পদ্ম পদ্মালয়ে শুভে
  • ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সবে উমা ফিরেছেন কৈলাসে। এর মাঝে শুক্লপক্ষেই তাঁর কন্যা, মা লক্ষ্মীর আগমন। শুভ্রবরণ চাঁদপানা মুখের লক্ষ্মী মেয়েটি শান্ত ও স্নিগ্ধরূপে আমাদের স্বস্তি দেয়। মায়ের মতন সংবৎসরের অন্নের আয়োজন করে। লিখছেন অনিন্দিতা মণ্ডল।

Advertisement

আশ্বিনের শেষ কার্তিকের শুরু। এবার বর্ষা বড়ো দেরিতে বিদায় নিল। এই সময় হিমেল হাওয়া বয়ে যায় পাকা ধানের মাঠে। হেমন্তের কুয়াশায় সেই হলদে সবুজ ঢেউ দেখতে দেখতে চিরকালের বাঙালি কৃষক আলে বসে উদাস হয়। ফসল ঘরে তোলা হবে। 
সবে উমা ফিরেছেন কৈলাসে। তাঁর পতি মহেশ্বর এবং পুত্র-কন্যাদের নিয়ে। এর মাঝে শুক্লপক্ষেই তাঁর কন্যা, মা লক্ষ্মীর আগমন। দ্বিরাগমনই বলা চলে। মাত্র চার-পাঁচ দিনে তিনি তো কৈলাসে পৌঁছাতেই পারেননি! মাঝ থেকে আবার আসা কেন? আসলে আমরা যে তাঁকে যেতে দিতেই চাই না! শুভ্রবরণ চাঁদপানা মুখের লক্ষ্মী মেয়েটি যে শান্ত ও স্নিগ্ধরূপে আমাদের স্বস্তি দেয়! মায়ের মতো সংবৎসরের অন্নের আয়োজন করে! কবে ভারতচন্দ্র লিখেছেন, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে! বাঙালির আজন্ম কামনা এতটুকুই তো ছিল! সন্তানের জন্য রাজ্যপাট সোনার থালা কিছুই সে চায়নি। শান্ত স্নিগ্ধ একটি জীবন সে কামনা করেছে দেবীর কাছে। অন্নদা এই দেবীই আমাদের কাছে লক্ষ্মী। অন্নপূর্ণা একদিনের জন্য অন্নের পর্বত গড়েন, কিন্তু লক্ষ্মী সারাটি বছর ধরে সন্তানের পাতে দুধ-ভাতের জোগাড় করেন, অন্তত এইটিই আমাদের বিশ্বাস।  
বঙ্গে লক্ষ্মীর আরাধনা প্রাচীন। প্রকৃতির আরাধনা, যা লোকায়ত ধর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সেই ধারা অনুসারেই হেমন্তের ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিকে পুজো করার যে রীতি তা প্রাচীন। মানুষ অন্নের জন্য কৃতজ্ঞ, সেই কৃতজ্ঞতা সে জানায় কাকে? প্রকৃতিকে। বৈদিক রীতিতে পুরুষ বা পিতৃ আরাধনা ও যজ্ঞবিধি আছে। উমার সঙ্গে আমাদের মহাদেবকেও পুজো করতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের বন্ধন মেনেই যজ্ঞ হোম ইত্যাদি হয়ে থাকে। সে পুজোতে পুরোহিত থাকেন। অনেক আচার বিচার রীতি নীতি। কিন্তু লক্ষ্মীর আরাধনায় পূর্বদেশের নিয়ম অন্যরকম। এখানে মা লক্ষ্মীকে আবাহন করা ও আরাধনা করার অধিকার মেয়েদেরও আছে। তারাই যে জন্মদাত্রী! ধরিত্রীর প্রতীক। লক্ষ্মী তাদের আপনার জন। সুখদুঃখের সঙ্গী। 
চিরকাল বাংলার গ্রামে গ্রামে যে দু’টি ফসলের প্রাচুর্য ছিল তা হল আখ ও ধান। কিছু তিলও চাষ হত। আখ থেকে রস গুড়, ধান থেকে চাল বাঙালির প্রধান খাদ্য ছিল। তিল থেকে তৈল। এই যে কার্তিকের সাঁঝে এক শ্রীমণ্ডিত দেবীর অপেক্ষায় আমাদের জেগে থাকা, চালের পিটুলি দিয়ে তাঁর ছোটো ছোটো পা এঁকে আদর করে ডাকা, ধানের গোলার চারপাশে পিটুলির ফোঁটা ও প্রদীপ, এ সবই আমাদের অন্নদা লক্ষ্মীকে কাছে ডেকে ও ভালোবেসে। মা লক্ষ্মীর একটি বাহন আছে। যে বাহন তাঁর সঙ্গে সবসময় থাকে। একটি প্যাঁচা। সাদা ধবধবে প্যাঁচা। লক্ষ্মী প্যাঁচা। প্যাঁচা থাকলে ইঁদুর থাকবে না। গোলার ধান গোলাতেই থাকবে। তাই সে মা লক্ষ্মীর বাহন। ফসল রক্ষা করে। এই ঐতিহ্য একেবারেই বঙ্গীয়। তাই আমরা আমাদের ঘরের মেয়েটির নাম রাখি লক্ষ্মী। রূপে গুণে সেও যেন লক্ষ্মী হয়। তার চলায় ফেরায় ঘরে যেন শ্রী আসে। সে আমাদের আপনজন। বাঙালির স্বভাবই তো তাই। দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা। 
শুধু কি এই? কোজাগরীর রাতে লক্ষ্মী যখন জিজ্ঞেস করেন, কে জেগে আছ? তখন ধনী নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই সেই ডাকে সাড়া দেয়। ‘জেগে আছি’। তোমার জন্য জেগে থাকি জীবনভর। লক্ষ্মী সন্তুষ্ট হন। অতি দরিদ্রর ঘরেও তাঁর চরণ পড়ে। ধনী তার সম্পদের প্রাচুর্যে আনন্দ পায়। দরিদ্র তার অন্তরে মায়ের স্নেহের পরশ পায়। জেগে থাকলেই যে তাঁর কৃপা পাওয়া যায়! সে কি ওই একটি দিন? তা নয়। অন্তরে যে রোজ জেগে থাকে লক্ষ্মী সেখানে অচলা। 
দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস বলেছিলেন, সব কথার মর্মার্থ আছে। বহিরঙ্গের একটি অন্তরঙ্গ আছে। বহিরঙ্গ যদি বাইরের অনিত্য সম্পদের পূজা হয় তবে অন্তরঙ্গটি কী? মানবচেতনায় দেবাসুরের চিরন্তন যুদ্ধ চলে, সবার জানা। চেতনার গভীরে শুভ ও অশুভর, নিত্য ও অনিত্যর যুদ্ধ চলতেই থাকে। শুভ বা নিত্য হল দেব, অশুভ বা অনিত্য হল অসুর। যা নিতান্ত জাগতিক সেই অনিত্যকে কামনা করে পুজো করা যেন হীরের মালিকের কাছে কানাকড়ি ভিক্ষে করা। তাই অনিত্যকে হারাতে চেতনার গভীর থেকে, যা কিনা অতল সাগরের মতো, দেবতারা মন্থনে জয়ী হয়ে লাভ করলেন এক পাত্র সুধা। সেই পাত্রটি হাতে নিয়ে উঠলেন যে অপরূপা নারী, তিনিই লক্ষ্মী, তিনিই শুভা। অতএব অন্তরঙ্গে যদি কারও চেতনায় নিত্য জাগে তবে সে লক্ষ্মীলাভ করে। অর্থাৎ ওই একপাত্র সুধা, যা কি না অমৃত, যা মর্ত থেকে অমর্তের যাত্রায় সঙ্গী হয়, সেই পাত্রটি ধরে থাকেন স্বয়ং লক্ষ্মী। সামান্য টাকাকড়ি দিতে তাঁর ভারী বয়েই গেছে! তিনি সেই ধন দিতে পারেন, যা পেলে মানুষ এমন ধনী হয় যে মণিরে মানে না মণি। লক্ষ্মী উঠলেন এবং পদ্মাসীনা হলেন। তন্ত্রমতে ষড়চক্র, বেদমতে সপ্তভূমি আছে মানবদেহে। প্রতিটি চক্র বা ভূমিকে পদ্ম কল্পনা করা হয়। পদ্ম তাই আত্মিক প্রকাশের ভূমি। পদ্মাসীনা দেবী সেই প্রকাশের প্রতীক। সন্তোষ তাঁর প্রধান দান। সন্তোষ এমন বস্তু যা পেলে আরও চাওয়ার বাসনা থাকে না। সেই নির্বাসনার আধারে লক্ষ্মী শ্রী দান করেন। জগতে বা মননে যখন উগ্র শ্রীহীন অবস্থার প্রকাশ হয় তখন যেন ‘লক্ষ্মীছাড়া’ অবস্থা। শুকনো তেলহীন চুল, রুক্ষ চেহারা, গৃহের শান্তি বিনষ্ট, এই হল লক্ষ্মীছাড়া অবস্থা। 
দুর্গাপুজোর আড়ম্বর ও চাকচিক্যর পাশে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো নিতান্তই অনাড়ম্বর। ঝকঝকে বিদ্যুতের আলোর পাশে স্নিগ্ধ মাটির প্রদীপটি। দুর্গাপুজোর জৌলুস ও ব্যয় খুব কম জনের পক্ষেই বহন করা সম্ভব। তার ওপরে শক্ত পুজো। অনেক বিধি নিয়ম মানতে হয়। সেখানে লক্ষ্মী সকলের আপনজন। পিঁড়ি পেতে আলপনা দিয়ে ডাকলেই হল। যেটুকু নিয়ম সেসব নিজেরাই সুবিধে মতো বদলে নেওয়া যায়। যা বদলাতে হয় না তা হল ভক্তি ও ভালোবাসা। দুর্গার সঙ্গে পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার বহু আরাধ্যা দেবীর সাদৃশ্য পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ্মী আদতে অন্নদা হয়েও প্রাচীন কোনো সভ্যতার আরাধ্যা দেবীর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এতেই মনে হয় কোজাগরী আমাদের ঘরের মেয়ে। 
ঋক বেদে খিল খণ্ডে শ্রীসূক্তে যদিও লক্ষ্মীর উল্লেখ আছে কিন্তু সে শুধুই শব্দগত মিল। দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে গুণগত মিল নেই। লক্ষ্মীর উল্লেখ পুরাণেই প্রথম পাওয়া যায়। পরে তিনি নারায়ণের গৃহিণী হয়ে বৈকুণ্ঠে একটি শাশ্বত আসন পেলেন। আমরা বহু পৌরাণিক কাহিনিতে বিষ্ণুর লীলাকাহিনির সঙ্গে লক্ষ্মীকে মধুর ভাবে জড়িয়ে থাকতে দেখেছি। দেখেছি, নারায়ণকে কখনো কখনো তিনি ভক্তের প্রতি সদয় হতে বলছেন, কিংবা কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করতে বলছেন। মা যেমন হন। যদিও শ্রীসূক্তে লক্ষ্মীর যেসব গুণ বর্ণনা করা হয়েছে তা দেবোপমই বটে, কিন্তু পুরাণের লক্ষ্মী, যাকে নিয়ে পরে পাঁচালি রচনা করা যায়, তিনি আমাদের ঘরের মেয়ে। এবং মা। 
আশ্বিনের শারদপ্রাতে দুর্গতিনাশিনী মহাদেবীর পুজো শুরু হয়। বিজয়ার শেষে আমাদের মনে জমে ওঠা আঁধার দূর করতেই দেবীপক্ষের শেষদিনে আকাশে পূর্ণ চন্দ্রোদয়ের প্রদোষে নরম আলোয় লক্ষ্মী উদয় হন। পূর্ণশশীর মতোই তিনি আমাদের ভাগ্যাকাশে জেগে থাকেন। জানিয়ে দেন, দু’মুঠো অন্ন হলেই চলে। বাকি সব অতিরিক্ত। শ্রী অর্থে মঙ্গলময়ী। অতিরিক্ত সবই বিশ্রী। তাই কোজাগরীর আহবানে জেগে থাক মঙ্গলাকাঙ্ক্ষাটুকু। শ্রীমণ্ডিত হোক বঙ্গজীবন।