নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে রহস্যজনক নিখোঁজ কাণ্ডের তদন্তে নেমে কালঘাম ছুটছে পুলিসের। মুহূর্তে মুহূর্তে তদন্তের অভিমুখ পাল্টাচ্ছে। পুলিস কুকুরের সূত্র ধরলে নিখোঁজ রহস্যের সঙ্গে তদন্তকারীরা যোগসূত্র পাচ্ছেন পাণ্ডবেশ্বরের কুমারডিহির শ্মশানকালী মন্দিরের। কেননা, নিখোঁজ যমজ বোনের পোশাক উদ্ধারের স্থল থেকে পুলিস কুকুর বার বার ছুটে গিয়েছে মন্দিরে। এই স্থানটি থেকে মানব দেহের কঙ্কালও মেলে। কুকুরের আচরণ দেখে তদন্তকারীদের প্রাথমিক সন্দেহ, তন্ত্র সাধনার বলিও হতে পারে নিরীহ দু’টি নাবালিকা। এই সন্দেহকে আরও গাঢ় করে তুলছে মাথার খুলি ও দেহের হাড়গোড় পৃথক ভাবে পাওয়ার ঘটনাটি। সবমিলিয়ে যমজ বোনেরে নিখোঁজ রহস্যে বলি-তত্ত্বের সম্ভাবনা ক্রমেই জোরাল হচ্ছে। পাশাপাশি কঙ্কাল ও পোশাক উদ্ধারের পর যমজ বোনের কয়েকজনের নিকট আত্মীয়ের ব্যবহারও যথেষ্ট সন্দেহজনক বলে আতস কাচে ধরা পড়েছে। এসিপি পিন্টু সাহা বলেন, তন্ত্র সাধনার বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি। এখনও নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
গত বছর পয়লা ডিসেম্বর কুমারডিহি ফুটবল মাঠ থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় দশ বছরের যমজ বোন শ্রদ্ধা ও স্নিগ্ধা বাউরি। পরের দিন ওই মাঠের পাশের একটি গাছ থেকেই উদ্ধার হয় এলাকার যুবক উজ্জ্বল বাউরির ঝুলন্ত দেহ। গত শনিবার গ্রামের অদূরে ডিহি পার্কের পিছনের দিকে কিছু কঙ্কাল ও নাবালিকা মেয়েদের পোশাক দেখতে পাওয়া যায়।
ওই যমজ বোনের আত্মীয়রা দাবি করেন, পোশাকগুলি তাঁদের বাড়ির মেয়েদের। পুলিস কুকুর এনে তদন্ত হয়। কুকুরটি সেই এলাকা থেকে দৌড়ে পৌঁছে যায় কয়েকশো মিটারের মধ্যে থাকা শ্মশানকালীর মন্দিরে। ঘটনাস্থল থেকে নমুনাও সংগ্রহ করেছে ফরেন্সিক দল। সেই রিপোর্ট এখনও হাতে পাননি তদন্তকারীরা। তার আগে পুলিস কুকুর এনে এবং অন্যান্য তথ্য সূত্র বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা মনে করছেন, যমজ বোনের চেনা পরিচিতরা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তারাই সম্ভবত তন্ত্র সাধনায় দুই বোনকে বলি দিয়েছে। তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য পড়শি দাদা উজ্জ্বলকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
কারণ, তার সঙ্গে দুই বোনের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। তাই উজ্জ্বল ডাকতেই সাত সকালে মাঠে খেলতে চলে গিয়েছিল দুই বোন। কিন্তু, এখানে প্রশ্ন উঠছে, তা হলে পরের দিন উজ্জ্বলের দেহ উদ্ধার হল কেন? উত্তর খুঁজতে সম্ভাব্য দু’টি কারণ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এক, উজ্জ্বল হয়তো ভাবতেই পারেনি তার খেলার সঙ্গী দুই বোনকে এভাবে মরতে হবে! তাই চূড়ান্ত অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে সে আত্মঘাতী হয়। দুই, দুই বোনের বলির গোটা বিষয়টি হয়তো উজ্জ্বল জানত। পরে সে যাতে মুখ না খুলতে পারে তার জন্য মেরে ফেলা হতে পারে। কিন্তু, এতবড় একটা পরিকল্পনা একা কোনও তান্ত্রিকের পক্ষে সম্ভব নয়। এর পিছনে অনেকের জড়িত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিস। সেক্ষেত্রে যমজ বোনের নিকট আত্মীয়ের উপর কড়া নজর রাখছেন তদন্তকারীরা।
এদিকে, ঘটনাটি নতুন করে প্রকাশ্যে আসার পর দুই বোনের মামা ও দিদার মধ্যে খুব বেশি তাপ উত্তাপ ছিল না। মেয়ে দুটিকে নিয়ে আর্থিক টানাপোড়েনও ছিল পরিবারে। তিন বছর আগে তাদের মা বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্কে জড়িয়ে অন্যত্র চলে যান। বাবা বাপি বাউরি অণ্ডালের কাজোড়ায় কাজ করেন। মামা ও দিদা, দাদুর কাছেই থাকত। মামার যমজ বোনের বাবা বাপি বাউরি বলেন, কিছুদিন ধরে আমার শ্বশুরবাড়ির লোক মেয়েগুলির সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত না। এবছরই তাদের আমি নিয়ে চলে আসব বলে ঠিক করেছিলাম। তারপরই এই ঘটনা ঘটে গেল। দিদা মন্দিরা বাউরি বলেন, নাতনির শোকে আমার স্বামী মারা গিয়েছেন। ওদের আর ফিরে পাব বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।