Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

আউশগ্রামের আলপনা গ্রাম যেন আস্ত ক্যানভাস

আউশগ্রামের আলপনা গ্রাম যেন আস্ত ক্যানভাস
  • ৩ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
সুদীপ পাল, মানকর: জঙ্গলঘেরা গ্রাম। প্রায় প্রতিটি বাড়ির দেওয়ালজুড়ে আঁকা হয়েছে চিত্র। কারও দেওয়ালে রামায়ণ। কোনও দেওয়ালে মহাভারত সহ নানা পৌরাণিক কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। রঙিন সেসব সুদৃশ্য শিল্পকলা চোখ জুড়িয়ে যায়। অভিনব সেই পরিবেশই এখন পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। আউশগ্রাম-২ ব্লকের লবণধার গ্রামে শীত পড়তেই বহু মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন। এই গ্রাম এখন শুধু জেলা নয়, রাজ্যজুড়ে আলপনা গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়েছে। গ্রামবাসীরা জানান, সারা বছর পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও শীতের সময় প্রচুর পর্যটক আসছেন। বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে ভিড় বাড়ছে। বিয়ের মরশুমেও এখন প্রি-ওয়েডিং ফটোশ্যুট করতেও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে ভিড় জমাচ্ছেন হবু দম্পতিরা। 
Advertisement
গ্রামবাসীরা জানান, প্রায় ৩০০ বছর আগে বড়ডোবায় জেবনা বা জীবন নামে এক ডাকাত থাকত এই এলাকায়। বুদবুদে চুরি করতে গিয়ে সে ধরা পড়ে। ডাকাতের উৎপাত থেকে বাঁচতে বড়ডোবার রায় বাড়ির সদস্যরা একটি পাখি ওড়ান। পাখি যেখানে বসবে তারা ঠিক করে সেখানেই নতুন করে বসতি স্থাপন করবে। লবণধার গ্রামের ধর্মরাজতলায় একটি বড় বটগাছে পাখিটি এসে বসে। সেখানেই নতুন বসতি স্থাপন হয়। গ্রামের নাম দেওয়া হয় নতুনগ্রাম। কিন্তু পরে দেখা যায় আশেপাশে আরও নতুনগ্রাম রয়েছে। বিভ্রান্তি এড়াতে তাই নাম রাখা হয় নবধার বা নবনধার। কালক্রমে সেটি লবণধার হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। বর্তমানে এই গ্রাম আলপনা গ্রাম নামেও পরিচিতি লাভ করেছে। তবে এই নাম কে বা কারা দিয়েছে তা অজানা গ্রামবাসীদের কাছে। 
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রাম সংলগ্ন এই জঙ্গলে প্রায়ই আগুন লাগত। জঙ্গলে আগুন লাগালে সেখানে বাস করা প্রাণীদের সমস্যা হয়। পাশাপাশি পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এলাকার বাসিন্দাদের সচেতনতার পাঠ দিতেই গ্রামের কয়েকজন যুবক মিলে তৈরি করেছিলেন একটি সংগঠন। তারাই প্রথম উদ্যোগী হয়ে বাড়ির দেওয়ালগুলিতে ছবি আঁকা শুরু করেন। পরবর্তীকালে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এই উদ্যোগ। সংগঠনের সদস্য মহেশ্বর মাজি, প্রণব কর্মকার জানান, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পীরা আসেন এই গ্রামে। বিভিন্ন চিত্র অঙ্কন করেন বাড়ির দেওয়ালগুলিতে। এরাজ্য ছাড়াও কেরল, ঝাড়খণ্ড থেকেও শিল্পীরা আসছেন। মহেশ্বরবাবু বলেন, শুধু জঙ্গল বাঁচানো নয়, আদিবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় আদিবাসী জীবনের ঐতিহ্য বজায় রাখারও চেষ্টা করা হচ্ছে। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের সংস্কৃতিমনস্ক করে তোলার জন্য নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রাকৃতিক রঙের উপর কর্মশালাও হয়েছে। সীমিত পরিকাঠামোয় পর্যটকদের সুবিধার জন্য দুই রুমের হোম-স্টে করা হয়েছে। পূর্ব বর্ধমান ছাড়াও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম ছাড়াও হাওড়া, হুগলি, কলকাতা থেকে নিয়মিত পর্যটকরা আসছেন গ্রাম দেখতে।
স্থানীয়রা জানান, পর্যটকদের পাশাপাশি বিয়ের মরশুমে প্রি-ওয়েডিং ফটোশ্যুট করতেও বহু যুবক-যুবতী ভিড় জমাচ্ছেন। যেমন পূর্ব বর্ধমানের সেহেরাবাজার থেকে প্রি-ওয়েডিং ফটোশ্যুট করতে এসেছিলেন অয়না দত্ত। তিনি বলেন, আলপনা গ্রামের নাম বহুবার শুনেছি। বন ও বন্যপ্রাণীদের বাঁচানোর জন্য এমন অভিনব প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই। দমদম থেকে কৌশিক দাঁ এসেছিলেন প্রি-ওয়েডিং ফটোশ্যুটে। তিনি বলেন, পুরো গ্রাম যেন আস্ত ক্যানভাস। বিভিন্ন ছবি আঁকা হয়েছে সেই ক্যানভাসে। এক ডাকে লবণধার গ্রামকে এখন সবাই চেনে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে নির্জন পরিবেশে ফটোশ্যুট করতে চেয়েছিলাম।
সম্পর্কিত সংবাদ