের এক দামাল ছেলে। সোলনার রাসুন্ডা স্টেডিয়ামে আয়োজক সুইডেনকে ৫-২ গোলে হারানোর পর বাবাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেন পেলে। দুটো শব্দই তখন তাঁর সঙ্গী, ‘আমি পেরেছি’। সেই শুরু পেলে যুগের। কিন্তু ১৯৬২ ও ১৯৬৬ বিশ্বকাপ এক্কেবারেই ভালো যায়নি ফুটবল সম্রাটের। চিলিতে আয়োজিত ৬২ বিশ্বকাপে মাত্র দু’টি ম্যাচ খেলতে পেরেছিলেন পেলে। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে গোলও পান তিনি। কিন্তু চেকোস্লোভাকিয়া ম্যাচের শুরুতেই থাই মাসলে গুরুতর চোট পাওয়ায় টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে যেতে হয় পেলেকে। তা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে অসুবিধা হয়নি হলুদ জার্সিধারীদের। গ্যারিঞ্চা-ভাভাদের ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড, চিলি, চেকোস্লোভাকিয়া। 
এবার ১৯৬৬ বিশ্বকাপ। আয়োজক ইংল্যান্ড। ততদিনে স্যান্টোসের নক্ষত্র হয়ে উঠেছেন পেলে। ইউরোপের একাধিক ক্লাব তাঁকে পেতে টাকার ঝুলি নিয়ে দৌড়েছে। কিন্তু পেলে তাঁর প্রাণের ক্লাব ছাড়বেন না কিছুতেই। তাই আঙুর ফল টক। ইউরোপের দেশগুলি ঠিক করল, বিশ্বকাপে পেলেকে আটকাতে ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ ট্যাকলই সেরা ওষুধ। তাতে ব্রাজিলও খেতাব জিতবে না এবং পেলের কেরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রথম ম্যাচে বুলগেরিয়ার ফুটবলাররা তাঁর হাঁটুতে কমপক্ষে আটবার লাথি মারেন। তা সত্ত্বেও ফ্রি-কিক থেকে অনবদ্য গোল করেছিলেন পেলে। তবে চোটের জন্য খেলা হয়নি দ্বিতীয় ম্যাচ (হাঙ্গেরি)। এরপর পর্তুগালের বিরুদ্ধে মাঠে নামেন ব্রাজিলের নম্বর টেন। কিন্তু পর্তুগিজ ডিফেন্ডাররা সেদিন জলদস্যুর ভূমিকায়। সজোরে লাথি আছড়ে পড়ল পেলের হাঁটুতে। স্ট্রেচারবাহিত হয়ে মাঠ ছাড়ার সময় তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, ‘এই অপমানের জবাব দেওয়ার জন্য ফিরে আমায় আসতেই হবে।’
ফিরে এসেছিলেন পেলে। রাজা নয়, সম্রাটের মতোই। মেক্সিকোয় ১৯৭০ বিশ্বকাপ। দুরন্ত দল সেবার ব্রাজিলের। কে নেই? কার্লোস আলবার্তো তোরেস, জর্জিনহো, টোস্টাও, রিভেলিনো এবং একমেবদ্বিতীয়ম পেলে। ঝড়ের গতিতে সব বাধা উড়িয়ে ফাইনালে ব্রাজিল। অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে আয়োজিত ফাইনালে প্রতিপক্ষ ইতালি। দর্শকাসনে এক লক্ষেরও বেশি অনুরাগী। ৪-১ ব্যবধানে জিতল ব্রাজিল। দলের চতুর্থ গোলটি অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো তোরেসের। এই মুভটিতে ব্রাজিলের ৯ জন ফুটবলার ছিলেন। ইতালির কেউই বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি। পেলের ‘ব্লাইন্ড পাস’ খুঁজে নিয়েছিল ডানদিক থেকে ওভারল্যাপে আসা কার্লোস আলবার্তোকে। অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ হাতে ধরার পর ফুটবল সম্রাট এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘২১ জুন, ১৯৭০ আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন। শুধুমাত্র বিশ্বসেরা হতে পেরেছি বলে নয়। সেমি-ফাইনালে উরুগুয়েকে হারিয়ে মারাকানাজোর বদলা নেওয়া যে অঘটন নয়, তা এদিন প্রমাণ করতে পারলাম। বাবার চোখের জলই আমায় ফুটবলার তৈরি করেছে। এতটা পথ এসে মনে হচ্ছে, মারাকানার অভিশাপ মুছল অ্যাজটেকাতেই। এই স্টেডিয়ামকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মনে রাখব।’
স্টেডিয়াম একই। শুধু বদলেছে সময়। আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় রঙিন মেক্সিকো সিটির এই মঞ্চ। দিনটা ২৯ জুন, ১৯৮৬। বিশ্বকাপ ফাইনালে লড়াকু পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্তিনা। আর নায়ক কোঁকড়ানো চুলের ছোটোখাটো এক যুবক। নাম ডিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। তিনিই প্রতিযোগিতার সেরা ফুটবলার। ঝুলিতে পাঁচটি গোল এবং একাধিক অ্যাসিস্ট। যার সেরাটা ফাইনালেই। জার্মানির ফুটবলারদের বোকা বানিয়ে তাঁর ‘জেম অব আ থ্রু’ খুঁজে নেয় বুরুচাগাকে। 
মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত বারবার ঝাঁকিয়ে মারাদোনার উচ্ছ্বাস প্রকাশ শুধুই বিশ্বজয়ের ছিল না। অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম দু’হাত ভরে তাঁকে জবাব দেওয়ার মঞ্চও তৈরি করে দিয়েছিল। কাকে জানেন? সিজার লুই মেনোত্তিকে। কারণ, ১৯৭৮ সালে দেশের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ডিয়েগোকে বাদ দিয়েছিলেন তিনি। ফুটবল পাগল মারাদোনা তা ভালো চোখে দেখেননি। তীব্র সমালোচনায় ভরিয়ে দেন কোচকে। মেনোত্তির ব্যাখ্যা ছিল, ‘এই প্রতিভাকে এত তাড়াতাড়ি বিশ্বকাপে খেলানো উচিত নয়। সেক্ষেত্রে বিপক্ষের ট্যাকলে ওর কেরিয়ার সংক্ষিপ্ত হয়ে যাবে।’ কিন্তু ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ/স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি’। তাই মারাদোনা গর্জে উঠে বলেছিলেন, ‘মেনোত্তি আমার ভালো চান না। তবে এই বঞ্চনার জবাব আমি দেব।’
এই ঘটনার আট বছর পর মেক্সিকো বিশ্বকাপ। মারাদোনার বাঁ পায়ের জাদুতে দ্বিতীয় খেতাবের জাল বুনছে গোটা আর্জেন্তিনা। কোচ কার্লোস বিলার্ডো ঠান্ডা মাথায় সামলাচ্ছেন তাঁকে। কারণ তিনি জানেন, দশ নম্বর খেললে লা আলবিসেলেস্তদের আটকানো শুধু কঠিন নয়, না মুমকিন। গ্রুপ পর্বের বাধা টপকে নক-আউটে পৌঁছাল আর্জেন্তিনা। প্রতিপক্ষ যথাক্রমে উরুগুয়ে, ইংল্যান্ড ও বেলজিয়াম। শেষ দু’টি ম্যাচে মারাদোনা ম্যাজিক। অ্যাজটেকায় পিটার শিলটনকে হার মানিয়ে ‘হ্যান্ড অব গড’ তো ইতিহাসের পাতায় অমর। তাছাড়া ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আরও একটি এবং বেলজিয়াম ম্যাচে দু’টি লক্ষ্যভেদ ছিল ডিয়েগোর। প্রায় একার কাঁধেই তিনি দলকে তুলেছিলেন ফাইনালে। 
শেষ ম্যাচে সামনে পশ্চিম জার্মানি। ২৯ জুন, ১৯৮৬। বার্লিন প্রাচীন তখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। সামনে বাধা একজনই। বায়ার্ন মিউনিখের ডিফেন্সিভ মিডিও লোথার ম্যাথিউজ। শুরু থেকে তাঁর কড়া নজরে মারাদোনা। হোসে লুই ব্রাউন এবং জর্জ ভালদানোর গোল লিড দিলেও লড়াকু পশ্চিম জার্মানি ঘুরে দাঁড়ায় কার্ল হাইঞ্জ রুমেনিগে ও রুডি ফোলারের লক্ষ্যভেদে। অ্যাজটেকা তখন উৎকণ্ঠায়। দু’দলের সমর্থকরাই উদ্বেগে। ঠিক তখনই ফুটবল দেবতা ভর করলেন ডিয়েগোর উপর। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে চকিতে তাঁর থ্রু পেলেন অরক্ষিত বুরুচাগা। ডান পায়ের কোনাকুনি প্লেসিংয়ে আগুয়ান গোলরক্ষক হ্যারল্ড টনি শ্যুমাখারকে হার মানালেন তিনি। এই মুহূর্তই হয়ে উঠল মারাদোনার অহংকার। শোনা যায়, দেশে ফিরে বোকা জুনিয়র্স তাঁবুতে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কারণ, এল ফ্লাকো (মেনোত্তির ডাক নাম) তখন এই ক্লাবেরই কোচ। কিন্তু ঘনিষ্ঠদের অনুরোধে সেই ইচ্ছে শিকেয় তুলে রাখেন মারাদোনা। তবে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মেনোত্তিকে বিঁধে তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘ওই লোকটা চুপ করতে জানেন না। এখনও আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে ওর ইগোয় লাগছে। বুয়েনস আইরেসের এঁদো গলিতে খেলেছি। ফুটবলার হওয়ার জন্য নয়, খিদে ভুলে থাকার জন্য। খেলার প্রতি আমার প্যাশন উনি জানতেন। তা সত্ত্বেও ৭৮’এর দলে রাখেননি। মেনোত্তিকে জবাব দেওয়ার জন্য অনেকের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ। ভুলব না অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের কথা। ৮২ মিনিটে রুডি ফোলারের গোলের পর অনেক আর্জেন্তাইন হতাশ হয়েছিলেন। কিন্তু আমি হইনি। মাঠের ঘাসগুলো যেন কানে কানে বলেছিল, জিতবে আমার দলই। তাই থ্যাঙ্কু অ্যাজটেকা।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ