শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: অন্ধকারের বুক চিরে আছড়ে পড়বে জল! ড্রামের উপর জলের বিন্দুর আঘাতে তৈরি হবে রহস্যময় শব্দের অনুরণন। সেই ছন্দেই বিশাল পর্দায় কখনো আবির্ভাব, কখনো তাণ্ডবের মুদ্রায় ফুটে উঠবে মহাদেবের নৃত্য! জল, শব্দ আর আলোর মায়াবী খেলায় মুহূর্তে দর্শক হারিয়ে যাবেন অন্য এক জগতে। চোখের সামনে তৈরি হবে এক অলৌকিক আবহ। বারাসতের কালীপুজোয় এবার এমনই বিস্ময়ের পসরা সাজিয়েছে টাকি রোডের শিমুলতলা শ্রীকৃষ্ণপুর সাংস্কৃতিক চক্র।
পুজোর সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে তাদের থিম ‘অতল অনন্তম’। মণ্ডপে ঢুকলেই যেন অনুভূতি বদলে যাবে দর্শনার্থীদের। প্রযুক্তির নিপুণ ব্যবহার আর শিল্পের কল্পনায় মণ্ডপ হয়ে উঠবে এক জীবন্ত দৃশ্যপট। মণ্ডপ ও প্রতিমার ভাবনায় রয়েছেন শিল্পী ভবতোষ সুতার। মাতৃপ্রতিমার উচ্চতা ২৩ ফুট! দুর্গাপুজোয় দীর্ঘ ২৭ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও বারাসতের বিগ বাজেটের কালীপুজোয় এই প্রথম তাঁর কাজ।
শিল্পীর কথায়, পুজো আমার কাছে শুধু পেশা নয়, নেশাও। অতল অনন্তমের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, যার তল নেই, তা অতল। যার শেষ নেই, তা অনন্ত। জল, শব্দ ও দৃশ্যের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ভাবনাকে মানুষের মনে পৌঁছে দেওয়াই আমার লক্ষ্য। আমার যা পরিকল্পনা ছিল পুরোটাই করা গিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৯০ জনের মতো শ্রমিক দিনরাত এক করে পরিশ্রম করছেন। মণ্ডপের প্রতিটি কোনায় থাকবে আবেগ আর অনুভূতির ছোঁয়া।
এদিকে পুজোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক সুবীর শীল। তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত, এবারের এই পুজোয় তৈরি হয়েছে আলাদা পরিচিতি। সুবীরের কথায়, ৫০ বছরের এই পথচলা শুধু একটা পুজোর ইতিহাস নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও ভালোবাসা। অতল অনন্তম এই থিম সেই অনুভূতিরই প্রতিচ্ছবি। জলের যেমন কোনো সীমা নেই, অনন্তেরও কোনো শেষ নেই। তেমনই মানুষের বিশ্বাস ও শিল্পের প্রতি ভালোবাসাও সীমাহীন। আমরা চাই, দর্শনার্থীরা শুধু মণ্ডপের সৌন্দর্য দেখবেন না, তার গভীরতাও অনুভব করবেন। এই পুজো তাঁদের মনে এমন এক অনুভূতি তৈরি করুক, যা মণ্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও থেকে যাবে। বারাসতের কালীপুজোকে আরও বড়ো মঞ্চে তুলে ধরাই আমাদের স্বপ্ন।
আর এই স্বপ্নের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাড়তি মাত্রা যোগ করছে ভিভিআইপি সমাগম। বারাসতের কালীপুজোর ইতিহাসে এই প্রথম কোনো পুজোর উদ্বোধনে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আজ, বৃহস্পতিবার পুজোর উদ্বোধনে তাঁর উপস্থিত থাকার কথা। একই মঞ্চে থাকবেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যও।
দর্শনার্থীদের আকর্ষণের জন্য টাকি রোডের দুপাশে প্রায় ২ থেকে ৩ কিমি জুড়ে থাকছে চন্দননগরের চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা। তৈরি হচ্ছে একাধিক আলোর তোরণ। কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তেও শুরু হয়েছে পুজোর প্রচার। ৫০ বছরের আবেগ, শিল্পীর কল্পনা আর প্রযুক্তির বিস্ময়—সব মিলিয়ে শ্রীকৃষ্ণপুর সাংস্কৃতিক চক্রের অতল অনন্তম এবার বারাসতের কালীপুজোয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।



