সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: মঙ্গলবার রাত সাড়ে ন’টা। এখনও আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা। কিন্তু প্যাটেল ভবনের ভিতরে পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তপ্ত। আসানসোল পুরসভার ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত এই এলাকা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এখান থেকে তৃণমূল প্রার্থী মলয় ঘটক ১২০০ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। হিন্দিভাষী প্রভাবিত ওয়ার্ডে সেই মলয় ঘটকের কর্মী সভাতেই তিল ধারণের জায়গা নেই। সৌজন্যে এসআইআর নিয়ে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভের আগুনেই ঘি ঢেলে দিলেন বর্ষীয়ান দুঁদে তৃণমূল নেতা।
তিনি বলেন, বিজেপির নির্দেশে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। বলেছিল এ রাজ্যে বাংলাদেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। একজন রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি পাওয়া যায়নি। উল্টে আপনাদের মতো হিন্দিভাষী মানুষদের নাম বাদ গেল। বিজেপিকে প্রশ্ন করুন, হিন্দিভাষীরাই রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি! দশকের পর দশক ধরে এই বাংলায় যেসব হিন্দিভাষী মানুষের বসবাস করছেন, তাঁদের নাম কেটে দেওয়া হল। কর্মিসভায় মন্ত্রীর সামনেই বসেছিলেন বহু অবাঙালি গৃহবধূ। অনেকের কোলে বাচ্চাও রয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনাদের বিয়েতে অনেক গয়না দেওয়ার রীতি রয়েছে। মেয়ের বিয়েতে মেয়েকে সোনা দিতে পারবেন? মোদিজি ক্ষমতায় আসার আগে সোনার ভরি ছিল ২৬ হাজার টাকা, এখন এক ভরি সোনার দাম দেড় লক্ষ টাকা। বরপক্ষ যদি ১০ ভরি সোনা চায়, দিতে পারবেন? শ্রমমন্ত্রী বলেন, আমরা বাঙালি, অবাঙালি ভাগ করি না। আমার একমাত্র গৃহবধূ অবাঙালি। মনে রাখবেন, পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র অহিন্দিভাষী রাজ্য, যেখানে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাওড়ায় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছেন। আমাদের আসানসোলে হিন্দি কলেজ তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ছট উৎসবে দু’ দিন ছুটি ঘোষণা করেছেন। কর্মিসভা থেকে বেরিয়ে মালতি দাস বলেন, জিনিসপত্রের যা দাম সংসার চালাতে পারছি না। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে কিছুটা সুবিধা পাই। আমাদের এলাকার অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। রমেশ যাদব দোকানে কাজ করেন। সভা শেষে উনিও বলেন, আমাদের এখানে হিন্দি কলেজ হয়ে খুব ভালো হয়েছে। এদিনের কর্মিসভায় উমেশ সিং সহ বেশকিছু বিজেপি নেতাকর্মী তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, অটলজি, যোশিজির বিজেপি আর নেই।
যদিও মন্ত্রীকে পাল্টা তোপ দেগেছেন আসানসোল উত্তরের বিজেপি প্রার্থী কৃষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, আসানসোলের হিন্দিভাষী এলাকাগুলি কোনো উন্নয়ন করেনি তৃণমূল সরকার। নিকাশি ব্যবস্থা নেই, পানীয় জলটুকু পান না তাঁরা। নিজেদের অনুন্নয়ন, ব্যর্থতা ঢাকলে বিভ্রান্তি ছড়াছেন মন্ত্রী। ওঁর পায়ের তলা থেকে জমি সরে গিয়েছে।
আসানসোল উত্তরে ৪৩ হাজার মানুষের নাম বাদ পড়েছে। বিচারাধীন আরও ২২ হাজার। মন্ত্রী জানেন, তাঁর বিধানসভা ‘টার্গেট’। তাই রণকৌশল পাল্টে আরও বেশি মানুষের সমর্থন পেতে সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত জনসংযোগ করছেন জেলার সবচেয়ে প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা। মঙ্গলবার সকালে তিনি হাজির হয়েছিলেন নিশ্চিন্তার বাউরিপাড়া, রুইদাসপাড়া, কান্তাপাড়ায় জনসংযোগ করতে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে মানুষের অভাব অভিযোগ শুনেছেন। ডায়েরি কলম নিয়ে নিজে তা ‘নোট’ করেছেন। তারপর আসানসোল বস্তিনবাজারে দীর্ঘক্ষণ জনসংযোগ করেছেন। কয়েক ঘণ্টা সেখানে সময় কাটানোর পর তাঁর সমর্থনে শিক্ষকদের মিছিলে পা মিলিয়েছেন। বিকাল থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে একটা একটা করে কর্মী সম্মেলন করেন। রাতে আপকার গার্ডেনে বাসন্তী পুজোয় মায়ের কাছে আশীর্বাদ নিয়ে প্রচার শেষ করেন। -নিজস্ব চিত্র