তন্ময় মল্লিক: মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি থানার কাবিলপুরের ইয়াদুল শেখকে আতঙ্ক এখনও তাড়া করে। চোখ বুজলেই দেখতে পান, ৫০-৬০জন যুবক তাঁকে ঘিরে ধরে বাংলাদেশি, বাংলাদেশি বলে চিৎকার করছে। চলছে কিল, চড়, ঘুসি। সঙ্গে শাসানি, ‘এখানে থাকা যাবে না। বাঁচতে চাইলে পালিয়ে যা।’ তারপর ২৪ ঘণ্টাও ছত্তিশগড়ে থাকার সাহস পাননি। সবকিছু ছেড়ে ইয়াদুল পালিয়ে এসেছেন বাংলায়।
রঘুনাথগঞ্জের সম্মতিনগরের বিকাশ রবিদাস ওড়িশায় গিয়েছিলেন রাজমিস্ত্রির কাজ করতে। লেখাপড়া তেমন এগোয়নি। হিন্দি বলতে পারেন না। তবে বুঝতে পারেন। কেউ হিন্দিতে প্রশ্ন করলে জবাব দেন বাংলায়। আর বাংলায় কথা বলছে মানেই ‘বাংলাদেশি’। তিলকধারীদের ফতোয়া, ‘এলাকায় দেখলে প্রাণে মেরে দেব। পালিয়ে যা।’ জীবিকার চেয়ে জীবন প্রিয়। তাই চলে এসেছেন বিকাশও।
তবে বাড়ি পালিয়ে আসার সুযোগ পাননি সূতির চক বাহাদুরপুরের জুয়েল রানা। বয়স একুশ। প্রাণশক্তিতে ভরপুর। ওড়িশার সম্বলপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করছিলেন। সারাদিন হাড়াভাঙা পরিশ্রমের পর বাসায় ফিরে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করছিলেন। তবে, খাওয়া তাঁর হয়নি। তার আগেই গেরুয়া বাহিনীর হামলায় ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে।
বীরভূমের পাইকরের সোনালি বিবিকে দিল্লির পুলিশ জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশে। কিন্তু সেখানে তিনি বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। তাই যেতে হয়েছিল জেলে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সোনালি বিবি দেশে ফিরেছেন। রাজ্য সরকার তাঁকে থাকার ঘর দিয়েছে। কিন্তু, যাঁকে নিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন, সেই মানুষটা এখনও বাংলাদেশের জেলে বন্দি। সৌজন্যে দিল্লি পুলিশ।
পুরুলিয়ার বরাবাজারের সুখেন মাহাত গিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের পুনেতে। সাত বছর সেখানে কাটানোর পরেও হিন্দি বা মারাঠি ভাষা শিখতে পারেননি। জানতেন শুধু বাংলা। তাই তাঁরও ঘরে ফেরা হয়নি। তাঁকেও জুয়েল রানার মতো মারা হয়েছে পিটিয়ে।
এঁদের ধর্ম ভিন্ন। তবে মিল একটাই, সবাই কথা বলেন বাংলায়। তাই প্রত্যেকের উপর নেমে এসেছে অমানুষিক অত্যাচার। কারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে জীবিকা, কারও প্রাণ। যিনি যে ভাষায় কথা বলেন, সেটাই তাঁর মাতৃভাষা। মাতৃভাষা প্রতিটি মানুষের কাছে মায়ের মতোই প্রিয়। সেই ভাষাতে কথা বলায় নেমে আসছে আক্রমণ। লাগাতার। তাই জানতে
ইচ্ছা করছে, জন্মের পর মায়ের মুখের যে ভাষা শুনে কথা বলতে শিখেছি, সেই ভাষা কি আমাদের ভুলে যেতে হবে?
পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান মহম্মদ আলি জিন্না জোর করে উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল আট থেকে আশি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে তা দমনের চেষ্টাও হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাদের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন আবুল-বরকত-রসিদ-সালেমরা। তরুণের রক্তে রাঙা হয়েছিল ঢাকার মাটি। ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য ছাত্র-যুবদের জীবনপণ লড়াই গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। ১৯৫২ সালের সেই রক্তক্ষয়ী লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়েছে গোটা বিশ্ব। তাকে সম্মান জানিয়ে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দিয়েছে। পৃথিবীর ১৮৮টি দেশের প্রায় ৬ হাজার ভাষাভাষী মানুষ আজকের দিনটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
এখন সেই বাংলা ভাষাই বহু মানুষের জীবনে ডেকে আনছে বিপদ। বাংলায় কথা বললেই কাউকে পিটিয়ে রাজ্যছাড়া করা হচ্ছে, কাউকে প্রাণে মেরে দেওয়া হচ্ছে। মুর্শিদাবাদের জুয়েল রানা, পুরুলিয়ার সুখেন মাহাতদের মর্মান্তিক মৃত্যু তুলে দিয়েছে প্রশ্ন, আবার কি মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য নামতে হবে আন্দোলনে?
কথায় আছে, হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে গেলে হয় প্রতিবাদ। গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। বিভিন্ন বিজেপিশাসিত রাজ্যে বাংলা ভাষার ও বাঙালির উপর যে আক্রমণ হচ্ছে তা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা পরিকল্পিত আক্রমণ বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। গোটা দেশের মানুষের কাছে ‘ঘুসপেটিয়া’ বলে বাঙালিদের বাংলাদেশি বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিজেপি। তাদেরই ইন্ধনে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে নির্বিচারে বাঙালি পেটানো চলছে। মার খাচ্ছে কারা? খেটে খাওয়া গরিব মানুষ। যাঁরা দু’টো বেশি পয়সা রোজগারের আশায় বাড়িতে বউ, বাচ্চা, বৃদ্ধ বাবা-মাকে রেখে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেন। তাঁদের উপর দিনের পর দিন নির্মম অত্যাচার হচ্ছে দেখেও বঙ্গ বিজেপির নেতানেত্রীরা কোনো প্রতিবাদ করছেন না। উলটে মৃত্যুর পিছনে অন্য কারণ দেখিয়ে সেই অত্যাচারকে সমর্থন করছেন।
পশ্চিমবঙ্গে পরিকল্পিতভাবে বিজেপি গেরুয়া কালচার আমদানি করার চেষ্টা করছে। এর আগে কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রী মানুষ কী খাবে, কোথা থেকে খাবার কিনবে, তা নিয়ে কিছু বলতেন না। বলার কথাও নয়। কিন্তু বিজেপি নেতারা বলছেন। তাঁরা ইদানীং নির্দেশ দিচ্ছেন, কোন দোকান থেকে মালপত্র কিনবেন। কাদের দোকানে যাবেন না। এমনকি, বিরিয়ানি দোকান থেকে না কিনে বাড়িতে রান্নার পরামর্শও দিচ্ছেন। শুধু সাধারণ মানুষকে নয়, তাঁরা নিজেদের বদলাতে চাইছেন। অনেক নেতা দিল্লির প্রিয় হওয়ার জন্য বাংলা কথায় হিন্দি টান আনছেন। এর উদ্দেশ্য, যে সংস্কৃতি, যে শিক্ষা নিয়ে এতদিন বাঙালি চলেছে, তাকে বদলে দিতে হবে। তা না হলে রাজ্যের ক্ষমতা বদলাবে না।
ইদানীং আরও একটা বিষয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বিজেপির শীর্ষ স্থানীয় কিছু নেতা বাংলার মনীষীদের নাম বিকৃতভাবে উচ্চারণ করছেন। কেউ মাস্টারদা সূর্য সেনকে বলছেন, ‘মাস্টার সূর্য সেন’। কেউ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ স্যানাল’। এই নিয়ে অনেকে টিপ্পনি কাটছেন। কিন্তু বিজেপি নেতারা নিজেদের সংশোধন করছেন না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিজেপি নেতারা কি ভুলবশত এই কাজ করছেন, নাকি বাঙালির সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলছেন?
এই প্রশ্ন ওঠার কারণ প্রধানমন্ত্রী পর পর দু’টি ভুল করলেন। এক, সংসদে দাঁড়িয়ে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বললেন, ‘বঙ্কিমদা’। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া গেল, প্রধানমন্ত্রীর বয়স হয়েছে। সেই কারণে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পদবি মনে করতে পারেননি। তাই মেকআপ দেওয়ার জন্য ‘বঙ্কিমদা’ বলে ম্যানেজ করেছেন। কিন্তু ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ক্ষেত্রে কেন এমন এমনটা হল?
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী সমাজ মাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন। সেই পোস্টে প্রধানমন্ত্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে ‘স্বামী রামকৃষ্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাতে শুধু বাঙালিই নয়, ক্ষুব্ধ গোটা দেশ তথা বিশ্ববাসী।
কারণ ঠাকুর রামকৃষ্ণের আবির্ভাব বাংলার
মাটিতে হলেও তাঁর আদর্শ, ভাবধারা বিশ্ববাসীকে অনুপ্রাণিত করেছে। সকলে তাঁকে ঠাকুর বলে মানেন। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ‘স্বামী’ হিসেবেই স্মরণ করেছেন। ‘ঠাকুর’ আর ‘স্বামী’র ফারাকটা কি তিনি জানেন না?
প্রধানমন্ত্রী আর পাঁচজন রাজনৈতিক নেতানেত্রীর মতো নন। তাঁর পদের একটা গরিমা আছে। তাঁর সমস্ত কিছুই প্রোটোকলে বাঁধা। তাঁর খাবার যেমন পরীক্ষা করা হয়, তেমনি তাঁর মনের ভাব সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশের আগেও যাচাই করা হয়। ফলে ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবকে ‘স্বামী’ বলাটা প্রধানমন্ত্রীর অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি নয়। এটা তাঁর ভাষণের অংশ হলে ‘স্লিপ অব টাং’ বলে সাফাই দেওয়া যেত। কিন্তু, এটা লিখিত পোস্ট। তাই সে যুক্তি কাজ করবে না। ধারাবাহিক বিকৃত উচ্চারণ দেখে অনেকে বলছেন, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব পরিকল্পিতভাবে বাঙালি ও বাংলার মনীষীদের হেয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষা দিবস। ভাষার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দিন। এই দিনটি বাঙালির কাছে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ ফের শুরু হয়েছে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ। চলছে বাঙালির অধিকার হরণের চেষ্টা। তার প্রতিবাদ হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামছে। সেই প্রতিবাদী মিছিলে বাজছে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান, ‘আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে/ করি বাংলায় হাহাকার/ আমি সব দেখেশুনে ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার/ বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান/ ক্ষিপ্ত তির ধনুক’। হ্যাঁ, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের এই গানই আজ বাঙালির প্রতিবাদের শক্তি। তাঁর এই গান বাঙালির ‘প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি’।