সুত বললেন, অর্জুনের মুখের ভাবে অমঙ্গলের কালো ছায়া লক্ষ্য করে যুধিষ্ঠির সন্দিগ্ধভাবে নানাপ্রকার প্রশ্ন করলেন। কিন্তু কৃষ্ণবিরহক্লিষ্ট অর্জুন কোন উত্তর দিতে না পেরে নীরব রইলেন। গভীরশোকে অর্জুনের বদন ও হৃদয়কমল বিশুষ্ক। নিজেও তিনি তেজোহীন, নিষ্প্রভ। নিরন্তর কৃষ্ণচিন্তায় ও শোকে আচ্ছন্ন থাকায় জ্যেষ্ঠের কথার উত্তর দিতে সমর্থ হলেন না। অতিকষ্টে শোকাশ্রু সংবরণ করে, হস্তদ্বারা মুখমার্জনা করে, কৃষ্ণের অদর্শনে অত্যন্ত ব্যাকুল অর্জুন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে বললেন। সারথ্য-দৌত্য প্রভৃতি বিভিন্ন কর্মে পাণ্ডবদের প্রতি কৃষ্ণের হিতচিন্তা, মৈত্রী, সৌহার্দ্য প্রভৃতি স্মরণ করে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে অর্জুন অগ্রজ যুধিষ্ঠিরকে বললেন।
অর্জুন বললেন, হে মহারাজ, আমার অতিশয় দুর্ভাগ্য, কারণ সেই পরমসখা শ্রীকৃষ্ণকে আমি হারিয়েছি। আমার সেই অপরিমেয় তেজ, যা দেবতাদেরও বিস্ময় উৎপাদন করত, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তাও বিনষ্টপ্রাপ্ত হয়েছে। দেহ থেকে প্রাণ বর্হিগত হলে জীবশরীর যেমন শবরূপে গণ্য হয়, সেইরূপ শ্রীহরির বিরহে সমগ্র জগৎ মুহূর্তের মধ্যে শ্রীহীন হয়ে গেছে।
সেই শ্রীকৃষ্ণ—যাঁর শক্তিতেই দ্রুপদরাজার গৃহে স্বয়ংবর সভায় আগত প্রবল মদমত্ত রাজাদের প্রতিহত করে ও ধনুতে বাণ যোজনার দ্বারা মৎস্যচক্ষু বিদ্ধ করে আমি দ্রুপদ রাজকন্যা দ্রৌপদীকে লাভ করেছিলাম। আহা! সেই শ্রীকৃষ্ণ—যাঁর সান্নিধ্যে থেকে আমি কেবল দেবগণ নয়, দেবরাজ ইন্দ্রকেও মুহূর্তে পরাজিত করে অগ্নিকে খাণ্ডববন প্রদান করেছিলাম। খাণ্ডবদাহ থেকে ময়কে রক্ষা করায় তার কাছ থেকে এক অপূর্ব শিল্পকর্ম-সমন্বিত ‘মায়াসভা’ আমি প্রাপ্ত হয়েছিলাম—যে সভায় উপবিষ্ট হয়ে নানাদিক থেকে আগত রাজন্যবর্গ আপনার যজ্ঞানুষ্ঠানে আপনাকে বিবিধ উপহার দ্রব্য দিয়েছিলেন।
সেই শ্রীকৃষ্ণ—যাঁর তেজের দ্বারা দশসহস্র হস্তীর সমান বলশালী আপনার কনিষ্ঠ ও আমার অগ্রজ পূজনীয় ভীমসেন, যে জরাসন্ধ, আপনার যজ্ঞ করার জন্য, সমস্ত রাজাদের পদদলিত করে জয় করেছিলেন—তাঁকে বধ করেন এবং মহাভৈরব যজ্ঞ করার জন্য জরাসন্ধ যে সকল রাজাদের এনে কারারুদ্ধ করে রেখেছিলেন, তাঁদেরকেও তিনি কারাগার থেকে মুক্ত করে দেন—সেই কারণেই তাঁরা আপনার যজ্ঞে নানাপ্রকার উপহার এনেছিলেন।
আপনার মহিষী দ্রৌপদীর রাজসূয় যজ্ঞ উপলক্ষ্যে মহাভিষেকের পর রচিত অতিমনোহর কবরীবন্ধন কপট ও দুর্বৃত্ত দুঃশাসন প্রভৃতি কৌরবভ্রাতাগণ প্রকাশ্য রাজসভায় উন্মুক্ত করে ও আকর্ষণ করে দ্রৌপদীকে লাঞ্ছিতা করেছিল, তখন তিনি কৃষ্ণের পদতলে পতিত হয়ে রোদন করেছিলেন। সেইজন্য কৃষ্ণ প্রতিশোধ নেবার জন্য কৌরব পত্নীগণকে পতিহীনা করে তাদের কেশবন্ধনও মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
সেই শ্রীকৃষ্ণ—যিনি দ্বৈতবনে এসে রন্ধন পাত্রে সংলগ্ন এককণা শাকান্ন ভোজন করে, দুর্যোধনের কুপরামর্শে অভিশাপ দিতে উদ্যত দশহাজার শিষ্যের অগ্রভোজী অতিকোপন দুর্বাসামুনির ভয়ানক অভিশাপ থেকে আমাদের রক্ষা করেছিলেন।
অধ্যাপিকা গীতা মাইতি অনুদিত ‘শ্রীমদ্ভাগবতম্’ থেকে