চারিদিকে থৈ থৈ করছে লোক। লোকে লোকারণ্য। ঠাকুর আসছেন শুনে যেন রবাহুত মানুষের ঢল নেমেছে। ভেঙ্গে গেছে সম্প্রদায়গত গোঁড়ামির সব দেওয়াল। ঠাকুর সত্যানন্দের অমোঘ আকর্ষণে সবাই হয়েছে একমুখী। সব দেবদেবী, সব ভাবরূপ, সব অবতার, সব মতপথ যাঁর মাঝে পূর্ণরূপে হয়েছে মূর্ত্ত, তিনিই যে সর্বযুগের বরিষ্ঠ অবতার স্বয়ং ভগবান সত্যানন্দ। সে কথা কাঁটাশোলা আর তার সংলগ্ন গ্রামগুলির মানুষ প্রমাণ করে দিল তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আচরণে। কে করেছে ওদের নেমন্তন্ন? কেউ করেনি। অথচ পিলপিল করে আসছে মানুষ বিভিন্ন দিক থেকে। কেউ এনেছে দুধ, কেউ এনেছে চাল, ডাল, তরিতরকারি, আটা। যে যা পেরেছে নিয়ে এসেছে হৃদয় উজাড় করে নিবেদনের উদ্দেশ্যে। এ যেন সেই বামনের পৈতেতে নারদের নেমন্তন্ন। চলতে থাকে দীয়তাং ভুজ্যতাং বিভেদহীন ঐক্যের অঙ্গনে।
খিচুড়ি শেষ হয়ে আসছে আবার চাপানো হচ্ছে, লুচি শেষ হয়ে আসছে আবার ঠাসা হচ্ছে আটা। একটা নাদে তৈরী হয়েছে পায়েস। পায়েস এবার ঠেকেছে তলানির কাছে। কি হবে? অমনি শ্রীঠাকুর এসে উপস্থিত। বললেন—‘কই দেখি, দুটো বালতি আনো পরিবেশনের।’ বলে হাতায় করে নাদের পায়েসটুকু নেড়ে দু’বালতি ভ’রে দিলেন হাতায় তুলে তুলে। চললো পরিবেশন। যারা প্রসাদ খাচ্ছিল, তারা পায়েসে অনুভব করলো এক স্বর্গীয় স্বাদ। এমন সুগন্ধিত অপূর্ব স্বাদের পায়েস তারা আগে কখনও খায় নি। আরো দাও আরো দাও, বলতে লাগলো তারা। লুচি আর পায়েস বেশী করে খেতে লাগলো সকলে। পঙ্গতের পর পঙ্গত চললো এই ভাবে লুচি পায়েসের অফুরন্ত বিতরণ। সবার খাওয়া শেষ হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। তখনও নাদের মধ্যে রয়ে গেছে সেই তলানি পায়েসটুকু। এ কোন্ জাদুর বলে সম্ভব হ’ল! কোথা থেকে একশ’ দেড়শ’ লোকের আয়োজনে দেড় দুই হাজার লোক খেয়ে গেল? এসব ভাববার বা এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার মত বুদ্ধি কারও কি তখন ছিল? সবাই যে তখন অন্য এক ভাবরাজ্যে মত্ত অলির মত মধুপানে টলছে। ওদের অবস্থাই যে সব হিসাবের বাইরে।
কাছেই শালবন। শ্রীঠাকুর গেলেন শালবনে। সেখানে বসেই হয়ে গেলেন পরিপূর্ণরূপে সমাধিস্থ। শ্বেতপাথরের মূর্তির মতই স্থির সমাহিত দেহ। আধঘণ্টা ধরে ঐ প্রস্তরবৎ নিঃশ্বাস প্রশ্বাসহীন সমাধির অবস্থা অটুট ছিল। ভক্তরা ভয় পেয়ে সুরু করলেন মৃদু কণ্ঠে নামসংকীর্তন। রামকৃষ্ণ নামের মধুর ধ্বনিতে ভরে উঠলো প্রান্তর। ধীরে ধীরে নেমে এলো ঠাকুরের মন। সমাধিভঙ্গ হতেই চোখে পড়লো ঠাকুরের পায়ের বুড়ো আঙুলে এক ঝাঁক পিঁপড়ে লেগে রয়েছে। তাড়াতাড়ি সেগুলোকে ছাড়ানো হ’ল। ঠাকুরের কোনও দেহবোধই ছিল না। সবাই আশ্চর্য্য হয়ে দেখলেন শুধু আর ভূমিষ্ঠ হয়ে নিবেদন করলেন প্রণতি।
স্বামী মৃগানন্দের ‘অলৌকিক কৃপাময় সত্যানন্দ’ থেকে