নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: প্রথমে ভবানীপুরের রোমহর্ষক অপহরণকাণ্ড। পরে নিউ মার্কেটে খোদ পুলিস সার্জেন্টকে হেনস্তা, মারধর। পরপর দু’দিন শহরের বুকে ঘটল চাঞ্চল্যকর ঘটনা। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারও করল পুলিস। কিন্তু, গ্রেপ্তারির পর আদালতে পেশ করতেই জামিন পেয়ে গেল অভিযুক্তরা। সৌজন্যে ‘পুলিসি গাফিলতি’। কোনও কেস ডায়েরিতে উল্লেখ নেই গ্রেপ্তারির কারণ। আবার কোনওটির ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের পরিবারকে দেওয়াই হয়নি ‘অ্যারেস্ট মেমো’। পুলিসি কর্তব্যে এই ফাঁকফোকরকে ভর্ৎসনা করেই জামিন দেয় আদালত।
গত বুধবার ভবানীপুরের যদুবাবু বাজার এলাকা থেকে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে দুষ্কৃতীরা। অপহৃত ব্যক্তি পেশায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার একটি সমবায় ব্যাঙ্কের কর্তা। অভিযুক্তরা তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। তদন্তে নেমে মাত্র চার ঘণ্টার মাধ্যমে অনলাইন লেনদেনের সূত্র ধরে ৫ অভিযুক্তকে যাদবপুর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। উদ্ধার করা হয় অপহৃতকেও। শনিবার আলিপুর আদালতে পেশ করা হয় ধৃতদের। সরকারি আইনজীবীর তরফে পুলিসি হেফাজতে চাওয়া হয় অভিযুক্তদের। ধৃতদের তরফে আইনজীবীরা বলেন, গ্রেপ্তারির পদ্ধতি আইনসিদ্ধ নয়। সওয়াল জবাব শুনে ভরা এজলাসে বিচারক জানান, একটি-দু’টি নয়, তদন্তের প্রক্রিয়াতে তিনটি ত্রুটি রয়েছে। আদালত সূত্রে খবর, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী তদন্তের যাবতীয় খুঁটিনাটি কেস ডায়েরিতে উল্লেখ রাখতে হবে। তবে ভবানীপুরের অপহরণ কাণ্ডে সেই কেস ডায়েরি সম্পূর্ণ ছিল না। অভিযুক্তদের আইনজীবীর দাবি, কেস ডায়েরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য— কেন অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হল, তারই উল্লেখ নেই। পাশাপাশি, কেন পুলিসি হেফাজতের প্রয়োজন রয়েছে, সেই যুক্তিরও উল্লেখ নেই। এহেন ফাঁক গলেই পুলিসি হেফাজত খারিজ করে দেন জামিন মঞ্জুর হয় ধৃতদের। এপ্রসঙ্গে সরকারি আইনজীবী সৌরীন ঘোষাল বলেন, আমাদের তরফে হেফাজতের আর্জি জানানো হয়েছিল। কিন্তু, আদালত যা নির্দেশ দিয়েছে, সেটাকেই মান্যতা দিতে হবে।
অন্যদিকে, শনিবার রাতেই লেনিন সরণিতে পুলিসের সঙ্গে বচসায় জড়ায় দুই ব্যবসায়ী। একমুখী রাস্তায় বিপজ্জনকভাবে গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়ার জেরেই গাড়ি চালককে আটকান কর্তব্যরত সার্জেন্ট। অভিযোগ, দু’পক্ষের বচসা চলাকালীন কর্তব্যরত পুলিস সার্জেন্টকে ধাক্কা মারেন দুই অভিযুক্ত। উর্দি ছিঁড়ে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। দু’জনকেই ব্যাঙ্কশাল আদালতে পেশ করা হয়। এই ঘটনাতেও পুলিস হেফাজতের আবেদন করেন সরকারি আইনজীবী। কিন্তু, এখানেও একই সমস্যা। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বলছে, কাউকে গ্রেপ্তার করলে অভিযুক্তদের দিয়ে ‘অ্যারেস্ট মেমো’তে সই করাতে হবে। একইসঙ্গে তার কপি দিতে হবে অভিযুক্তদের পরিবারকে। ধৃতদের আইনজীবীদের দাবি, সেই কাজ করেনি পুলিস। তাই গ্রেপ্তারি আইনসিদ্ধ নয়। সেই সওয়ালই এজলাসে করেন আইনজীবীরা। তার ভিত্তিতে জামিন মঞ্জুর করেন বিচারক।
পরপর দু’দিন একই ঘটনায় উঠছে প্রশ্ন। লাগাতার এই ভুল কি অনিচ্ছাকৃত নাকি গাফিলতি? আইনজীবী মহলের দাবি, নতুন আইন সম্পর্কে আরও বেশি সতর্ক থাকার প্রয়োজন। লালবাজারের এক আধিকারিক বলেছেন, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা নিয়ে বারংবার ট্রেনিং চলে। কেন এমন ঘটনা ঘটল, তা দেখা হচ্ছে।