অমিত চৌধুরী, তারকেশ্বর: প্রায় ৪০০ বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে এসে চণ্ডীতলার মশাট এলাকার বীরেশ্বরতলায় বসবাস শুরু করে চট্টোপাধ্যায়রা। এ পরিবারের পুজো ৩৬৪ বছরের পুরনো। ১৬৬২ খ্রিস্টাব্দে সূচনা করেছিলেন পুরন্দর চট্টোপাধ্যায়। তার ১০০ বছর পর পুজো নতুন করে সাজিয়ে তোলেন এই বংশের গৌড়মোহন চট্টোপাধ্যায়।
তাঁদের বাস্তুভিটের কাছ দিয়ে বইত কৌশিকী নদী। সে নদীর অস্তিত্ব গিয়েছে বিলীন হয়ে। অন্যদিকে বোলবোলা বেড়েছে চট্টোপাধ্যায়দের। তাঁদের বাড়ি পরিচিত হয় বাবুদের বাড়ি নামে। বর্ধমান মহারাজের হয়ে এই এলাকার কর আদায় করত এই পরিবার। এই পুজো ঘিরে একাধিক গল্প স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। একসময় বলি হত। তবে এক অলৌকিক ঘটনার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এই পরিবারের সমীরকুমার চট্টোপাধ্যায় জানান, পুজো শুরু হয়েছিল মনসাতলায়। পরে খড়ের চালের নাটমন্দির ও মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। তার মাঝখানে দুর্গামন্দির ও চারদিকে দোতলা বাড়ি ছিল। ১৯৪৭ সালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সব পুড়ে যায়। কাঁসা-পিতলের বাসন পর্যন্ত আগুনের শিখায় গলে গিয়েছিল এমন ছিল তীব্রতা। এরপর পরিবারে আর্থিক অনটন দেখা দেয়। পুজো বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তবে দেবী আদেশ দেন, পুজোর কিছু না কিনতে পারলে শুধুমাত্র থোড় ও মোচা দিয়ে পুজো দিবি আমাকে। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত নিয়ম মেনে দেবীকে থোড় ও মোচা নিবেদন করা হয়। ঠাকুরের আশীর্বাদে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এক অলৌকিক ঘটনায় বন্ধ হয়ে যায় বলি দেওয়ার রীতি। বাড়ির কর্তা তখন গৌরমোহন। বলিদানের পূর্ব মুহূর্তে বলিপ্রদত্ত পাঁঠা ছুটে গিয়ে দুর্গার পায়ের কাছে বসে থাকা গৌড়মোহনের কোলে আশ্রয় নেয়। দুর্গার পদতলে পাঁঠার প্রাণভিক্ষার আকুতি গৌরমোহনকে স্তব্ধ করে দেয়। বলিপ্রথা রদ করেন তিনি। সে নিয়ম মেনে এখন মহালয়া থেকে দশমীর সুতো কাটা পর্যন্ত পরিবারের সকলে নিরামিষ খান। পাশাপাশি এলাকায় কিছু পুজো হলেও বীরেশ্বরতলার এই পারিবারিক পুজো এখন আসলে সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। গ্রামের সকলেই এই দেবীকে তাদের পরিবারের দেবী বলে মনে করেন। এর কিছু দূরে মিত্রবাড়ি। সেখানকার দুর্গা ও এই বাড়ির প্রতিমাকে দু’বোন বলে মনে করে গ্রামের মানুষ। এই বাড়ির প্রতিমা বড়ো। এই অঞ্চলের বিখ্যাত শিবমন্দির বীরেশ্বরতলার দুধপুকুরে আমাদের প্রতিমা সবার প্রথম বিসর্জন হয়। এরপর অন্যান্য প্রতিমার বিসর্জন। এখনও পরিবারের সদস্যরা দুর্গাকে কাঁধে নিয়ে বিসর্জনে যান। পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্য কেশব চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘মহালয়ার পর শুরু হয় পুজো। অষ্টমীতে মনস্কামনা পূরণে দণ্ডি কেটে পুজো দেন সকলে। প্রতিদিন ভোগ বিতরণ। নবমীতে বালক ভোজন। দশমীতে সিঁদুর খেলা। একাদশীতে সত্যনারায়ণ পুজো।’