ভোররাতের আগুন তখনও নেভেনি। কাঠের কারুকার্যশোভিত ৩৪৫ বছরের প্রাচীন রেনকোজি বৌদ্ধ মন্দির বিধ্বংসী আগুনের লেলিহান শিখায় ঢেকে গিয়েছিল। জাপানের টোকিও শহরের অন্যতম প্রাচীন নিশিয়েন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এই মন্দিরের আগেও একাধিকবার ভস্মীভূত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। অগ্নিদেবের ভয়ঙ্কর দাপটে বাতাসে কাঠের পোড়াগন্ধ ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ভস্মীভূত ধ্বংসাবশেষে হারিয়ে যায় ওই মন্দিরে শাক্যমুনি বুদ্ধদেবের চরণপ্রান্তে নেতাজির নামে রেখে দেওয়া ছাইভস্মের আধারটিও। ভারতবাসীকে অন্ধকারে রেখে দশকের পর দশক ওই ‘চিতাভস্মের’ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পাঠানো হতো অর্থ। জার্মানির বৃহত্তর সংবাদ সংস্থা ডি.পি.এ (Deutsche press agentur), টোকিও সংবাদ জানাচ্ছে, ‘রেনকোজি মন্দির ভস্মীভূত’। সংবাদটির ডেটলাইন ছিল টোকিও, ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯। গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি পশ্চিমবাংলায় একমাত্র দৈনিক ‘বর্তমান’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক, নেতাজিগত প্রাণ বরুণ সেনগুপ্ত প্রকাশ করেছিলেন।
বিশ্বব্যাপী রেনকোজি বৌদ্ধ মন্দির ভস্মীভূত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে যাওয়ার পরেই ‘নেতাজির চিতাভস্ম’ নামক কুমির ছানার গল্পটিও চিরতরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু না, নেতাজি সত্য গোপন করতে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র অব্যাহত রইল। কিছু কিছু গণমাধ্যম ও দাবিদার পরিবারের একাংশের সহায়তায় ঘটানো হল এক ‘অলৌকিক’ ঘটনা। ভস্মীভূত রেনকোজি বৌদ্ধ মন্দিরে নেতাজির নামে রেখে দেওয়া ভস্ম পরিবর্তিত হয়ে কিছু আধপোড়া অস্থিখণ্ডে রূপান্তরিত হল। ভস্মধারটিও নবকলেবর ধারণ করল! ঝকঝকে নতুন চারকোণা কাঠের বাক্সে পুনঃনির্মিত রেনকোজিতে রূপবদল করে আবার ফিরে এল। এমন ‘অলৌকিকভাবে’ আবির্ভূত ‘চিতাভস্মের’ ওপর ভিত্তি করেই ভিত্তিহীন বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু কাহিনির গল্প ফেরি করা হতে লাগল বছরের পর বছর। বিশেষ করে বছরের জানুয়ারি ও আগস্ট মাসে। ইদানীংকালে আবার বিজ্ঞানের মোড়কে অবৈজ্ঞানিক ভাবনাকে পল্লবিত করতে সাজিয়ে রাখা পাঁচমেশালি হাড়গোড়ের ডি.এন.এ পরীক্ষার দাবি করছেন কেউ কেউ। যাঁরা নেতাজি তদন্তে নিযুক্ত মুখার্জি কমিশন চলাকালে সম্পূর্ণ শীতঘুমে ছিলেন। প্রায় ছ’বছর এই কমিশনের অনুসন্ধান পর্ব চলে এবং চিতাভস্মতত্ত্ব খারিজ করে দিয়েছিলেন বিচারপতি মনোজ মুখোপাধ্যায়। তাঁর সেই সরকারি অনুসন্ধান রিপোর্ট অগ্রাহ্য করা হয় ‘অসম্পূর্ণতার’ অভিযোগে। দিল্লিতে শাসক বদলে গেলেও মুখার্জি কমিশনের রিপোর্টকে মান্যতা দেওয়া হয়নি। অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করার নৈতিক দায় ও দায়িত্ব কোনওটাই পালন করা হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার আজও নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর আমলে গঠিত যথাক্রমে শাহনাওয়াজ কমিটি ও খোসলা কমিশনের নানা অসঙ্গতিপূর্ণ রিপোর্ট দুটিকে মান্যতা দিয়ে চলেছে।
রেনকোজিতে নেতাজির নামে চালানো ওই ছাইভস্ম আসলে কার সে বিষয় বিস্তারিত বলার আগে ফিরে যাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ লগ্নে নেতাজি কীভাবে ইঙ্গ-মার্কিন শত্রুবাহিনীকে বোকা বানিয়ে বিমান দুর্ঘটনার গল্পের আড়ালে পূর্ব এশিয়ার প্রেক্ষাপট থেকে অন্তর্হিত হলেন। সারা পৃথিবী জুড়েই প্রায় একডজন অনুসন্ধান হয়েছিল আলাদা আলাদা ভাবে। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে যে তদন্তগুলি কোনওটা ছিল গোপনে কোনওটা বা প্রকাশ্যে। নানা দেশের বিভিন্ন মহাফেজখানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তদন্ত রিপোর্টগুলি সবগুলিই প্রকাশ্যে এসেছে এমনটা নয়। সাময়িক ও সামরিক প্রয়োজনে সেই সময় নেতাজি তাঁর বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সাহায্যে বিমান দুর্ঘটনার নাটক ও চিতাভস্মের কাহিনি প্রচার করেছিলেন ইঙ্গ-মার্কিন গোয়েন্দাকুলকে বিভ্রান্ত করতে। পরবর্তীকালে খণ্ডিত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে শাসকেরা প্রকৃত সত্যকে ‘চিতাভস্ম’ গল্পের আড়ালে সামনে আসতে দিতে চাননি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আজাদ হিন্দ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারত দখলকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটিশ ও তার দোসর মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর। কোনও পর্যায়েই সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে তিনি যাননি। মিত্রশক্তির সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও স্ট্যালিন আজাদ হিন্দ সরকারকে সমর্থন ও সহায়তা করেছেন, তবে তা প্রকাশ্যে নয়। এগারোটি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনায়কের দ্বারা স্বীকৃত আজাদ হিন্দ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান, আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজি জাপানে মার্কিন সেনার পরমাণু বোমা আক্রমণের পরেও বলেছিলেন পৃথিবীতে একমাত্র আজাদ হিন্দ সরকার আত্মসমর্পণ করেনি। জাপান, জার্মান, ইতালি সবাই একে একে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বীরত্বময় যুদ্ধ শেষে রক্তের আলপনা আঁকা পথে আজাদ হিন্দ ফৌজ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও আজাদ হিন্দ সরকার ও তাঁর রাষ্ট্রপ্রধান নেতাজি মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট পরমাণু বোমা বিধ্বস্ত জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে মিত্রশক্তি ব্রিটিশ ও আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১৭ আগস্ট ভিয়েতনামের সায়গনে নেতাজিকে প্রকাশ্যে বিমান থেকে অবতরণের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। বিমানের সিঁড়ি থেকে তিনি অভিবাদন জানাচ্ছেন বিমানবন্দরে উপস্থিত ব্যক্তিদের এমন একটি ‘সর্বশেষ’ ছবি বহুল প্রচারিত। এমনকী ওই তারিখে স্বাক্ষরিত যুদ্ধক্ষেত্রে নেতাজির একটি ছবিও রেখে যান তিনি। সবটাই সচেতন উদ্দেশ্যে করেছিলেন তিনি ঠিক যেমনভাবে যুদ্ধসংক্রান্ত নানা নথিপত্র পুড়িয়ে ধ্বংস করা হলেও জাপান সরকার নেতাজির (আনুমানিক একটি কোড ‘টি’ ব্যবহার করা হয়েছে) তথাকথিত দেহ, ভস্ম ইত্যাদি ধোঁয়াশা সৃষ্টিকারী ‘গোপন’ ফাইল। না পুড়িয়ে প্রকাশ্যেই রেখে দিলেন যাতে ব্রিটিশ কিংবা মার্কিন সেনা-গোয়েন্দারা অতি সহজেই সেই ফাইলের নাগাল পায় এবং বিমান দুর্ঘটনায় ‘টি’ ব্যক্তির অকাল মৃত্যুর সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল জাপ গোয়েন্দা সংস্থা হিকারি কিকানের সঙ্গে নেতাজির এক গোপন বোঝাপড়ার প্লট। ইঙ্গ-মার্কিন গোয়েন্দা দল সাময়িক বিভ্রান্ত হলেও বিভ্রম কাটতে বিলম্ব হয়নি। ততদিনে নেতাজি ঘাতক ও বিশ্বাসঘাতকদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করছেন।
ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির অগোচরে সুভাষচন্দ্রের সখ্যতা ও বোঝাপড়া ক্রমশ গভীর হতে চলেছিল। অন্যদিকে ১৯৪৫-এর এপ্রিলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতি সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়েছিলেন নেতাজি। জাপানের গোয়েন্দা সংস্থা ‘হিকারি কিকানে’-র কোনও কোনও অধিকারিকের সঙ্গে সোভিয়েত-এ অন্তর্ধানের পরিকল্পনা কলকাতার বাড়ি থেকে রহস্যময় গৃহত্যাগের মতোই নিখুঁত ও নিভৃত পথেই এগতে থাকে। ব্রিটিশমুক্ত ভারত ভাবনায় নেতাজির বৈপ্লবিক বন্ধুসন্ধানের ঝুঁকি নিজেকেই নিতে হতো। ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে আগস্ট মাস বিপ্লবের মাস আর নেতাজির জীবনেও ব্যস্ততম আগস্ট তাঁকে বিপ্লব সাধনার অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা আজ শুধু হিমশৈলের চূড়ার মতোই দৃশ্যমান।
তিনি জানতেন ইঙ্গ-মার্কিন সেনা যে কোনও সময়ে সিঙ্গাপুরে ঢুকতে পারে। অতিদ্রুত তাঁর শিলান্যাস করা আজাদ হিন্দের শহিদ স্মারক বেদি সম্পূর্ণ করা হয়। ১৫ আগস্ট বার্তা দিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী ভারতীয় ও সহযোদ্ধাদের প্রতি। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মনোবল বজায় রাখতে অনুরোধ করেন। বিশেষ নির্দেশনামায় তিনি এমনটাও লিখেছেন— ‘...দুনিয়ার এমন কোনও শক্তি নেই যা ভারতবর্ষকে পদানত করে রাখতে পারে। ভারতবর্ষ স্বাধীন হবেই হবে। সেদিন দূরে নয় ‘জয়হিন্দ’।’ ওই ১৫ আগস্টেই তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের অফিসার ও সৈনিকদের প্রতি বিশেষ ঘোষণায় লিখলেন ‘...কমরেড বৃন্দ, আমি অনুভব করছি যে এই সঙ্কট মুহূর্তে ৩৮ কোটি ভারতবাসী আমাদের দিকে, ভারতের মুক্তিসেনাদের পানে তাকিয়ে আছে। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ ভারতবর্ষের প্রতি আপনাদের আনুগত্য যেন অক্ষত থাকে, ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ যে দেশের মুক্তিতে, সেই বিশ্বাস যেন আপনাদের অটুট থাকে। দিল্লির অভিমুখে যাত্রার পথ অনেক আছে এবং এখনও দিল্লিই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের অমর সহযোদ্ধাদের প্রাণ বিসর্জন ও আপনাদের সকলের ত্যাগ আমাদের সংগ্রামকে অবশ্যই সাফল্যমণ্ডিত করবে। পৃথিবীতে এমন কোনও শক্তি নেই যা ভারতবর্ষকে চিরদাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতে পারে। ভারতবর্ষ স্বাধীন হবে এবং সেই দিন আসন্ন ‘জয়হিন্দ’।’ পরের দিন আজাদ হিন্দ-এর রাষ্ট্রপ্রধান নির্দেশনামায় জানালেন সিঙ্গাপুরের (সিওনান) থেকে তাঁর অনুপস্থিতির সময়ে অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবেন মেজর জেনারেল এম. জেড. কিয়ানি। তিন লাইনের এই অর্থবহ পত্রের মতোই ওইদিন বিকেল চারটের সময় তাঁর
কনফিডেনসিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও স্টেনোগ্রাফার ভাস্করণকে তাঁর অজ্ঞাত অভিযাত্রার (অ্যাডভেঞ্চার টু আননোন) বিষয়ে একটি চিঠির ডিকটেশন লেখান নেতাজি। জন থিবির উদ্দেশে লেখা চিঠির একটি লাইন ছিল এমন ধারার— ‘এক দীর্ঘ বিমানযাত্রার প্রাক্কালে তোমাকে এ চিঠি লিখছি, কে জানে যে এক দুর্ঘটনায় পড়ব না!’ জীবন সায়াহ্নে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে মুখার্জি কমিশনে প্রবীণ ভাষ্করণ জানিয়েছিলেন, এপ্রিল মাস থেকেই জাপ জেনারেল ইসোদা-এর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘরে মাঞ্চুরিয়া হয়ে রাশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ১৬ আগস্ট ভোর চারটের সময় ‘অজ্ঞাত অভিযাত্রা’র চিঠির ডিকটেশন দেন নেতাজি। নাটকের পটভূমি ও ধোঁয়াশা সৃষ্টির সূচনা এই পর্বেই শুরু হয়ে যায়। কারণ ‘প্রত্যক্ষদর্শী’দের অপ্রত্যক্ষ নানা বক্তব্য। সময়ের নানা অল্পস্বল্প দু’ তিন ঘণ্টার অসঙ্গতিকে ঘটনা বিশ্লেষণের প্রয়োজনে মেনে নিয়ে সরলীকরণ করলে যে বিষয়টি উঠে আসে তা হল, ওই দিন সকাল ১০.৩০-এ কিছু সরকারি অফিসার ও সেনা অফিসারকে নিয়ে নেতাজি সিঙ্গাপুর ছেড়ে ব্যাংককে পৌঁছন জাপানি বোমারু বিমানে করে বেলা ৩.৩০ মিনিটে। অন্তর্ধান, বিমান দুর্ঘটনা, চিতাভস্ম ও সম্ভাব্য সাক্ষীদের সাজানো বয়ান-এর চিত্রনাট্যের চূড়ান্ত রূপদান ব্যাংককের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে স্থির হয় এবং ভিয়েতনামের সায়গন (বর্তমান নাম হো-চি-মিন সিটি) এর মাটিতেই সূচনা হয় তাঁর ‘অজ্ঞাত অভিযাত্রা’র প্রস্তুতি। এ বিষয়ে নানা তথ্য নানা সূত্রে উঠে এসেছে, উঠে আসছে। সাংহাই, হারবিন, চীনের ইউনান প্রদেশ, উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের কয়েকটি সেই সময়ের নাম যেমন দালাত, হ্যানয় কিংবা সাবমেরিনে সায়গন সমুদ্রপথে সোভিয়েতের ব্লাডিভস্তক বন্দর দিয়ে দমন চলে যাওয়া, জিপ গাড়িতে রুশ অধিকৃত মাঞ্চুরিয়াতে প্রবেশ, দাইরেনের হোটেল মতান্তরে সেনা ছাউনিতে রাত্রিবাস, নির্বাচিত আজাদি সহযোদ্ধাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো রহস্যময়, ইঙ্গিতপূর্ণ পরম্পরাগুলি উন্মোচন করলে প্রতিবেদনের এ পর্ব অতি দীর্ঘ হয়ে উঠতে পারে, ঘটতে পারে ধৈর্যচ্যুতি। শুধুমাত্র নেতাজির অন্তর্ধানের সাজানো ভস্ম পর্বের প্রাসঙ্গিক পর্যায়গুলি স্বীকৃত তথ্যের আলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্টের বহু চর্চিত তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিগত, প্রতিষ্ঠানগত, সরকারিভাবে প্রায় একডজন তদন্ত কমিটি, কমিশন হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, কোনও রিপোর্টে সাজানো সাক্ষীদের বক্তব্যকে ধ্রুবসত্য মনে করা হয়েছে কোথাও বা বলা হয়েছে ‘মাস্টার ডিসেপশন প্ল্যান অব বোস।’ সুভাষ বোসের অসাধারণ পরিকল্পনা যা ইঙ্গ-মার্কিন গোয়েন্দাকুল প্রথমদিকে ধরতে না পারলেও পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট দল শুধুই আফশোস করেছে। তাদের সমস্তরকম এজেন্সির মাধ্যমে সম্ভাব্য সর্বত্র নজরদারি চালিয়ে যেতে হয়েছে অক্ষশক্তির এই নিখোঁজ সেনা সর্বাধিনায়কের জন্য।
আজাদ হিন্দ-এর প্রচার সচিব এস এ আয়ার জানিয়েছেন যে, তাঁরা ২২ আগস্ট জাপ সেনা অফিসারের কাছে প্রথম জানতে পারেন ‘নেতাজি বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন!’ নেতাজির মৃতদেহ দর্শন না করেই এবং ভেঙে পড়া বিমানে নেতাজির সহযাত্রী ‘আহত’ কর্নেল হবিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করেই একটি খবরের খসড়া প্রস্তুত করার জন্য তাকে বলা হয় এবং ঘোষণার আগে চূড়ান্ত খসড়া আয়ারকে দেখিয়ে নেওয়া হবে। আয়ার জানিয়েছিলেন, ঘটনার চারদিন বাদে প্রচারিত এ সংবাদ বিশ্বাস করানো কঠিন হবে। এই আয়ারই পরবর্তীকালে জওহরলাল নেহরুর ঘনিষ্ট হয়েছিলেন, পেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের এক উচ্চ পদ এবং তখন থেকেই নেতাজির ‘চিতাভস্ম’ প্রতিষ্ঠার কারিগর হয়ে উঠেছিলেন। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
২৩ আগস্ট ডোমেই নিউজ এজেন্সি জানায় ১৮ আগস্ট তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্র বসু নিহত। ওই ২৩ তারিখের ডেটলাইনেই লন্ডনের সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার’ বিশ্ববাসীকে জানায় সুভাষ বোসের মৃত্যু সংবাদ। পৃথিবীর নানা সংবাদ পত্র ও ভারতের কাগজগুলিতেও এই মর্মে খবর ছড়িয়ে যায়। ভারত জুড়ে স্বাভাবিকভাবেই শোকসভার ঝড় বয়ে যায়। আজও আন্তর্জাল জগতে অনুসন্ধান করলে জানতে পারা যায় ১৮ আগস্ট ১৯৪৫, বেলা ২টোর সময় জাপ সেনার Mitsubishi Ki-21 (Sally) মডেলের বিমানটি তাইহোকু (তাইপে, বর্তমান নাম) বিমান বন্দর থেকে ওড়ার সময় ভেঙে পড়ে ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে। চিফ পাইলট, কো-পাইলট, জাপানি জেনারেল শিদেয়ি ও সুভাষচন্দ্র বসু আগুনে পুড়ে যান এবং হাসপাতালে মারা যান। ১২ থেকে ১৩ জন ব্যক্তি ওই বিমানে ছিলেন।
নেতাজিকে বিমানে সদ্য রুশ অধিকৃত মাঞ্চুরিয়াতে পৌঁছে দিতে গেলে চিফ পাইলট, কো পাইলট ও মাঞ্চুরিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ জাপানি জেনারেল শিদেয়ির প্রয়োজন। নেতাজির সঙ্গে তাঁরাও ‘মৃত’ বলে ঘোষিত হয়ে গেলেন বটে কিন্তু শ্মশানের খাতায় তাঁদের হদিশ মিলল না। একজনেরও না। তাইহোকু মিউনিসিপ্যালিটিতে সযত্নে রক্ষিত ২৫ পাতার ডেথ রেজিস্টার যেখানে শেষকৃত্যের অনুমতিপত্র লিপিবদ্ধ আছে তার কপি নেতাজি তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান মনোজকুমার মুখার্জি কলকাতার অফিসে নিয়ে আসেন। সেখানে ১৭ থেকে ২৭ আগস্টের মধ্যে ২৭৩ জন (১৬৫ পুরুষ/ ১০৮ নারী) দাহ কিংবা সমাধি দেওয়া ব্যক্তিদের নামধাম পেশা ইত্যাদির বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। এমনকী জাপানি, চীনা, ব্রিটিশ নাগরিকত্ব উল্লেখ করা আছে। আশ্চর্যের বিষয় ১৮ আগস্ট কোনও সামরিক ব্যক্তির নাম লিপিবদ্ধ নেই। পরের দিন ১৯ আগস্ট ইচিরো অকুরা নামের জনৈক জাপানি সেনার মৃত্যু ঘটেছে হার্ট ফেল করে। তাঁর ডেথ রেজিস্টার সিরিয়াল নম্বর ২৬৪১। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস/‘চন্দ্রবোস’, পাইলট টাকিজায়ো, কো-পাইলট আওযোগি কিংবা জেনারেল শিদেয়ির নাম নেই। তাঁদের আহত কিংবা নিহত অবস্থার শনাক্তকরণের কোনও ছবির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
প্রকাশিত তাইওয়ান সরকারের তদন্তে জানানো হয়েছে, ওই বছর ১৪ আগস্ট থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনও বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাইপের মেয়রও মুখার্জি কমিশনে এই মর্মে জানিয়েছেন। অর্থাৎ ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এ পৃথিবীর কোনও প্রান্তে কোনও সামরিক ও অসামরিক বিমান ভেঙে পড়েনি। তবু আজও কেন্দ্রীয় সরকার এবং দাবিদার পরিবারের একাংশ ‘দাবি’ করে যান, গণমাধ্যমে ঢক্কানিনাদ করে নেতাজির তথাকথিত ও কষ্টকল্পিত বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বকে সামনে রেখে রেনকোজির চিতাভস্ম ফিরিয়ে আনার। বিশেষত নেতাজির মেজদাদা শরৎচন্দ্র বসুর তৃতীয় প্রজন্মের লোকজন যাঁরা একদা তাঁদের পিতা-পিতামহদের মতোই বিশ্বাস করতেন, আস্থা রাখতেন চিতাভস্মের গল্প, বিমান দুর্ঘটনা সাজানো— তাঁরাই অদৃশ্য কারণে রাতারাতি বিস্ময়করভাবে চিতাভস্মপন্থী হয়ে উঠেছেন।
ব্যাংককের মাটিতে ইঙ্গ-মার্কিন গোয়েন্দা সেনারা হিকারি কিকানের দপ্তরে প্রবেশ করে সহজেই চারটে সাংকেতিক টেলিগ্রাম খুঁজে পেয়ে গেল। প্রথম সাংকেতিক বার্তাটি ১৮ আগস্টের, অথচ ভিতরে লেখা আজ ১৭ আগস্ট পাঁচটায় T (সম্ভবত নেতাজির কোনও নাম দেওয়া হয়েছে যা সহজেই ডি-কোড করা সম্ভব)-এর সঙ্গে জেনারেল শিদেয়ি ও অন্যরা টোকিও যাত্রা করেছেন ফরমোজা ও দাইরেন হয়ে। ভারতীয় সম্প্রদায়কে এটা জানানো হোক। আশ্চর্যজনক যে ১৮ তারিখের বার্তায় (সিগন্যাল) লেখা হচ্ছে আজ ১৭ আগস্ট। এর পরের বার্তার তারিখ ২০ আগস্ট। বলা হয়েছে ১৮ আগস্ট রাজধানীতে যাওয়ার পথে তাইহোকুতে বেলা দুটোতে আহত হয়ে ‘T’ মধ্যরাতে প্রাণ ত্যাগ করেন। তাঁর মরদেহ ফরমোজান সেনারা টোকিওতে প্লেনে করে নিয়ে চলেছেন। মৃত্যুর প্রমাণ, ধ্বংসাবশেষের ছবি ইত্যাদি সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। এমনকী এ বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তথাকথিত নেতাজির দেহ ও কফিন নাকি বড় হয়ে যাওয়ার জন্য প্লেনে তোলা সম্ভব হয়নি তাই তাইপেতেই শেষকৃত্য হয়েছিল। অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ী চিত্রনাট্য বদল হয়। ‘মৃতদেহের’ গোপনীয়তার নির্দেশ, একটিই মাত্র কারণ, সত্যি ফাঁস হয়ে যাবার সম্ভাবনা! মধ্যরাতে মৃত্যুর গল্প জেরার সামনে ‘প্রত্যক্ষদর্শী’-রা দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা, রাত ইত্যাদি নানা সময় বলে ফেলেছিলেন। বিমান ধ্বংসের পুরনো ছবি পরবর্তীকালে পেশ করে বলা হয় ১৮ আগস্টের। তিনটি ছবি যে আলাদা আলাদা দুর্ঘটনার তা ছবিতেই স্পষ্ট। একটি দেখা যাচ্ছে দূরে পাহাড়, আর একটিতে পাহাড়ের কাছে ধ্বংসাবশেষ। অন্যটি তো দেখে মনে হচ্ছে পাহাড়ের ওপরেই বিমান ভেঙে পড়েছিল। বস্তা বা কাপড় ঢাকা কোনও কিছুর ছবি দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় কোনও মৃতদেহের ছবি। সারা গায়ে ব্যান্ডেজ জড়ানো, শুধু চোখ নাক খোলা। চেয়ারে উপবিষ্ট জনৈক ব্যক্তির হাতে বা পাশে রাখা কোনও আধার রেখে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় নেতাজির ভস্মাধার হাতে সহযাত্রী ও সহযোদ্ধা কর্নেল হবিবুর রহমানের ছবি।
পঞ্চাশের দশকে নেহরুর আমলে গঠিত শাহনাওয়াজ কমিটি ও সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে ইন্দিরার জীবনীকার বিচারপতি জি ডি খোসলার নেতৃত্বে গঠিত খোসলা কমিশনে তৎকালীন সময়ের অনেকেই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন এবং এমন ধারা তথ্যপ্রমাণ পেশ করা হয়েছিল। শাহনাওয়াজ কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন নেতাজির সেজদাদা সুরেশচন্দ্র বসু। তিনি কমিটির বাকি দুই সদস্যের সঙ্গে বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্ব মেনে নিতে পারেননি। জওহরলাল চিঠি লিখে সুরেশবাবুকে জানান যে, নেতাজির মৃত্যুর কোনও প্রামাণ্য তথ্য তাঁর কাছে নেই। তবু জওহরলাল তাঁর মনোনীত ও মনোমতো শাহনাওয়াজ কমিটির রিপোর্ট সরকারিভাবে গ্রহণ করেন। সুরেশবাবু নিজ ব্যয়ে ‘ডিমেনসিয়েন্ট’ রিপোর্ট প্রকাশ করে দেশবাসীর কাছে আবেদন জানান, কেন তিনি শাহনাওয়াজ রিপোর্টে সহমত জানাতে পারেননি। আদৌ বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি তবুও জওহরলাল সরকার মিথ্যাচার করছেন তার তথ্য তুলে ধরেন। খোসলা কমিশনও একতরফাভাবে তথ্যপ্রমাণের গ্রহণযোগ্য বিচার বিশ্লেষণ না করেই সিদ্ধান্ত জানায়, তাইহোকু দুর্ঘটনায় নেতাজি মারা যান এবং যদি ওই ভস্ম নেতাজির হয় তাহলে ভারতে ফিরিয়ে আনা উচিত অর্থাৎ বিচারপতি ‘যদি ভস্ম নেতাজির হয়’ এমন সন্দেহ পোষণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। চিতাভস্ম থেকে দেহাস্থি পর্বে যাওয়ার আগে উল্লেখ করি, তিন নং সিগন্যাল যা হিকারি কিকানের অফিসে পৌঁছে ব্রিটিশ ইনটেলিজেন্সির টিম আবিষ্কার করেছিল। এটি পাঠানো হয়েছে ওসি মালয় শাখা, ওসি সায়গন এমবারকেশন পয়েন্ট চিফ অব স্টাফ, সাদার্ন আর্মি। পাঠানো হয়েছে ওসি হিকারি কিকান থেকে। বলা হচ্ছে ‘T’-এর মৃত্যু ভারতীয় সম্প্রদায়কে নিশ্চিত করা হোক এবং ডোমেই সংবাদ সংস্থাকে ‘T’-এর মৃত্যু সম্পর্কে খবরটি প্রকাশ করতে জানানো হোক। বার্তার তারিখ ২৪ আগস্ট ১৯৪৫। চতুর্থ বার্তাটি ২৭ তারিখের এবং এখানে বলা হয়েছে, পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে কর্নেল হবিবুর রহমানকে দ্রুত অবহিত করার অনুরোধ।
উল্লেখ্য, এই বার্তা চারটি ব্যাংককের জাপানি ইনটেলিজেন্স হিকারি কিকানের অফিসে সাধারণ ফাইলে, সঠিক জায়গায় নম্বর, ডকেট সহ রেখে দেওয়া হয় এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দারা সহজেই হস্তগত করে। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে পড়ে, যদিও পরবর্তীকালে বোসের পার্মানেন্ট ডেথ বা নিশ্চিত মৃত্যুর সন্ধানে একক ও যৌথভাবে একাধিক তদন্ত চালিয়েছে।
সেদিন ব্রিটিশের লর্ড ওয়াভেল বিশ্বাস করেননি, সন্দেহ প্রকাশ করেন বোসের দুর্ঘটনায় মৃত্যু। তেমনই মৃত্যুর কিছুদিন আগে ১৯৭৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটেনের তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার এন জি গোরেকে মাউন্টব্যাটেন এক পত্রে জানান যে, সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যুর কোনও সরকারি নথি তাঁর মহাফেজ খানায় নেই।
উল্লেখ্য, উক্ত চারটি বার্তায় বলা হয়েছে, জাপানের রাজধানী টোকিওতে ‘T’ যাচ্ছেন সপার্ষদ। এমনকী ‘T’ এর মৃতদেহ উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে টোকিওতে। সদ্য আত্মসমর্পণ করা জাপান তখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও পরাজিত। সেখানে নেতাজি তাঁর অফিসারদের নিয়ে যাবেন কেন? নেতাজির ঘনিষ্ঠ পার্ষদ হবিবুর রহমান বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু গল্পকে রূপ দিতে মিত্রশক্তির গোয়েন্দাদের কাছে নিখুঁত অভিনয়ের চেষ্টা করেছেন। কখনও বা তাদের বিভ্রান্তির মধ্যেও ফেলেছেন। আজাদ হিন্দের আনন্দমোহন সহায় খোসলা কমিশনে জানিয়েছিলেন, জুলাই মাস থেকেই নেতাজির নির্দেশে হ্যানয়ে অবস্থান করে সোভিয়েত ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। হো চি-মিনের সঙ্গেও বৈঠক চলে। ভারতীয়দের কাছ থেকে সংগৃহীত বিশাল পরিমাণ অর্থ পাঠানো হয় ব্যাংককে। এর আগে সাংহাই, ক্যানটন, টিনটয়, মাঞ্চুরিয়ার বিভিন্ন শহর, আইএনএও ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স লিগের সদর দপ্তর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সহায় আরও জানিয়েছিলেন, ২০ আগস্ট ১৯৪৫-এ আজাদ হিন্দ-এর গুলজারা সিং, প্রীতম সিং, আবিদ হাসান, দেবনাথ দাস, উত্তর ভিয়েতনামের হ্যানয়ের বাড়িতে সাক্ষাৎ করেন। সরকার সেখানে স্বাধীনতা দিয়েছিল, তাঁদের চীনে চলে যাওয়ার ব্যাপারেও কোনও আপত্তি ছিল না। হ্যানয়ে বসে নেতাজির মৃত্যু সংবাদ শুনে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে নেতাজি তাঁর পরিকল্পনা মতোই এগিয়েছেন।
সেপ্টেম্বর মাসেই ব্রিটিশের দুটি গোয়েন্দা বাহিনী পাঠানো হয় দক্ষিণ এশিয়াতে সুভাষচন্দ্র বসুর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিয়ে।
দুই ব্রিটিশ অফিসারের তত্ত্বাবধানে বঙ্গ সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাংককে যায় কথিত দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্রের মৃত্যুর ব্যাপারে তদন্ত করতে। খোসলা কমিশনের প্রসিডিংস সূত্রে জানা যায়, বাংলার গোয়েন্দা শাখার শশধর মজুমদার, হিমাংশু রায়, কালীপদ দে ও অন্য সদস্যরা জানান, গ্রেপ্তার করা দূর অস্ত, তাঁরা সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যুর সরাসরি কোনও প্রমাণ পাননি।
চিতাভস্মপন্থীদের অত্যন্ত প্রিয় ও চর্চিত ব্রিটিশ লেঃ কর্নেল জে. জি ফিগেস-এর প্রায় সাড়ে তিন পৃষ্ঠার এক রিপোর্ট। ১৯৪৬-এর ১৬ মে থেকে ২৫ জুলাই-এর মধ্যে প্রস্তুত করা তদন্ত রিপোর্টটি মাত্র ছ’জন জাপানি আর্মি অফিসারের সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যের ওপর রচিত। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভেঙে পড়া বিমানে নেতাজির সহযাত্রী ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন, কেউ বা হাসপাতালে নেতাজির চিকিৎসা কার্যেও ছিলেন বলে দাবি করেন। ফিগেস-এর মূল বক্তব্য যে, ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এ তাইহোকু মিলিটারি হাসপাতালে নানমোন ওয়ার্ডে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটার মধ্যে আহত সুভাষচন্দ্র বসু প্রাণ ত্যাগ করেন। তাঁর দাবি, সাক্ষীরা একে অপরের সঙ্গে জেরার সময় আলোচনা করার সুযোগ পাননি।
প্রথম সাক্ষী লেঃ কর্নেল নোনাগাকি জানান, ওই প্লেনের মডেল ছিল ‘K.21 হেভি বোম্বার (স্যালি)’, প্লেনের কে কোথায় ছিলেন রীতিমতো স্কেচ এঁকে বুঝিয়েছেন। তিনি জানান, যাঁরা দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক মারা যান তাঁরা হলেন তিনজন ইঞ্জিনিয়ার (নাম অজ্ঞাত), ওয়ারলেস অপারেটর (নাম জানাতে পারেননি), মেজর টাকিজাওয়া, লেঃ জেনারেল শিদেয়ি। যাঁরা গুরুতর আহত হন তাঁরা হলেন, আয়োগি (পাইলট), মেজর কোনো, সুভাষচন্দ্র বসু। যে দু’জন অল্প আহত হন তাঁরা হলেন হবিবুর রহমান (ব্যক্তিগত পার্ষদ), লেঃ কর্নেল মাকাই। প্রথম থেকেই বিভ্রান্ত করতে ‘প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী’রা নানা সময় নানা বক্তব্য রেখেছেন। মাউন্টব্যাটেন আস্থা রাখতে পারেননি কারও রিপোর্টেই তা পরবর্তীকালে স্পষ্ট।
একের পর এক তদন্ত কমিটি কিংবা কমিশন হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা নানা সময় নানা কথা বলেছেন। নেতাজির শেষ যাত্রার একমাত্র ভারতীয় সঙ্গী হিসেবে কথিত হবিবুর রহমান নানা সময়ে নানা কথা বলে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করেছেন। কখনও বা মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তিনিই যখন নেতাজির দেশে যুদ্ধপরবর্তীকালে ঠাঁই পেলেন না পাকিস্তানে ১৯৫৩ সালে সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছিলেন, নেতাজি কিংবা তিনি আদৌ কোনও বিমান দুর্ঘটনায় পড়েননি এবং নেতাজি মারা যাননি।
ফিগেস রিপোর্ট এবং ১৯ অক্টোবর ১৯৪৬-এ MI2 (মিলিটারি ইনটেলিজেন্স-2) এর দেওয়া তদন্ত রিপোর্টের কিছু মৌলিক পার্থক্য উল্লেখ করছি। ফিগেস রিপোর্টে নেতাজির নাকি চিকিৎসা করেছিলেন ডাঃ সুরুতা, একটি ক্যামফর ইনজেকশন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোগী কোমায় চলে যায় এবং কিছু পরেই মৃত্যু ঘটে। ব্রিটিশ মহাফেজখানায় রক্ষিত MI2 রিপোর্ট-এ উল্লেখ করা হয়েছে, নেতাজির চিকিৎসা করেন ডাঃ ইয়োশিমি। তিনি জানান, পোড়া ক্ষতস্থানগুলি তেল দিয়ে পরিষ্কার করে দেওয়া হয় ও ড্রেসিং করা হয়। ইনজেকশন দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। ফিগেস রিপোর্টে বলা হয়েছে, মৃত্যুর সময় সন্ধ্যা সাতটার কিছু পরেই এবং ডেথ সার্টিফিকেট লেখেন ডাঃ সুরুতা। তিনি নেতাজিকে সহজেই শনাক্ত করেন। কারণ বোসকে একটি বিশেষ গাড়িতে আনা হয়। MI2-এর বক্তব্য, ডেথ সার্টিফিকেট লেখেন ডাঃ ইয়োশিমি। শনাক্তকরণের প্রশ্নে তিনি জানান, নেতাজিকে তিনি চিনতেন না। একটি ট্রাকে করে অনেকগুলি পোড়া দেহ হাসপাতালে এনে বলা হয় যে একটি বিমান দুর্ঘটনায় অনেকগুলি মানুষ পুড়ে গেছে তাঁদের মধ্যে দু’জন ভারতীয় আর ৫ কি ৬ জন জাপানি। একজন অফিসার জানালেন, এই দুই ভারতীয়র মধ্যে একজন চন্দ্র বোস তাঁকে যেন বিশেষভাবে দেখাশোনা করা হয় এবং বিশেষ যত্নসহকারে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
এমনধারা নানা নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে সম্পূর্ণ একটি নতুন বিষয় প্রতিবেদকের নজরে আসে। যে বিষয়টি নানা কমিটি ও কমিশনে উহ্য থেকেছে। সেটি হল জাপ সরকারের প্রদত্ত একটি অন্তর্বর্তী রিপোর্ট ১৯৪৫ সালের ও তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট ১৯৫৬ সালের। উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখ করা হয়েছে তাইহোকুতে ভেঙে পড়া বিমানটির মডেল ছিল হেভিবোম্বার, টাইপ-2, রি-মডেল-৯৭। আশ্চর্যের বিষয় বিশ্বব্যাপী প্রচারিত ও ফিগেস রিপোর্টে বিমানের যাত্রী বলে কথিত লেঃ কর্নেল নোনাগাকি বর্ণিত মিৎসুবিসি Ki-21 হেভিবোম্বার (স্যালি) নয়। ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে ১৯৪৫ সালেই মিৎসুবিসি Ki-21 অবসর নেয়। যদিও মাস উল্লেখ করা হয়নি। জাপানের মিলিটারি হিস্ট্রিতে দেখা যাচ্ছে— ‘Mitsubishi Ki-21-la (Army Type 97 Heavy Bomber Model 1A), Code name ‘‘Sally’’ in Flight.’ অর্থাৎ ‘স্যালি’ যুদ্ধ বিমানের কোড নাম হলেও কোনও মডেলই তথাকথিত তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনার দিনে বর্ণিত স্যালি মডেল নয়। আশ্চর্যের বিষয়, বহু বছর বাদে ষাট দশকের প্রথম দিকে উত্তরবঙ্গের শৌলমারি আশ্রমের প্রধান সন্ন্যাসী স্বামী সারদানন্দ বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স-এর একদা বিপ্লবী মেজর সত্যভূষণ গুপ্ত ও ক্যাপ্টেন বিশ্বজিৎ দত্তকে তাঁর আশ্রম কক্ষে কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় ভেঙে পড়া বিমানটি নাকি দু’দিন পর অন্যত্র উড়তে দেখা গিয়েছিল। প্রতিবেদককে প্রয়াত বিশ্বজিৎ দত্ত বলেছিলেন যে, সন্ন্যাসী সারদানন্দজি বলেন, সেদিনের লগবুক পরীক্ষা করলেই জানা যাবে আদৌ সে প্লেন সেদিন আকাশে ওড়েনি।
তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরেই কর্নেল ফিনের অধীনে গোয়েন্দা দল নেতাজি অনুসন্ধানে নেমে পড়েন। তিনি রিপোর্টে উল্লেখ করেন, সরকারের আবারও তদন্ত করা দরকার যে মিঃ বোসের মৃত্যু স্থায়ী (পার্মানেন্ট) কি না। অর্থাৎ ‘অস্থায়ী মৃত্যুর’ ভাবনাও মিঃ ফিনে ভেবেছিলেন। নেপথ্য কারণটি উল্লেখ করি। তিনি ছিলেন ডিরেক্টর ব্রিটিশ ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর এবং টোকিওর ম্যাক আর্থার-এর অ্যাটাসে। তিনি একটি জরুরি বার্তা পাঠান ব্যাংকক থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে। ‘১২ নভেম্বর ১৯৪৫-এ হিকারি কিকানের দোভাষী জনৈক কে. ওয়াটানাবেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারেন যে ১৬ অথবা ১৭ আগস্ট ১৯৪৫, ইসোদার বাড়িতে দোভাষীর কাজ করার জন্য বলা হয়। ইসোদার মিটিং-এ সুভাষচন্দ্র বসু ও তাঁর সঙ্গী হিসেবে মেজর ভোঁসলে এবং লেঃ কর্নেল হবিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। ওয়াটানাবে যখন ইসোদার বাড়িতে পৌঁছান তখন মিটিং শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি জানান। ইসোদা দোভাষী ছাড়াই কথাবার্তা বলেন। তাঁদের আলোচ্য ছিল বোসকে কীভাবে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া যায়। কমবেশি জানা ব্যাপার যে বোস রাশিয়া যাবেন, সম্ভবত এটি মাঞ্চুরিয়া হবে।’
খোসলা কমিশনে পেশ করা নথি সূত্রে জানা যায়, মিঃ ফিনে উচ্চতম কর্তৃপক্ষকে এই মর্মে বার্তা পাঠান, ‘এটা বোঝা যাচ্ছে যে মিঃ বোস দূতাবাস ও হিকারি কিকানের মধ্যে বোঝাপড়া করেই স্বেচ্ছায় রাশিয়া গেছেন।’ এরপর ইনটেলিজেন্স টিম নতুন করে জেনারেল ভোঁসলেকে জেরা শুরু করে। ‘যেটা আমরা আশঙ্কা করছিলাম সেটাই ঘটেছে। ভোঁসলে স্বীকার করেছেন যে তিনি, হবিবুর রহমান, লেঃ কর্নেল ইসোদা এবং কর্ণোল কাগাওয়া বোসের সঙ্গে মিটিং-এ ছিলেন। এও স্বীকার করেছেন বোসকে কীভাবে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া যায় সেই নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তিনি আরও স্বীকার করেন যে বোসের গন্তব্য ছিল রাশিয়া...কিন্তু মনে হয়েছে তিনি (ভোঁসলে) এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানাতে ইচ্ছুক নন। প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছেন, শুধু জানিয়েছেন, যদি কোনও তাঁর বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি কিছু জেনে থাকেন নেতাজির প্রকৃত পরিকল্পনার বিষয়ে সেই ব্যক্তি এখন কিছুই বলবেন না।’ সম্পূর্ণ পরিকল্পনা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে করা হয়েছে এমনকী ক্যাবিনেট সদস্যরাও তাঁর ‘শেষ বিমান যাত্রা’ সম্পর্কে জানেন না, ব্যতিক্রম একমাত্র হবিবুর রহমান। বহু সাক্ষীই জানিয়েছেন যে, নেতাজির এমন পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত গোপন প্রকৃতির। আজাদ হিন্দ সরকারের প্রচারমন্ত্রী এস এ আয়ার সেই সময় স্বীকার করেছিলেন নেতাজি তাঁর পরিকল্পনা বিষয়ে খুবই সংযত থাকতেন। তাঁকেও জাপানি সরকারের সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে সে ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি বলে মনে করেননি। আয়ার আরও বলেছেন, ‘বেশিরভাগ ক্যাবিনেট মন্ত্রী ভিতরেরর পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।’
১৯৪১ সালে নেতাজি যখন গৃহত্যাগ করে ছদ্মনামে ও ছদ্মবেশে ভারত ত্যাগ করেন তখন দিশাহীন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা প্রকৃত সত্য প্রকাশের ভাবনায় কিছুদিন পরেই রটিয়ে দিয়েছিল যে, ঝরিয়ার কাছে সুভাষ বসু ধরা পড়েছেন। পরে প্রমাণিত হয় এটি ছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের এক ব্যর্থ চাল। অন্যদিকে ১৯৪২ এর মার্চ ও ১৯৪৫-এর ফেব্রুয়ারি মাসে যথাক্রমে বিবিসি ও অস্ট্রেলিয়ার নক্স পত্রিকা জানায়, বিমান দুর্ঘটনায় ভারতীয় নেতা সুভাষচন্দ্র বসু নিহত হয়েছেন। বিমান দুর্ঘটনার সেই পুরাতন প্রচারে পথে আবারও নিরুদ্দেশের পথিক হলেন তিনি।
জনমতের বিপুল চাপে শাহনাওয়াজ কমিটি ও খোসলা কমিশন তৈরি হয়েছিল। উদ্দেশ্য পূর্বকল্পিত সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেওয়া হলেও সেই সময়কার জীবিত বেশ কিছু প্রধান সাক্ষীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, যাঁরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন। এমনই কিছু নাম হল— হবিবুর রহমান, নোনাগাকি, আরাই, কোনো, তাকাহাসি, সাকাই প্রমুখ। কয়েকটি মূল প্রশ্নে সাক্ষীদের পরস্পরের মধ্যে অসংখ্য অসঙ্গতি থেকে স্পষ্ট বলা যায় প্রকৃতপক্ষে কেউই কোনও ঘটনার আসল সাক্ষী নন, ভাষান্তরে আদৌ কোনও ঘটনাই ঘটেনি। সেই বিমানে যাত্রীরা কে কোথায় ছিলেন? —এ প্রশ্নের জবাবে স্কেচ এঁকে একেক জন একেকরকম বলেছেন, প্রায় কারও সঙ্গে কারওরই মিল নেই। অথচ তাঁরা নাকি একই বিমানের সহযাত্রী ছিলেন!
বিমানটি কত উঁচুতে উঠে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়? হবিবুর রহমান কখনও বলেছেন, একশো ফুট, কখনও দুশো থেকে তিনশো, পরে বলেন হাজার ফুটের বেশি। কেউ বলেছেন, সবে আকাশে উঠেছে, কেউ ষাট ফুট কোনও সহযাত্রী বলেছেন অন্তত ১৬০০ ফুট। অথচ প্রত্যেকেই সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তি। রানওয়ে থেকে কতদূরে বিমানটি ধ্বংস হয়? হবিব বলছেন, দেড় থেকে দুই মাইল দূরে ফাঁকা মাঠের মাঝখানে। কেউ বলছেন, ৩০০ ফুট, কেউ ৬০ ফুট কেউবা রানওয়ের ওপরেই, কেউ নিশ্চুপ!
বিমানে বিস্ফোরণের কোনও আওয়াজ শোনা গিয়েছিল কি?
হবিবুর বলছেন, হ্যাঁ, একবার কামানের গোলার মতো শব্দ।
আরাই বলছেন, পরপর দুটি বিস্ফোরণের শব্দ।
নোনাগাকি বলেন, তিন চারটি শব্দ, প্রথমটি খুব জোরে। তাকাহাসি বলেন, একটি শব্দ। সাকাই আদৌ বিস্ফোরণ শুনেছেন বলে উল্লেখ করেননি। বিমানটি কি দু’ টুকরো হয়েছিল পতনের পর? এমন প্রশ্নে হবিবুর, না। আরাই, হ্যাঁ (স্কেচ এঁকে বুঝিয়েছেন)।
নোনাগাকি, সাকাই, কোনো, আরাই এর মতো ‘হ্যাঁ’ বললেও তাকাহাসি দৃঢ়তার সঙ্গে হাবিবুরের মতোই বলেন, ‘না’।
এমন ভয়ঙ্কর বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রায় পরস্পর বিরোধী সাক্ষ্য কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? অথচ প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল, শাহনাওয়াজ, খোসলা এগুলি ছোটখাট অসঙ্গতি বলে দেশের মানুষের মনে নেতাজি বিমান দুর্ঘটনায় মৃত এমন সরকারি ভাষ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজেদের প্রয়োজনে। মুখার্জি কমিশন বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্ব বাতিল করলেও সে রিপোর্ট মনমোহন সরকার খারিজ করে দেয় ‘অসম্পূর্ণ’ রিপোর্ট বলে। বহাল রাখে নেহরু ও ইন্দিরা আমলের তদন্ত যথাক্রমে শাহনাওয়াজ কমিটি ও খোসলা কমিশন রিপোর্টগুলিকে। বর্তমান কেন্দ্রের মোদি সরকারও নেহরু-ইন্দিরা গান্ধীর প্রদর্শিত পথেই হেঁটে চলেছেন এ ব্যাপারে। ‘অসম্পূর্ণ’ মুখার্জি কমিশনের কাজকর্ম আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরের নিরপেক্ষ বিচারকদের দিয়ে সম্পূর্ণ করার নৈতিক দায়িত্ব পালনের দাবি এই প্রতিবেদক প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে জমা দিয়ে এলেও বছরের পর বছর কোনও উদ্যোগ কিংবা বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
আক্ষেপ থাক, ফিরে যাই নেতাজির সেই ‘মাস্টার ডিসেপশন প্ল্যান’-এ। নেতাজির নামে ভুয়ো মৃতদেহ, ভুয়ো ডেথ সার্টিফিকেট ও ভুয়ো ভস্ম সাজিয়ে নেতাজির বিমান দুর্ঘটনার আড়ালে অন্তর্ধানকে সার্থক করার মরিয়া প্রয়াস আজাদ হিন্দের প্রতি সহমর্মী এইসব জাপানি ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সেনা অফিসারদের কুর্নিশ জানাতে হয়।
ব্রিটিশের পয়লা নম্বর শত্রু সুভাষচন্দ্র বসু তাদের নাগালের বাইরে বেরিয়ে গেছেন। সুভাষচন্দ্র যখন ছদ্মবেশে কাবুলের পথে তখন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ওপর নির্দেশ ছিল সুভাষচন্দ্রকে গুলি করে হত্যা করার। সেদিন তারা ব্যর্থ হয়েছিল। নেতাজির বুদ্ধিমত্তার কাছে এবারেও তারা হেরে যায়। যদিও একদা ভুয়ো টেলিগ্রাম-এর বার্তা রটিয়ে প্রমাণের চেষ্টা হয় ব্রিটিশ ডেথ স্কোয়াড নাকি ১৭ আগস্ট ১৯৪৫-এ ব্যাংককে গুলি করে তারা হত্যা করেছে। সেই প্রচার প্রমাণের অভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সুভাষচন্দ্র ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির দুই সেনা প্রধান মাউন্টব্যাটেন ও ডগলাস ম্যাক আর্থার জানতে ও বুঝতে পেরেছিলেন তাঁদের ‘সুভাষ বোস’ আবার হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছেন। তাঁর ভারত প্রত্যাবর্তন যাতে স্বনামে না হয় সেইজন্য পরবর্তী ক্ষেত্রে নানা কৌশল অবলম্বন করে। তাঁরা যে সহজ সত্যটি সহজে অনুধাবন করেছিলেন ব্রিটিশ কমনওয়েল্থ-এর সদস্য রাষ্ট্র ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীরা বুঝতে চাননি।
একজন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে একই দিনে, একই সময়ে এবং একই কারণে হবে। কোনও ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে একই তারিখে দাহকার্য হবে এবং দাহকার্যের অনুমতিপত্র অথবা ডেথ সার্টিফিকেট একটিই হবে এবং তা মৃত ব্যক্তির নামেই হতে হবে। পৃথিবী সুদ্ধ এটাই নিয়ম যা আজও চলছে। কোনও ব্যক্তির দাহকার্য একটি মাত্র চুল্লিতেই হবে, একাধিক রকমের চুল্লিতে হতে পারে না। নেতাজির নামে যে চিতাভস্ম দশকের পর দশক ভারতবাসীর কাছে প্রচার করা হচ্ছে, ইদানীংকালে আবার ডিএনএ টেস্টের ধুয়ো তুলেছেন দাবিদার পরিবারের কেউ কেউ তা যে কতটা অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সেদিন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নয়, কার শেষ চিকিৎসা হয়েছিল তা তুলে ধরছি।
আগেই উল্লেখ করেছি তাইহোকুর ওই মিলিটারি হাসপাতালের ওয়ার্ডে কিংবা ডেথ রেজিস্টার থেকে স্পষ্ট ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এ কোনও দেশি বা বিদেশি সামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়নি। ১৯৫৬ সালে টোকিওর ভারতীয় দূতাবাসের ফার্ম সেক্রেটারি এ কে দার-কে জাপানের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটি পত্রে জানানো হয় যে, ‘ডাক্তারের রিপোর্ট, পুলিস রিপোর্ট বহু চেষ্টা করেও তাইপে (পূর্বতন তাইহোকু)-তে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ‘সৎকারের অনুমতিপত্র’-এর সার্টিফায়েড কপি তাইপে মিউনিসিপ্যাল অফিসের ব্যুরো অব হেলথ অ্যান্ড হাইজিন-এ সন্ধান পাওয়া গেছে। সেই নথিতে দেখা গেছে মৃত ব্যক্তির নাম ইচিরো অকুরা এবং আবেদন করেছেন তানিওশি ইয়োশিমি। যেহেতু সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু সেই সময় কঠোর গোপনীয় রাখা হয়েছিল তাই এটা বিশ্বাস করা যায় যে, ইচিরো অকুরার এই অনুমতিপত্র মৃত সুভাষচন্দ্র বসুর মামলার সঙ্গে মিলে যেতে পারে।’ আজব যুক্তি, আজব তথ্য। মৃত ইচিরো অকুরা-এর পেশা দেখানো হয়েছে এক অনিয়মিত সেনাকর্মী, বাইশ বছর বয়সে ১৯ আগস্ট ১৯৪৫-এ মারা যান, ২১ আগস্ট সৎকারের অনুমতি পান এবং ২২ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় সৎকার করা হয়। উল্লেখ্য, ওই ২২ আগস্ট আজাদ হিন্দের প্রচারমন্ত্রী আয়ারকে নেতাজির মৃত্যু সংবাদের খসড়া তৈরি করতে বলা হয়েছিল।
নেতাজির যদি সত্যিই বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটত তাহলে এত গোপনীয়তা কেন? জাপ সরকার মৃত নেতাজির দেহ, ছবি এবং প্রাসঙ্গিক সমস্ত তথ্যই বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে সত্য প্রমাণ করতেন। অহেতুক জাপান সরকারকে ব্রিটেন ও আমেরিকার গোয়েন্দাদের সন্দেহের তালিকায় থাকতে হতো না, এত জেরা এত তদন্তের প্রয়োজন পড়ত না, মৃতদেহের নিশ্চয় ভয় থাকত না গ্রেপ্তার হওয়ার। অন্তর্ধানের পটভূমি রচনার স্বার্থেই জাপানের এত গোপনীয়তা, হবিবুর রহমানদের এত নাটক করতে হয়েছিল। হবিবুর রহমান মৃতদেহের সৎকারের তারিখ জানিয়েছিলেন ২০ আগস্ট। সে সময় তিনদিন পর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্তিমকার্য হতো। নেতাজি বৌদ্ধ ছিলেন না তবুও নেতাজির নামে ভেবে নেওয়া কল্পিত ইচিরো আকুরার দেহ বৌদ্ধ ভাবনায় সৎকার পর্ব হল! এমন বিস্ময়, বিভ্রম, থ্রিলার ধর্মী রহস্য নেতাজির অন্তর্ধান পর্বকে সুনিশ্চিত করেছিল। পরবর্তীকালে সেই সাজানো প্লটকেই নেতাজির প্রকৃত সত্য আড়াল করতে তাঁরই বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে।
তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনার পরে পরেই নাকি যেসব প্রত্যক্ষদর্শী চিকিৎসকরা আহত দেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। প্রায় সবাই জানিয়েছিলেন নেতাজির নাকি সারা দেহ পুড়ে যাওয়ার কারণে চামড়া কালো হয়ে গেছিল। কিন্তু কেউই মৃতদেহের কোনও কাটা অংশ ও আঘাত চিহ্ন দেখতে পাননি। ব্যতিক্রম হবিবুর রহমানের বক্তব্য, তিনি বলেন, নেতাজির মাথায় চার ইঞ্চির কাটা দাগ ছিল এবং সেখান থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছিল।
আহত নেতাজির ঘরে আর কে ছিলেন? এ প্রশ্নের জবাবে উভয় ডাক্তার, ডাঃ ইয়োশিমি ও ডাঃ সুরুতা জানিয়েছিলেন, নেতাজি ও হবিবুরকে একই ঘরে রাখা হয়, তৃতীয় কোনও রোগী ছিলেন না। কর্নেল হবিবুর রহমানের মতে, নেতাজি, তিনি নিজে, একজন জাপানি, সম্ভবত পাইলট এক ঘরে ছিলেন। ঘরের চারটি বেডের চতুর্থটি খালিই ছিল। তাকাহাসি বলেছিলেন, নেতাজির অবস্থা খারাপ ছিল বলে তাঁকে একটি পৃথক ঘরে রাখা হয়। লেঃ কর্নেল নোনাগাকির বক্তব্য, তাঁর বেশ মনে আছে যে নেতাজি সমেত সব সবাইকেই একটি বড় ঘরে রাখা হয়— শুধু তিনি নিজে অন্যত্র ছিলেন। দোভাষী জে নাকামুরা জানান, যে ঘরটিতে তিনি নিজে ছিলেন সে ঘরে সর্বসমেত পাঁচটি বেড ছিল। নেতাজি ও হবিবুর ছাড়া অপর তিনটি বেডে ছিলেন তিনজন আহত জাপানি। কার কথা বিশ্বাসযোগ্য! এ দেশের প্রথম নেতাজি তদন্ত কমিটির প্রধান একদা আজাদ হিন্দের যোদ্ধা এবং হঠাৎই জওহরলাল অনুগত শাহনাওয়াজ খান প্রত্যক্ষদর্শীদের এহেন সাক্ষ্য সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ‘এগুলি সামান্য বিচ্যুতি এবং উপেক্ষণীয়’! তবে কোন ‘অসামান্য বিচ্যুতি’র কথা তিনি না জানালেও ‘অন্তিমক্ষণ’ কখন নেতাজির ঘনিয়ে এসেছিল সে সম্পর্কে সাজানো ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের’ সাক্ষ্য রীতিমতো অবিশ্বাস্য।
জনৈক ৩৩ বছরের সাচিনডো শিওন জাপ মেডিক্যাল বিভাগে কর্মরত, রাগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বোসের মৃত্যু সংবাদ জানার পরেও ফরমোজায় থাকা উচ্চপদস্থ জাপানি সেনা অফিসারদের হিমশীতল উদাসীন আচরণ, তাদের কোনও বিবৃতি না দেওয়া, এমনকী জরুরি টেলিফোন করা সত্ত্বেও কেউ হাসপাতালে আসার সৌজন্য প্রকাশ করেনি। বোসের জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তিনি জানতে পেরেছিলেন বলে দাবি করেন, অগ্নিদগ্ধ রোগী সাধারণত যন্ত্রণায় চিৎকার করেন। কিন্তু বোস শান্ত ছিলেন। তিনি তৃষ্ণার্ত ছিলেন এবং তাঁর ভারতীয় সহকারীর সঙ্গে কষ্ট সত্ত্বেও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেন। তারপর তিনি জাপানি দোভাষীকে একটি বার্তার বয়ান লেখান। দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান জাপানি আর্মি সেনানায়ক জেনারেল তেরাউচিকে ধন্যবাদ জানান সেই পত্রে। এরপর বোস তাঁর যন্ত্রণা কমানোর জন্য মরফিন ইঞ্জেকশন দিতে বলেন। জাপানি ডাক্তার সেই অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগের পরেই বোসের ব্যান্ডেজ বাঁধা শরীরে প্রচণ্ড কাঁপুনি শুরু হয় এবং তিনি মারা যান। ব্রিটিশ কর্নেল হিউটর তাঁর বইতে হবিবুর রহমানের বিবৃতি লিপিবদ্ধ করেন। নাটকীয় সংলাপটি ছিল নেতাজির ‘মৃত্যুর’ কয়েক মিনিট আগে।— ‘তিনি বললেন, ‘হাবিব’ আমি অনুভব করছি কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাব। শেষ পর্যন্ত আমি ভারতের মুক্তির জন্য লড়াই করেছি। দেশবাসীকে জানিও। অচিরেই ভারত স্বাধীন হবে। আজাদ হিন্দ জিন্দাবাদ।’
ডাঃ ইয়োশিমি, যিনি নেতাজির ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ লিখেছিলেন একাধিকবার, তিনি জানিয়েছিলেন ১৮ আগস্ট বেলা ৩টে নাগাদ চন্দ্র বোসকে হাসপাতালে আনা হয় এবং রাত ১০টায় মারা যান। তিনিই আবার ১৯৭১ সালে খোসলা কমিশনে জানিয়েছিলেন, ১৮ আগস্ট বেলা ১২টা নাগাদ আহত চন্দ্র বোসকে হাসপাতালে আনার পরও প্রায় ১২ ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন। অর্থাৎ রাত ১২টা সাড়ে বারোটা নাগাদ মারা যান। আর মুখার্জি কমিশনে লিখিতভাবে জানিয়েছেন ওই দিন রাত ১০টার কিছু আগে চন্দ্র বোস মারা যান। পাশের ঘরে থাকা মেজর তারাকোন সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ নেতাজির মৃত্যুর খবর পান। ২২ আগস্ট বেলা দুটোয় জাপানি গোয়েন্দা দপ্তর ফরমোজায় ঘোষণা করে ১৮ আগস্ট দুপুর দুটোর সময় বিমান ভেঙে পড়ে সেদিন রাত ১২টায় (অর্থাৎ ১৯ আগস্ট ০ ঘণ্টায়) শ্রী বোস মারা যান। হবিবুর রহমান বিভিন্ন জেরায় ‘মৃত্যুক্ষণ’ নানা সময় জানালেও রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যেই ধরে নিতে হবে। নেতাজির ‘অন্তিম মুহূর্ত’ নিয়ে এত ঘণ্টার পার্থক্যে একটা সত্যই পরিষ্কার হয় যে কেউই প্রত্যক্ষদর্শী নন।
শেষ কৃত্যের সময় কর্নেল হবিবুর রহমান, অফিসার নাকামুরা, মেজর নাগাতোমা উপস্থিত ছিলেন বলে জানানো হয়েছিল। কত জন, কীসে করে কফিন বহন করে শ্মশানে আনা হয়েছিল সে নিয়ে যেমন বক্তব্যে বিস্তর পার্থক্য ছিল তেমনই উক্ত দুই জাপানি আর্মি অফিসারের আঁকা স্কেচে বিস্তর ফারাক। মেজর নাগাতোমা ছবি এঁকেছেন তিনটি ফার্নেস বা চুল্লির। অন্যদিকে নাকামুরা স্কেচে দেখিয়েছেন একটি মাত্র চুল্লির ছবি। বৌদ্ধরীতি অনুযায়ী চুল্লিতে প্রবেশ এবং দেহাবশেষ সংগ্রহ করা হয়।
হবিবুর রহমান জানিয়েছেন, অন্য দু’জনের মতো ২০ আগস্ট মৃতদেহ দাহ করার জন্য শ্মশানে যাননি। প্রথমে বলেছিলেন, ১৯ আগস্ট, পরে মত বদলে বলেন, ২১ আগস্ট দাহ করার জন্য শ্মশানে যান এবং শোনান আর একটি নতুন তথ্য আর্ন চীনা মাটির গোলাকার কলস-এ হবিবুর নাকি ভস্মের সঙ্গে একটুকরো সোনার পাতও তুলে রেখেছিলেন। তিনি জানান, নেতাজির সোনা বাঁধানো একটি দাঁত ছিল। হবিবুরের দুই কাঁধে ব্যান্ডেজ থাকায় আর্নটি গলায় স্লিং করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। নিকটবর্তী নিশি (পশ্চিম) হোনগানজি বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের হাতে ওই ভস্মাধার তুলে দেওয়া হয়। তিনি সেখানে আর একটি আর্ন রাখা আছে দেখতে পান এবং পুরোহিত বলেন, ওটি জেনারেল শিদেয়ির দেহবশেষ-এর জন্য।
কোনও পর্যায়েই শনাক্তকরণের উপযোগী ছবি তোলা হয়নি। কমিশনে দুটি ছবি পেশ করা হয়। সাদা কাপড়ের কোনও একটি পুঁটলিকে মৃতদেহ বলা হচ্ছে, তবে কার তা স্পষ্ট করা হয়নি। এমনকী মৃত ব্যক্তির হাত পা মুখ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আর একটি ছবিতে নাক চোখ বাদে সারা দেহই সাদা কাপড় ও ব্যান্ডেজ বাঁধা, গলায় সম্ভবত Urn ঝোলানো আছে। মুখটি চেনার উপায় নেই যে ইনিই সেই হবিবুর রহমান। একটি চারকোণা কিছুটা পোড়া, অক্ষত চামড়ার স্ট্রিপ যুক্ত ঘড়ির ছবিকে বলা হয় অগ্নিকাণ্ডের সময়ে নেতাজির হাতে থাকা সেই ঘড়ি! কলকাতার এক প্রদর্শনীতে সেই ঘড়ি এই প্রতিবেদকের চোখে পড়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় আজ পর্যন্ত নেতাজির হাতে ঘড়িযুক্ত যতগুলি ছবি দেখতে পাওয়া যায় কোথাও চৌকো নয়, গোল ঘড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে। যেখানে মৃতদেহের চামড়া পুড়ে কালো হয়ে যাওয়ার গল্প ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ চিকিৎসকরা বলেছেন, সেখানে চৌকা ঘড়ির বেল্ট অক্ষত থাকে কীভাবে? কম্বাইন্ড সার্ভিসেস ডিটেইলড ইনটারোগেশান সেন্টার (ইন্ডিয়া)-এর গোয়েন্দা বীরেন চক্রবর্তী ১৯৪৫-এর ডিসেম্বরে দিল্লির লালকেল্লায় কর্নেল হবিবুর রহমানকে জেরা করে রিপোর্টে স্পষ্টভাবে লেখেন, কাঠের বাক্সে বোসের দেহাবশেষ রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ হবিবুর এখানেও ব্রিটিশকে চতুরভাবে বিভ্রান্ত করেছেন। Urn-এর পরিবর্তে কাঠের বাক্স। এর পরের গল্প সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। ৫ সেপ্টেম্বর তাইপে (তাইহোকু) শহর থেকে রওনা দিয়ে সার্দার্ন আর্মি হেডকোয়ার্টারের লেঃ কর্নেল সাকাই, নেতাজির বিশ্বস্ত সহায়ক কর্নেল হবিবুর রহমান, হিকারি কিকানের সদস্য ও ফরমোজা আর্মি হেডকোয়ার্টারের ক্যাপ্টেন নাকামিয়া এবং লেঃ হায়াশিদা, জেনারেল স্টাফ, ফরমোজা আর্মি হেডকোয়ার্টারে এই পাঁচজন ফুকুওয়ার গাননোসুতে পৌঁছান সন্ধ্যাবেলায়। ওয়েস্টার্ন আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে মিলিটারি ট্রাকের ব্যবস্থা করা হয়। পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর হবিবুর রহমান ও ক্যাপ্টেন নাকামিয়া টোকিওর উদ্দেশে প্লেনে উড়ে যান। সাকাই, হায়াশিদা ও তিনজন সেনা ট্রেনে করে যাত্রা করেন টোকিওর পথে। পরদিন তারা ইম্পিরিয়াল জেনারেল হেড কোয়ার্টারে ডিউটি অফিসার মেজর কিনোশিতার হাতে চিতাভস্মাধার, কিছু জিনিস দুটি বাক্সে করে নিরাপদে রাখার জন্য দেন। বাক্স দুটি অর্পণের সংবাদ পরের দিন জাপ আর্মির পদাধিকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। টোকিওর ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্ট লিগের সভাপতি ও আয়ারকে আধ ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোনে ডেকে লেঃ কর্নেল তাকাকুরা চিতাভস্ম ও জিনিসগুলি দেন। আয়ার গ্রহণ করেন। এরপর টোকিওর রেনকোজি বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের হাতে তুলে দেওয়া হয় ওই চিতাভস্ম। কত তারিখে, কে বা কারা কী উদ্দেশে দিয়েছিলেন সেই নিয়েও অনেক পারস্পরিক অসঙ্গতি আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, নেতাজির বলে কথিত চিতাভস্ম বিসর্জন বা সমাধিস্থ দেওয়া সম্ভব না হলে কেন বৌদ্ধ মন্দিরে লুকিয়ে রাখতে হল! চিতাভস্মেরও কি কোর্টমার্শাল হওয়ার ভয় ছিল? টোকিও ও জাপানে একাধিক প্রাচীন হিন্দু মন্দির রয়েছে। ডাইশগুটিন (ইন্দ্র মন্দির), বরুণদেবের মন্দির, কামদেবের মন্দির, সূর্য মন্দির, গণেশ মন্দির ছিল। সুভাষচন্দ্র বসুর ‘ছাইভস্ম’ সেসব জায়গায় না নিয়ে গিয়ে বৌদ্ধ মন্দিরে! পুরোহিত জানতেন না চিনতেন না নেতাজিকে, এমনকী যাঁরা তাঁকে ওই ‘ভস্মাধার’ রাখতে দিয়েছিলেন তাঁরাও তাঁর পূর্ব পরিচিত ছিলেন। পুরোহিত নাকি নিরাপত্তার জন্য ওই চিতাভস্মাধারটি শোবার সময় নিজের বিছানায় নিয়ে রাখতেন রাত্রিবেলা। সেই চিতাভস্মের ছবি আধার সহ তুলে রাখা হল না কেন? জানা যায় গোয়েন্দারা হানা দিয়েছিল চিতাভস্মের সন্ধানে এবং শেষে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা জানায় ওই চিতাভস্ম বোসের নয়, সম্ভবত আদৌ মানুষের নাও হতে পারে। বোস অন্তর্ধান করলে এমনটাই করতেন বলে তারা গোপন রিপোর্টে লেখে।
‘মৃতদেহটির’ দাহ হয়েছিল ইচিরো অকুরার নামে। সরকারি সৎকার কেন্দ্রে অনুমতি পত্রে সেটাই লেখা হয়েছিল। ডেথ সার্টিফিকেটে কোথাও সেই সময় চন্দ্র বসু কিংবা সুভাষচন্দ্র বসুর নাম নেই। পরম আশ্চর্যের বিষয়, নতুন একটি ডেথ সার্টিফিকেটের ‘আবিষ্কার’ হয়েছিল মুখার্জি কমিশনের সময়। লিখেছেন, সেই ডাঃ ইয়োশিমি, যিনি ইচিরা অকুরার মৃতদেহ দাহের জন্য ‘সৎকারের অনুপত্রের’ আবেদন করেছিলেন। জাপানি ভাষায় লেখা ওই ডেথ সার্টিফিকেটটি চন্দ্র বসুর নামে বানানো ১৯৮৮ সালে! মৃত্যুর কারণ সারা দেহ পুড়ে যাওয়া, থার্ড ডিগ্রি বার্ন। মৃত্যুর তারিখ ১৮ আগস্ট ১৯৪৫, চিকিৎসা সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখা হয়েছে, প্লেনের যাত্রী চন্দ্র বসু তাইপের মাৎসুনহিয়ামা বিমান বন্দরে সকালবেলা ১৮. ৮. ১৯৪৫ অগ্নিদগ্ধ হন বিমান দুর্ঘটনার কারণে, সারা দেহ থার্ড ডিগ্রি বার্ন হয়। তৎক্ষণাৎ তাঁকে শাখা হাসপাতাল, সাউথগেট অব তাইপে মিলিটারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ব্যথা কমানোর ওষুধ, সালফা ড্রাগ মুখে, ড্রিপের দেওয়া হয় গুরুতর পোড়া ক্ষতের চিকিৎসার জন্য। হাসপাতালের পক্ষ থেকে সমস্তরকম চিকিৎসার চেষ্টা করা সত্ত্বেও ওই দিন রাত ১১টা নাগাদ চির ঘুমে তিনি চলে যান।
সার্টিফাই করা এই লেখার তলায় চিকিৎসক ডাঃ ইয়োশিমির নাম এবং তারিখ লেখা রয়েছে ১৩ আগস্ট ১৯৮৮। কোনও ভারতীয়ের অনুরোধে তিনি নাকি এমন কাণ্ড করেছিলেন। মুখার্জি কমিশনে ইয়োশিমি জানিয়েছিলেন, তিনি সুভাষচন্দ্র বসুকে চিনতেন না। আইনগতভাবে বিশুদ্ধ থাকার জন্যই এমন বক্তব্য সন্দেহ নেই।
ইচিরো অকুরার দেহাবশেষের আধারে এ দেশের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীরা ‘শ্রদ্ধা’ জানাতে যেতেন। নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধী নেতাজির বিমান দুর্ঘটনার গল্পে আস্থাশীল ছিলেন না, যদিও তাঁদের আমলেই ছাই তত্ত্বের সরকারি মান্যতা মিলেছিল। রেনকোজির ভিজিটরস খাতায় নেতাজির প্রতি নয়, বুদ্ধদেবের শান্তির বার্তার কথা লিখে এসেছিলেন। উল্লেখ্য, ইন্দিরার আমলেই দিল্লিতে নেতাজি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সরকারিভাবে পুড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করা হয় মুখার্জি কমিশনে। ওই কমিশন যখন চলছে তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি রেনকোজি মন্দিরে ‘নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধা’ জানিয়ে খাতায় যা লিখেছিলেন তা আজ প্রস্তর ফলকে লিখে রাখা হয়েছে।
ইংরেজ বিলম্বে বুঝতে পেরেছিল নেতাজি নাগালের বাইরে চলে গেছেন। তাঁদের আশা ছিল, জাপানের আর্মি সমর্পণের পর আজাদ হিন্দের সর্বাধিনায়ক ক্যাবিনেট সহ টোকিও, ব্যাংকক কিংবা সিঙ্গাপুরে আত্মসমর্পণ করবেন। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা নানা ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সাক্ষীদের বক্তব্যর উপর লেখা গোয়েন্দা রিপোর্টকে বিশ্বাস করতে শুরু করলেও কয়েকমাস পর থেকেই নানা অসঙ্গতি তাদের সামনে উঠে আসে।
সিঙ্গাপুরের ইনটেলিজেন্স ডিভিশনের মেজর কার্টনি ইয়ংকে নতুন দিল্লির ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান ম্যাকরাইট ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ সালে পাঁচ পৃষ্ঠার এক গোপন পত্রে বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে খুঁটিনাটি নানা গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতিগুলি তুলে এনেছেন। যেমন, যে প্লেন ভেঙে পড়ে চার থেকে পাঁচজন মারা গেছে বলা হচ্ছে (হবিবুর পাঁচজন বলেছেন) সেই একই প্লেনে চড়ে সাকাই এবং হবিবুর রহমান ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫- এ ফুকুওকা ভ্রমণ করলেন কীভাবে! ‘টি’ সিগন্যাল দেওয়া টেলিগ্রাম বার্তায় বলা হচ্ছে ভারতীয়দের অবহিত করতে বোস কোথায় যাচ্ছেন। কিন্তু এটা বোসের প্রথা ছিল না ভারতীয়দের তাঁর বিমান যাত্রা সম্পর্কে অবহিত করার ব্যাপারে। বোসের চিতাভস্মের ব্যাপারটি অস্পষ্ট— এ কথা বলেছেন ম্যাকরাইট। প্রশ্ন তুলেছেন, সার্দার্ন আর্মি স্টাফ টু-এর সিগন্যাল ৬৬, ২০ আগস্ট ১৯৪৫ উল্লেখ করা ‘তাঁর দেহ টোকিওতে ফরমোজার আর্মি প্লেনে করে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার বাক্য বন্ধ নিয়ে। যে ৬ নভেম্বর ১৯৪৬ এর রিপোর্ট-এ উল্লেখ করা হয়েছিল যে বোস তাঁর নির্বাচিত সহযোদ্ধাদের নিয়ে আত্মগোপন করতেন, জাপান সহায়তা করবে এ ব্যাপারে। এমন তথ্য ও চ্যাটার্জি ও তাঁর পার্টিকে জেরা করে জানা গেছে, হ্যানয়তে অনেক অর্থের বিনিময়ে গা ঢাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এমন ধারার নানা নতুন তথ্য এবং প্রচুর অসংলগ্ন ব্যাপার— যেগুলি গোয়েন্দা রিপোর্টগুলিতে তেমনভাবে গুরুত্ব পায়নি সেদিকে আলোকপাত করা হয়েছে। রাইটকে লেখা একটি টপসিক্রেট চিঠির উত্তরের সারাংশ জানা যায়, কীভাবে সায়গনে সুভাষচন্দ্র তাঁর নিজস্ব প্লেনে চড়ার সুযোগ পেলেন নির্বাচিত এক অতি বিশ্বস্ত সহযাত্রীকে নিয়ে। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা সুভাষচন্দ্রের ‘জাইগ্যানটিক ব্লাফ’ এক করে ঠকে গেছেন। এমনকী চিঠিপত্রে এটাও উঠে এসেছে যে গান্ধীজি সহ অনেকেই সুভাষচন্দ্রের মৃত্যুর গল্প মানেন না।
ইতিহাসের চাকা সেদিনের মতোই আবারও ঘুরে গিয়েছিল নানা চক্রান্তের মায়াজালে। নেতাজির দাদা ও ভাইরা বিমান দুর্ঘটনা কিংবা চিতাভস্মের গল্প মেনে নেননি। শরৎ বসু, ডাঃ সুনীল বসু, সুরেশ বসু, শৈলেশ বসু, ভাইপো অমিয় বসু প্রমুখ। অনেক পরে যখন মুখার্জি কমিশন গুমনামি বাবার দাঁতের ডিএনএ টেস্টের জন্য এক ফোঁটা রক্ত চেয়েছিলেন তখন তীব্র অনীহা ও টালবাহানার পর পরিবার পক্ষ থেকে রক্ত দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় জার্মানি থেকে শরৎ বসুর নাতি ও অমিয়নাথ বসুর পুত্র সূর্য বসু কমিশনে চিঠি দিয়ে জানান, বিদেশিনী অ্যানিটা পাফের রক্তের নমুনা যেন চাওয়া না হয়। কারণ তা শুধু গুমনামি বাবার দাঁত নয়, রেনকোজির ‘ভস্ম’ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও মিলবে না। তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মার্ক স্টোনিং-এর সঙ্গে মৌখিক কথা বলার পরে। আশ্চর্যের বিষয়, সাম্প্রতিককালে সেই অ্যানিটা পাফকে সামনে রেখে দাবিদার পরিবারের একাংশ রেনকোজির চিতাভস্মের ডিএনএ টেস্টের দাবি তুলে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছেন বারংবার। রহস্য এখানেই। যাঁরা দাবি তুলতে চাইছেন ‘নেতাজির চিতাভস্ম’ এদেশে ফিরিয়ে আনা হোক তাঁদের পূর্বপুরুষ এবং একসময়ে তাঁরাও তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনার গল্প প্রচারের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তাঁদের ভাবান্তরের কারণ নাকি ‘গভীর গবেষণা’ এমনটাই কেউ কেউ বলতে চাইছেন। মুখার্জি কমিশনে সেন্ট্রাল ফরেনসিক ল্যাব-এর তৎকালীন ডিরেক্টর বিজয় কাশ্যপ সাক্ষ্যে জানিয়েছিলেন, চিতাভস্মের ডিএনএ টেস্ট সম্ভব নয়। সাম্প্রতিককালে কিছু বিদেশি সংস্থা দাবি করে থাকে চিতাভস্মের থেকে ডিএনএ নিষ্কাশন সম্ভব বলে অবশ্যই শর্ত থাকে যদি সেখানে হাড়গোড় থাকে এবং তাতে হাতের স্পর্শ না থাকে। কিন্তু রেনকোজির চিতাভস্ম আজ ‘মেডিক্যাল-লিগাল’ দু’দিক দিয়েই গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। ১৯৮৯ সালের আগুনে রেনকোজি বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংস হওয়ার পর পুনঃনির্মিত মন্দিরে নতুন কাঠের বাক্সে আধপোড়া চোয়াল, মাথার খুলির অংশ, নতুন ব্রাউন পেপারের মোড়কে মুড়ে রেখে দেওয়া কালো অস্থির আবির্ভাবকে, কারা কবে করলেন তা এখনও অজানা। নবকলেবরে সাজানো মন্দিরে ও চিতাভস্মে চারকোণা কাঠের বাক্সে রাখা হাড়গোড়ের ডিএনএ টেস্টের পরীক্ষা হলে এবং ডিএনএ টেস্ট-এর বিস্তারিত রিপোর্ট চেপে রেখে (গুমনামি বাবার দাঁতের ডিএনএ টেস্ট-এর ইলেট্রো ফেরোগ্রাম রিপোর্ট সেদিন মুখার্জি কমিশনে দেওয়া হয়নি) যদি প্রমাণ করা হয় বসু পরিবারের সঙ্গে ডিএনএ মিলে গেছে তবুও আইনগতভাবে প্রমাণিত হবে না ওই চিতাভস্ম নেতাজিরই। কারণ প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, একটি গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট-এ নেতাজির এক ভাইপো শিশিরকুমার বসুর বক্তব্য জাপানের টি হায়াশিদার সঙ্গে ১৭.৮.১৯৬৫ সালের। (ফাইল নং ১৩৭২-৬৫, জাপান, পৃঃ ৩১) ডঃ সত্যনারায়ণ সিনহার নেতাজি অনুসন্ধান সম্পর্কে হায়াশিদাকে অবহিত করার প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘ফরমোজা সরকার জানিয়েছে, আগস্ট ১৯৪৫-এ কোনও বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি। ভারত সরকার চাইলে তা সরকারিভাবে তারা জানাতে পারেন। ১৯৪৪ সালের অক্টোবরে বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল....’। উল্লেখ্য, তাইওয়ান সরকার ১৯৫৬ সালের ১৯ জুন থেকে ৩০ আগস্ট যে তথ্যানুসন্ধান চালায় তাতে সিদ্ধান্ত ছিল, ভারতের জাতীয় নেতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাইওয়ানের মাটিতে প্রাণ হারানোর কোনও প্রমাণ নেই’, জওহরলাল, ইন্দিরা গান্ধীর মতো শিশির বসুও জানতেন মিথ্যা চিতাভস্মের কথা। যদিও প্রকাশ্যে চিতাভস্ম ফিরিয়ে আনার নানা উদ্যোগ শিশির বসু নিলেও মুখার্জি কমিশনে হাজিরা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াণের পরপরেই তাঁর স্ত্রী কৃষ্ণা বসু স্মৃতিচারণামূলক একটি বইতে একটি কথা লিখেছিলেন, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে অনেকেই মনে করেন। কৃষ্ণা বসু সেদিন কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শিশির বসুর মরদেহ চুল্লিতে প্রবেশের পর অপেক্ষা করছেন সে প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘...আমার কাছে যা ফিরে আসবে তা ভস্মীভূত দেহাবশেষ’ (তবতরণী পরে, পৃঃ ৭৩), এরপর তিনি ও তাঁর পুত্র জাপানে যান। সেখান থেকে একটি লেখা হয় কমিশনের আসন্ন জাপান সফরে যেন কৃষ্ণদেবীর লেখা বইতে তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনা এবং নেতাজির চিকিৎসা যেখানে হয়েছিল সেদিকটায় কমিশন বিবেচনা করেন। তাইহোকুতে আদৌ কোনও বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি প্রাণ হারাননি— এই সিদ্ধান্ত মুখার্জি কমিশন রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন এবং চিতাভস্মের ডিএনএ টেস্টের দাবিও এক্ষেত্রে অবান্তর। তবু নানা সময়ে নানা ব্যক্তি, নানা সংস্থা ওই নেতাজির নামে চালানো চিতাভস্ম এদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বারংবার ‘বিপ্লব’ করেছে। যেসব কথা বিস্তারিত না লিখে জানাই গোপনে তথাকথিত ‘চিতাভস্ম’ এদেশের মানুষের অগোচরে দু’বার অল্প পরিমাণে আমদানি করার ঘটনা। প্রথমবার জানা যায় ১৯৫৪-এর ডিসেম্বরে টোকিওর ভারতীয় দূতাবাসে রাখা মৃত সুভাষচন্দ্র বসুর ভস্ম ও অন্যান্য জিনিস বিদেশমন্ত্রক গ্রহণ করেছে, সঙ্গে দুশো টাকাও গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠবে, রেনকোজিতে কার চিতাভস্ম রক্ষিত ছিল যার জন্য তৎকালীন ভারত সরকার দেশবাসীকে অন্ধকারে রেখে প্রতিবছর বার্ষিক ‘ভস্ম’ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রেনকোজির পুরোহিতের কাছে নিয়মিত টাকা পাঠাবে! উল্লেখ্য, প্রকাশিত নানা ফাইল ও চিঠিপত্র থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, আয়ার-রামমূর্তির মাধ্যমেই সেই সময় আজাদ হিন্দ ফান্ডের বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়ে যায় অতি গোপনে, যদিও সে প্রসঙ্গ অন্য।
দ্বিতীয়বার খোদ কলকাতায় শিশির বসুর পুত্র সুগত বসু মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট জমা পরার পরেই টোকিওর রামমূর্তির বাড়ি থেকে ভারতবাসীর অজান্তেই তথাকথিত ‘চিতাভস্ম’ নিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে তাঁর বইতে একথা স্বীকার করেছেন।
২০০৬ সালে মার্চে ওই ভস্ম নিয়ে আসেন নাকি অ্যানিটা পাফের সঙ্গে পরামর্শ করেই। বিদেশিনী অ্যানিটা নিজেই নিশ্চিত নন নেতাজি তাইহোকুতে না রাশিয়াতে বা অন্য কোথাও প্রাণ হারিয়েছেন সে ব্যাপারে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বয়ান থেকেই বোঝা যায় সে কথা। তিনি নেতাজি তদন্ত কমিশন চলাকালে গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন যে নেতাজির অন্তর্ধান কীভাবে হয়েছিল তা নিয়ে ভারত সরকারের তদন্ত করা মানে গরিব দেশের অর্থের অপচয়। আবার তিনিই ১৯৯৮ সালে যে একাধিক নতুন সরকার কেন্দ্রে আসীন হয়েছিল তাদের কাছে আবেদন করেন, ‘নেতাজির ছাই’ ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য। নেতাজির ১২৫তম বর্ষেও নানা ভার্চুয়াল সেমিনারে বারংবার নেতাজির ছাই রেনকোজি থেকে আনার দাবি জানালেও একবারের জন্য কোনও নেতাজি তদন্ত কমিশনের মুখোমুখি হতে চাননি।
ভারতের মুক্তির লক্ষ্যে আজাদ হিন্দ পরাজয় স্বীকার না করে নতুন বন্ধুর সন্ধানে সায়গন থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন চীন-রাশিয়ার পথে। অথচ পরবর্তীকালে ক্ষমতা-অর্থের রসায়নে নেতাজি ও আজাদ হিন্দের লড়াই ত্যাগকে বিস্মৃত হয়ে বিশ্বাসঘাতকতার বেসুরো সুর জওহরলাল নেহরুর বদান্যতায় — শাহনাওয়াজ, আয়ার প্রমুখের কণ্ঠে ও কর্মে বেজে উঠেছিল। হবিবুর রহমান, কিয়ানিদের ঠাঁই হয়নি এ দেশের মাটিতে। হবিবুর রহমান পাকিস্তান-এ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সেদিন ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ কোনও বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি।
ভারতীয় রাজনীতিতে সমাজ জীবনে অনেক কিছু নিয়ে উত্তাল হলেও দশকের পর দশক লালিত, নেতাজির বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সরকারি অবস্থানের প্রতিবাদে শুধু জন প্রতিনিধিরাই নন, সমাজের বুদ্ধিজীবী থেকে সাধারণ মানুষ নিস্তরঙ্গ থাকেন। সামান্য ঢেউ মাঝেমধ্যে উঠলেও তা মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় নিস্পৃহ গণমাধ্যম আর দাবিদার পরিবারের গল্পগাথায়। কৃষ্ণাদেবীর একটি বয়ান এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করি যা সাধারণ মানুষের কাছে হৃদয়গ্রাহী আজও— ‘১৮ আগস্ট ঘটনাটি ঘটার পরই কাকিমা অর্থাৎ এমিলি শেঙ্কেল রেডিওয়ে শোনেন দুর্ঘটনার খবর এবং তার পরেই তিনি অনিতাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন।’ এই বয়ানের ভিত্তিতেই শ্যাম বেনেগাল ‘বোস: দ্য ফরগটেন হিরো’ সিনেমায় এই দৃশ্যটি দেখিয়েছিলেন বলে জানা যায়। বাস্তব হল, ১৮ আগস্ট নয়, চার দিন বাদে খবরটি তৈরি করা হয়েছিল। প্রকাশিত নেতাজি ফাইল ও নেতাজির নিজের লিখিত বয়ানে আজ স্পষ্ট সুভাষচন্দ্র বসুর বিবাহ, স্ত্রী, পুত্র, কন্যার গল্প সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বৃহত্তর এক জাতীয়, পারিবারিক ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ।
পত্রস্রোতের দিন শেষ। অন্তত ই-মেল, টুইট কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের একটি করে বার্তা প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে চিতাভস্ম তত্ত্ব বাতিলের আবেদন হয়তো জাতীয় লজ্জার হাত থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত করবে। ইঙ্গ-মার্কিন গোয়েন্দা কুলের সেই ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি— বোসের মাস্টার ডিসেপশন প্ল্যান, ভারতের পাঠ্য পুস্তকে স্বীকৃতি পাক। জয় হিন্দ।